সেই ২৯ এপ্রিলের কথা

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৭ years ago

শরিফুল হাসান |

আর দশটা দিনের চেয়ে খুব বেশি ব্যতিক্রমী ছিল না দিনটি। কিন্তু সন্ধ্যার পর যতই রাত গড়াতে থাকল ততই ঝড়বৃষ্টি বাড়ছিল।

রেডিও আর টেলিভিশনে আমরা শুনছিলাম একের পর এক বিপদ সংকেত। ১, ২ থেকে দশে দাঁড়াল সেই সংকেত। শুরু হলো জলোচ্ছ্বাস।

তারিখটা ছিল ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। ২৮ বছর আগের কথা। আমার তখন আট। আজও মনে আছে প্রলয়ঙ্করী সেই রাতের কথা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও পরের দিনের লণ্ডভণ্ড চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূল, মরা মানুষ, সাপ-মাছ।

আমার শিশুমনে ভয়াবহ দাগ কেটেছিল সেদিন। আজও সেই দাগ মুছে যায়নি। কত লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল সেদিন? পাঁচ লাখ নাকি আরও বেশি?

ফিরে যাই চট্টগ্রামে। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে ১৯৮৮ সালে আমাদের চট্টগ্রাম যাত্রা। এর আগে আব্বা ছিলেন টিএসপি সারকারখানায়। সেখান থেকে বদলি হয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারার সিইউএফএল সরকারি সারকারখানায়। আমরা সেখানকার সরকারি কলোনিতে থাকি। হঠাৎ একদিন ঝড়।

পতেঙ্গার উল্টোদিকে বঙ্গোপসাগর আর কর্ণফুলীর মোহনায় এ কলোনি। ছিমছাম সাজানো এই কলোনি, ভেতরে বিশাল মাঠ, টেনিস কোর্ট, হাসপাতাল, স্কুল- সব মিলিয়ে অদ্ভুত রকমের সুন্দর।

আমাদের বাসার একপাশের ছাদ থেকে বঙ্গোপসাগর আর কর্ণফুলীর মোহনা দেখা যায়। আর পেছনেই ছোট্ট ছোট্ট টিলা। হাঁটা দূরত্বে মেরিন একাডেমি।

রাতে ছাদে উঠলে আলোকিত চট্টগ্রাম দেখে মনে হয় এ বুঝি বিদেশ। আর নিরিবিলি শহর চট্টগ্রাম, পাহাড়ের কোলঘেঁষে রাস্তা আমার শিশুমনে ছবির মতো দাগ কেটে যেত।

আমাদের সিইউএফএল কলোনি থেকে অনেক দূর দিয়ে চাতুরি চৌমুহনী ঘুরে আনোয়ারা হয়ে সড়কপথে চট্টগ্রাম শহরে যাওয়া যেত আসা যেত। আর নদী পার হলে পাঁচ মিনিটেই পতেঙ্গা। দুভাবেই যাওয়ার সুযোগ ছিল।

তবে নদীপথে কাছে হয় বলে সিইউএফএলের নির্ধারিত ফেরি এবং ফেরিঘাট ছিল। তাতে সরকারি গাড়িগুলো পার হতো। ঘূর্ণিঝড়ে এই পুরো ফেরিঘাট উড়ে গিয়েছিল। কেমন ছিল সেদিনের ঝড়?

২৯ এপ্রিল। সন্ধ্যার পর দমকা হাওয়া। ৬, ৭, ৮, ৯ করে ১০ নম্বর বিপদ সংকেত দেয়া হলো। বাসায় আমি, আমার ছোট ভাই আর দুই বছরের বোন। আব্বা তখন সম্ভবত যশোর। সে আরেক কাহিনী।

আমাদের ছোটবেলায় পড়াতেন এক গৃহশিক্ষক। আমরা তাকে মাস্টার কাকা বলতাম। সেই কাকা কাফকো সারকারখানায় ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন।

সম্ভবত তার জয়েনিং বা ভাইভা কিছু একটার কার্ড পাঠিয়েছে আমাদের বাসার ঠিকানায়। কিন্তু তিনি বাড়ি গেছেন। তার গ্রামে টেলিফোন নেই। চিঠি দিলে তা পেতে এক সপ্তাহ হয়ে যাবে। জরুরি বলে তাকে আনতে আব্বা নিজেই তার বাড়ি রওনা হয়েছেন। বাসায় আমাদের পাহারা দিচ্ছেন শুধু আম্মা।

রাতে যখন ১০ নম্বর বিপদ সংকেত দেয়া হলো, তখন আশপাশের সব বাসায় কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেছে। সবাই বলছে- আমাদের আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই। আমরা একেবারেই শিশু। আমাদের মধ্যে অত আতঙ্ক নেই। বরং এক ধরনের রোমাঞ্চ কাজ করছে। ঝড় হবে, জলোচ্ছ্বাস হবে না জানি কী হয়।

আমার ছোট ভাই ওই অবস্থায় বলল, আম্মু আমি রাতে পোলাও খাব। সত্যি সত্যি আম্মা পোলাও রান্না শুরু করেছিল। আমার মায়ের বোধহয় মনে হয়েছিল আচ্ছা ছেলেটার ইচ্ছে পূরণ করি। আজ যখন ভাবী তখন মনে হয় মায়ের জন্য কাজটা কী কষ্টের ছিল।

আমাদের সরকারি কলোনিতে কখনও বিদ্যুৎ যায় না। সেদিনও যায়নি। রাত যতই বাড়ছে ঝড়ের তীব্রতা আর বাতাসের আওয়াজ বাড়ছে। সঙ্গে বৃষ্টি। অনেকেই আজান দিচ্ছে ও দোয়া পড়ছে।

আমার মমতাময়ী মা তার তিন শিশুসন্তানকে আগলে রেখেছেন। তার মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক। বারবার দোয়া পড়ছেন। সঠিক সময়টা মনে নেই। ঝড়ের সঙ্গে এক ধাক্কায় জলোচ্ছ্বাসের পানি আসল কলোনির মধ্যে।

আমাদের কলোনির চারপাশে বেশ উঁচু সীমানা দেয়াল। সেই দেয়ালের একপাশে একটা লেক। সেই পাশটায় দেয়ালের বদলে খোলা। শেষ রাতের দিকে দেখলাম হঠাৎ করে তীব্র বেগে পানি আসল। আমরা সবাই বুঝে গেলাম- এবার আর বাঁচার উপায় নেই। আমার মা আমাকে আজান দিতে বলল। বাসার বারান্দায় গিয়ে আমিও সম্ভবত আজান দিয়েছিলাম। আমাদের বাসা দোতলায়। একতলায় ততক্ষণে পানি। একতলার বাসিন্দারা আমাদের বাসায় চলে এসেছে।

একসময়ে ভোর হলো। ঝড়ের তীব্রতা কমল। আমি বাসা থেকে নিচে নামলাম। আমরা খবর পেলাম কলোনিতে কিছু বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে যাওয়া ছাড়া তেমন কিছুই হয়নি। কিন্তু আমাদের কলোনির চারপাশে গ্রাম। গ্রামগুলো লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে।

আমি প্রথমে বাসার ছাদে গেলাম। অনেক গরু মরে কলোনির সীমানা দেয়ালে আটকানো। শুনলাম জাহাজ উড়িয়ে সাগর থেকে নাকি মাটিতে নিয়ে এসেছে। সবকিছু নাকি লণ্ডভণ্ড। আমাদের ফেরিঘাট বিধ্বস্ত।

চট্টগ্রাম শহর আর আনোয়ারা, বাঁশখালী, কক্সবাজার, চকরিয়াসহ উপকূলের গ্রামগুলোতে নাকি কোনো মানুষই বেঁচে নেই।

আরেকটু সকাল হলে আমি আর আমার স্কুলের এক বন্ধু মিলে হাঁটুপানির মধ্য দিয়ে কলোনি থেকে বের হলাম। কলোনির মূল গেটে যেতেই দেখি সাপ মরে পড়ে আছে। পানির মধ্যে অনেক মাছ। পাশের লেকের পানি থেকে সেই মাছ এসেছে। আর মানুষ?

কলোনি থেকে বের হয়ে গ্রামের দিকে হাঁটা দিতেই মানুষের আহাজারি। কত মানুষ যে মারা গেছে তার কোনো হিসাব নেই। সেই দৃশ্য আজও আমার মনে দাগ কেটে আছে।

আনোয়ারায় সরকারিভাবে থাকার সবচেয়ে ভালো জায়গায় আমাদের কলোনি। পর দিনই বা কয়েক দিন পর আমাদের স্কুলে সেনাবাহিনী ক্যাম্প করল। ডাক্তার আসল। আমাদের স্কুল বন্ধ হয়ে গেল।

শত শত মানুষকে সেখানে চিকিৎসা আর আশ্রয় দেয়া হয়েছে। মাথার ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে। হেলিকপ্টারে আবার ত্রাণ বাঁধা। সেগুলো ফেলা হয়। গ্রামের মানুষ কাড়াকাড়ি করে সেই ত্রাণ নেয়। আমি টেলিভিশন আর পত্রিকায় সেসব ছবি দেখি আর কষ্ট পাই।

এদিকে আমার আব্বা দুদিন পর বাসায় এসে আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। আব্বা জানালেন ঝড়ের পর কলোনি বা অফিসের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করতে পারেননি। এদিকে খবরের কাগজে দেখেছেন চট্টগ্রাম বিধ্বস্ত। লাখো মানুষের মৃত্যু। তিনি ধরে নিয়েছেন আমরা সবাই মারা গেছি।

তখন ১১ নম্বর ঘাটে ফেরি ছিল। ফেরিঘাটে আসার পর আব্বা দেখেন ঘাট বিধ্বস্ত। কিন্তু সেখানে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা জানিয়েছেন কলোনিতে কিছু হয়নি। এর পর আব্বা নিশ্চিত হয়েছেন।

২৯ এপ্রিলের সেই ঘূর্ণিঝড় স্থায়ীভাবে আমার মনে দাগ কেটে আছে। এর ৯ বছর পর আমি যখন উচ্চমাধ্যমিকে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়েছি, তখন আমার চট্টগ্রামের অনেক বন্ধু হয়ে গেছে। কক্সবাজার, চকরিয়া, মহেশখালী, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ নানা জায়গার বন্ধু।

আমি ওদের মুখে ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহতা শুনতাম আর অবাক হতাম। ওরা বলত প্রায় সব পরিবারেই কেউ না কেউ হারিয়েছে। আমি যখন ওদের কারও বাড়িতে বেড়াতে যেতাম ওরা আমাকে বলত- এই গ্রামের হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে। কেউ কেউ শোনাতো সারারাত লড়াই করে বেঁচে থাকার কাহিনী। আমি ওদের কাহিনী শুনতাম আর শিউরে উঠতাম।

চকরিয়ায় আমার বন্ধু আরিফের কাছে কিছু ঘটনা শুনে আমি অনেক দিন কেঁদেছিলাম।

পরবর্তী জীবনে সাংবাদিক হিসেবে আমি যখনই সিডর বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কাভার করেছি আমার ২৯ এপ্রিলের কথা মনে পড়েছে। বছর তিনেক আগে নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময়ও সেই ঝড়ের কথা মনে পড়েছে।

আমার মনে হয়, ১৯৯১ সালের সেই ঝড়ের পর ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলায় বাংলাদেশ নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু আমার সবসময় মনে হয় ভূমিকম্প হলে কী হবে?

ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের সতর্ক সংকেত থাকে। কিন্তু ভূমিকম্পের তো থাকে না। এই যেমন ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নেপাল মুহূর্তের মধ্যেই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। নিহতের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছিল। ওই ভূমিকম্পের পর আমি নেপালে গিয়েছি। আমার চেনা শহরটাকে মনে হয়েছে ধ্বংসস্তূপ।

এমন ভূমিকম্প যদি বাংলাদেশে হয়? সরকারসহ আমাদের সবার প্রস্তুতি নেয়া উচিত। এই ঢাকা শহরে একটা বড় ভূমিকম্প আঘাত হানলে যে ক্ষতি হবে সারা বিশ্ব মিলেও সেটা শেষ করতে পারবে না। সামান্য আগুনে শত মানুষ মরে চকবাজারে, বনানীতে। বড় দুর্যোগ হলে কী হবে? কাজেই আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়া উচিত।

যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের শেখায় আমরা সৃষ্টিকর্তা ও প্রকৃতির কাছে আসলেই অসহায়। মুহূর্তেই শেষ হয়ে যেতে পারে সবকিছু। কিন্তু দুর্যোগ আমাদের এটাও শেখায় পরস্পরের পাশে থাকতে হবে। একজন অন্যজনকে বাঁচাতে হবে। পরস্পরের বিপদে এগিয়ে আসতে হয়। এটাই মানবতা।

আজ ২৯ এপ্রিল সহমর্মিতা আর পাশে থাকার সেই কথাগুলোই বলতে চাই। একটা কথা আমাদের সবার মনে রাখতে হবে আমরা প্রত্যেকে যদি শুধু স্বার্থপরের মতো বাঁচি, নিজের নিরাপত্তার কথাই তাহলে আমরা সবাই আসলে নিরাপত্তাহীন।

কিন্তু আমরা সবাই যদি আরেকজনের বিপদে পাশে থাকি, আরেকজনের কথা ভাবী তা হলেই আমরা সবাই নিরাপদ। প্রতিটি দুর্যোগ সেই শিক্ষাই দেয়। কাজেই চলুন পরস্পরের জন্য বাঁচি। বাঁচি মানবতার জন্য। শুভ সকাল বাংলাদেশ।