সমাজে কেন সহিংসতা বাড়ছে

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : সমাজে প্রতিদিনই মারাত্মক সব সহিংসতা ঘটছে। মাত্রাগত ও প্রকৃতিগত দিক থেকেও মানুষের নৃশংসতা ও সামাজিক সহিংসতার রূপ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিই যে নির্মম বাস্তবতা তা সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলোর শিরোনাম-ছবি দেখলেই বোঝা যায়। প্রকাশ্য দিবালোকে রাজপথে কুপিয়ে হত্যা, ঘুমের মধ্যে শিশুহত্যা, সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন কিংবা জন্মদাত্রী মায়ের হাতে সন্তান খুন কিছুই আর অবিশ্বাস্য মনে হয় না এখন! স্ত্রী খুন করছে স্বামীকে, স্বামী পুড়িয়ে মারছে স্ত্রীকে, ভাই খুন করছে ভাইকে। খুনের পর লাশ রাখা হচ্ছে শয়নকক্ষে, রাস্তায়, বালুর ভেতর, বস্তার ভেতর, কাদার ভেতর, পানির ট্যাঙ্কে, ড্রেনে কিংবা ডাস্টবিনে। প্রতিনিয়ত এ ধরনের খুনের ঘটনা ঘটছে। আর ঘটনাপ্রবাহে একসময় জানা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা সম্পত্তির বিরোধ এমন বেশিরভাগ হত্যাকা-ের কারণ। কিন্তু সমাজ কেন এতটা সহিংস হয়ে উঠছে, মানুষ কেন এতটা নৃশংস হয়ে উঠছে তার উত্তর কি আমরা অনুসন্ধান করছি?

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য, পুলিশের পরিসংখ্যান, নানা মানবাধিকার সংগঠনের গবেষণা ও পরিসংখ্যানেও উঠে আসছে সমাজের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা আর নৃশংসতার খতিয়ান। গত শুক্রবার রাজধানীর কদমতলীর মুরাদপুর এলাকার ঘটনা এমন নৃশংসতারই আরেকটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশের ভাষ্য অনুসারে মেহজাবিন নামের এক গৃহবধূ খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার পর নিজের মা, বাবা ও ছোট বোনকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে। এমনকি আটক হওয়ার আগে মেহজাবিন নিজেই ‘৯৯৯’-এ কল করে পুলিশকে জানান যেতিনি মা, বাবা ও বোনকে হত্যা করেছেন এবং স্বামী ও মেয়েকেও হত্যা করে ফেলতে পারেন। পরদিন সকালে পুলিশ গিয়ে ওই বাসা থেকে অসুস্থ অবস্থায় মেহজাবিনের স্বামী শফিকুল ইসলাম ও তার প্রথম স্বামীর ঘরের ছয় বছর বয়সী মেয়েকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। আটক করে মেহজাবিনকে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে জানা গেছে ছোট বোনের সঙ্গে স্বামীর পরকীয়া প্রেম হয়তো এই নৃশংস হত্যাকান্ডের অন্যতম কারণ। এছাড়া আরও জানা গেছে যে সন্দেহভাজন হত্যাকারী মেহজাবিন এর আগে তার প্রথম স্বামীকে হত্যার অপরাধে কয়েক বছর কারাদন্ডও ভোগ করেছেন। একইভাবে তার বর্তমান স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে পরকীয়ায় বাধা দেওয়ায় শাশুড়িকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার। পারিবারিক সহিংসতার এমন কাছাকাছি ঘটনা কিন্তু সারা দেশেই প্রায়ই ঘটছে। হৃদয়বিদারক হলেও মানুষের এমন নৃশংসতা আমাদের সমাজে এখন বিরল নয়। এজন্যই উদ্বেগ বাড়ছে দিন দিন।

কদমতলীতে তিনজনকে শ্বাসরোধে হত্যার প্রায় একই সময়ে সিলেটের গোয়াইনঘাটে হিফজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি আটক হয়েছেন দুই সন্তানসহ স্ত্রীকে গলা কেটে ও কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে হিফজুর এখন পুলিশের রিমান্ডে রয়েছেন। পুলিশের সন্দেহ হিফজুর স্ত্রী-সন্তানদের হত্যার পর নিজেকে সন্দেহমুক্ত রাখতে নিজেই নিজেকে জখম করেছেন। হিফজুর উল্টাপাল্টা কথা বলে নিজেকে মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবেও উপস্থাপন করতে চান। জিজ্ঞাসাবাদে হিফজুর পুলিশকে জানান, ‘ওই রাতে তিনি স্বপ্নে মাছ দেখতে পান, এরপর মাছ মনে করে উপর্যুপরি কুপিয়েছেন’। অভিযুক্ত হিফজুর একজন দিনমজুর এবং তার পরিবারে ঝগড়াঝাটি ছিল নিত্যদিনের বিষয়। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অর্থনৈতিকভাবে সমাজের একেবারে নিচুতলায় অবস্থানকারীদের মধ্যে যেমন পারিবারিক সহিংসতার এমন সব ঘটনা ঘটছে, তেমনি সমাজের সবচেয়ে বিত্তশালী অংশেও এ ধরনের সহিংসতা এখন আর বিরল নয়। অবশ্য বিত্তের বিচারে সমাজের উঁচুতলার আর নিচুতলার বাসিন্দাদের মধ্যে সম্পদ ভোগ ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিবেচনায় পার্থক্য ব্যাপক।

সমাজে ব্যাপক মাত্রায় সহিংসতা বাড়তে থাকার নেপথ্যে সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা যেসব কারণ চিহ্নিত করছেন তার মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং আধুনিকতার নানা বিলাসব্যসনকে অন্যতম বলে মনে করা হয়। এই বিবেচনা থেকে দেখলে বাংলাদেশের সমাজে মানুষের নৃশংসতা ও সামাজিক সহিংসতা বাড়তে থাকা অস্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে হয় না। কেননা বাংলাদেশে ধনী-গরিবের ব্যবধান আর সম্পদ ও আয়বৈষম্য প্রকট মাত্রায় বাড়ছে। আবার অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোসহ বিনোদন শিল্পে ভোগ-বিলাসপূর্ণ জীবনের বিপরীতে একটা রক্ষণশীল সমাজে মানুষের মধ্যে নানা অবদমনের কারণে যে নৈতিক অবক্ষয় বাড়ছে তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। অন্যদিকে, চোখের সামনে একের পর এক নৃশংসতার দৃশ্য দেখা এবং সেসব অপরাধের বিচার না হওয়াও মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে তুলছে। ফলে এটা নিশ্চিত যে, নৃশংসতা ও সহিংসতার এই ব্যাধি থেকে মুক্তির সহজ কোনো পথ নেই। সমাজকে এই অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে হলে সার্বিক সামাজিক অগ্রগতি ও মানবিক প্রগতি অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।