শিশুশিক্ষা বনাম প্রযুক্তি আসক্তি

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

ঞ্যোহ্লা মং : বিল গেটস তার নিজের কন্যাসন্তানকে চৌদ্দ বছর বয়সের আগে মোবাইল ফোন দেননি। ভিডিও গেম থেকেও দূরে রাখতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী স্টিভ জবস সন্তানদের আইপ্যাড ব্যবহার করতে দিতেন না বলে ২০১১ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক নিক বিল্টনকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন। আর গুগল সিইও, সুন্দর পিচাই, ২০১৮ সালে একই পত্রিকাকে তার ১১ বছরের সন্তানের জন্যও কোনো সেলফোন নেই বলে বলেছিলেন। স্টিভ জবসকে আমরা হারিয়েছি ২০১২ সালে। তিনি যদি বেঁচে থাকতেন বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির প্রতি তরুণ সমাজের আসক্তি নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তা দেখে ‘আমাদের কিছু করা উচিত’ বলতেন বলে মনে করেন ‘আইপড’-এর সহস্রষ্টা টনি ফেডেল। বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রযুক্তি ব্যবহারে শিশু-কিশোরদের আসক্তি দিনকে দিন বাড়ছে। অথচ যাদের হাত ধরে আধুনিক নানা প্রযুক্তির সৃষ্টি তারা তাদের সন্তানদের বেলায় এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দিষ্ট বয়স, সময় বেঁধে দিয়ে বড় করেছেন, করছেন।

এবার গ্রামে বেড়াতে গিয়ে, যেখানেই কিশোরদের দেখেছি, সবাইকে মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকতেই দেখেছি। ভিডিও গেমের প্রেমে প্রায় সবাই মশগুল। গ্রাম আর শহরের সমাজে শিশু, কিশোরদের মাঝে স্মার্টফোনের প্রীতি সমানে সমান। মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত তরুণদের ছবি নিতে গিয়ে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুয়েকজন ‘তোমাদের ছবি তুলছে’ বলে চিল্লালেও তাকিয়ে সময় ব্যয় করার মতো সময় তাদের দেখিনি। এমন অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। সবশেষ, করোনা মহামারীতে লকডাউন আর স্কুল-কলেজে শারীরিক অনুপস্থিতির সময়টাতে অনলাইন ক্লাসের নামে শিশু-কিশোরদের হাতে হাতে দেখা গেছে স্মার্টফোনের দৌরাত্ম্য। আমরা সবাই এখন বেশ ‘স্মার্ট’। কভিড-১৯ মহামারী আমাদের তরুণদের ‘মহামারী আকারে আরও স্মার্ট’ বানাল কি না ভাবছি! আমরা শহরে বসবাসকারী অভিভাবকরা শিশুদের মোবাইল থেকে দূরে রাখতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছি। গ্রামে বেড়ে ওঠা কিশোরদের মাঝেও মোবাইল গেমের আসক্তি যে বেড়েছে, অনেক অভিভাবকের মধ্যে হয়তো এখনো সেই চিন্তাই কাজ করেনি। আমাদের সময়ে বড়জোর চুরি করে সিনেমা দেখতে যেতাম, দূর গ্রামে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যেতাম কিংবা এলাকায় নির্দিষ্ট জায়গায় বসে কিছু সময়ের জন্য বন্ধুদের সঙ্গে জগাখিচুড়ি মার্কা আড্ডা-আলাপে মশগুল থাকতাম।

এখনকার কিশোর-তরুণদের যেটুকু অবসর মেলে, সবটাই ব্যয় করে মোবাইল গেমে, কিংবা স্মার্টফোনে ভালোমন্দ ছবি দেখে, গান শুনে। প্রচলিত খিচুড়ি শিক্ষাপদ্ধতির প্রভাবে কিশোর-কিশোরীরা এমনিতেই সারাক্ষণ বই কাঁধে নিয়ে কোচিং সেন্টারে পড়ে থাকে। তার মধ্যে যেটুকু সময় মেলে সেটুকুতেই স্মার্টফোনে ঢুকে পড়ে। এখন অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকায়, শিশুদের হাতেও স্মার্টফোন রাখাটা যেন অনেকটা বাধ্যবাধকতায় রূপ নিয়েছে। ফলে এখন তাদের চারপাশ দেখার কোনো সময় নেই। স্মার্টফোনই সব। স্মার্টফোনই তাদের স্মার্ট ভাবতে শেখাচ্ছে। স্মার্টফোন না থাকলে, ছাত্রছাত্রীরা যেন আর নিজেকে স্মার্ট ভাবতে-ই পারে না। স্মার্টফোন শিশুদের স্মার্ট বানাচ্ছে, নাকি শিশুদের স্মার্ট হতে বাধাগ্রস্ত করছে, অনেক অভিভাবকও আজ তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন।

স্মার্টফোনের আসক্তি কমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এখন তাই নিজ নিজ উদ্যোগে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসা উচিত। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলেই যে স্মার্টফোনের আসক্তি কমবে তাও বিশ^াস করি না। এসব দেখে মনে হচ্ছে এখন স্কুলের শিক্ষাপদ্ধতি নিয়েই আগে কথা বলা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিকে শিশুবান্ধব করতে হবে। বেসরকারি স্কুলগুলোকে লাগামহীন বইয়ের তালিকা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। শিশুদের কতটি বই দেওয়া যাবে, যাবে না, কী পড়ানো যাবে, যাবে না তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমি দেখেছি বেসরকারি স্কুলগুলোতে প্রথম শ্রেণিতেও সন্ধি-বিচ্ছেদ কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কীসহ প্রত্যেক প্রকারভেদের সংজ্ঞা মুখস্থ করানো হয়। না বুঝে কঠিন কঠিন সন্ধি-বিচ্ছেদ মুখস্থ করে খাতায় লিখতে হয়। একইভাবে প্রথম শ্রেণিতে সাধারণ জ্ঞানের নামে অলিম্পিক গেম কত সালে চালু হয়, প্রথম বিশ্বকাপ ক্রিকেট কত সালে কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল পড়ানো হয়। প্রথম শ্রেণির একজন ছাত্রকে সন্ধি-বিচ্ছেদ পড়ানো উচিত কি না সেটা ভাবতে হবে, প্রথম বিশ^কাপ ক্রিকেট কোথায় কত সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল জানার দরকার আছে কি না প্রশ্ন করতে হবে। একশটি দেশের মুদ্রার নাম, রাজধানীর নাম মুখস্থ করানোর দরকার আছে কি না, চিন্তা করা দরকার।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নিরানন্দ শিক্ষা কার্যক্রম শিশুদের ‘অতি স্মার্টনেসের’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিক্ষা নিয়ে প্রচুর লেখা প্রকাশিত হচ্ছে সত্য, কিন্তু তার প্রতিফলন একেবারে নেই বললেই চলে। ঢাকা শহরে বেসরকারি স্কুলগুলোতে প্রথম শ্রেণিতে ১৩টি বই পড়ানো হচ্ছে। সপ্তাহে সপ্তাহে ক্লাস টেস্ট, হোমওয়ার্ক দিয়ে শিশুদের বন্দি করে রাখা হয়েছে। শিশুদের জন্য লকডাউন, স্কুল বন্ধ, খোলা সব সময়ের জন্যই সমান। বেসরকারি স্কুলগুলোকে নানা পন্থায় শিশুদের বন্দি করে রাখতে ব্যস্তই দেখা গেছে। মহামারীতে অনেক স্কুল বন্ধ হয়েছে সত্য, কিন্তু অনেক স্কুল শিশুদের অনলাইনে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় কাজ, পড়া আর পরীক্ষা দিয়ে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে।

আমাদের বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস করতে যায় দুই পাতার সাদা কাগজ কিংবা ছোট নোট খাতা পকেটে দুই ভাঁজ করে। আর বড়জোর শার্টের পকেটে থাকে একটি বলপেন মাত্র। বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে যাওয়া না যাওয়া অনেকাংশে ছাত্রছাত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে নার্সারি, কেজি, প্রথম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের ১০ থেকে ১৪টি বই দৈনিক ব্যাকপ্যাকে বহন করতে হয়। শুধু তাই নয়, ক্লাস খাতা, হোমওয়ার্ক খাতা ইত্যাদি মিলে শিশুর গায়ের ওজনের চেয়েও বই-খাতার ওজন বেশি হয়ে থাকে। আমরা কিছু অভিভাবকরা অল্প বয়সে নানা বিষয়ে শিক্ষা পাচ্ছে বলে খুশি হই। প্রকৃতপক্ষে আমাদের শহুরে শিশুরা অনেক বইয়ের ভিড়ে প্রকৃত শিক্ষা বা জ্ঞান থেকে বহু দূরে সরে পড়ছে। শহরের ছেলেমেয়েদের একটি বিরাট অংশ শুধু পরীক্ষায় ভালোভাবে পাস করা নয়, জিপিএ-৫ ধরতে, ধরে রাখতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

স্কুলশিক্ষকদের প্রত্যাশা আর কিছু অভিভাবকদের চাহিদা পূরণে শুরুতে শিশুটি চেষ্টা করতে থাকলেও একটা সময়ে সে আর পড়ালেখার প্রতি টান অনুভব করে না। সে শুধু ফাঁকফোকর খুঁজতে থাকে। ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে। সেভাবেই শিশুটি একসময় ল্যাপটপ, আইপ্যাড, স্মার্টফোন কিংবা ভিডিও গেমে আসক্তি হয়ে পড়ে। শহরের ছেলেমেয়েরা পড়ালেখার চাপে সামাজিকীকরণের অভাবে এক ধরনের খিটখিটে মেজাজ নিয়ে বেড়ে উঠে। একসময় শহরের সমাজ তাদের কাছে ভালো লাগতে শুরু করে। গ্রামের ধুলোমাখা পথ, পুকুরে মাছ ধরা, মাঠেঘাটে ফুটবল খেলা তাদের ভাবনারও বাইরে থেকে যায়। গ্রামের ছেলেমেয়েদের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞামনে পোষণ করতে থাকে। একইভাবে শহরের ছেলেমেয়েদের প্রতিও গ্রাম থেকে পড়ালেখা করে আসা ছেলেমেয়েরা দূরত্ব অনুভব করে।

অনলাইন ক্লাসগুলোতে শিশুদের পড়ানোর ধরন হলো অনেকটা ভয়ভীতি দেখিয়ে। শিক্ষকদের মুখে মুখে প্রতিদিন শোনা যায় ‘আমি নম্বর কাটব, নম্বর দেব না, এটা করা যাবে না, স্কুলে আসতে হবে না, স্কুল থেকে বের করে দেব, গ্রুপ থেকে বের করে দেব, তোমরা এত বেয়াদব কেন’ ইত্যাদি। ভয়ভীতি দেখিয়ে ছেলেমেয়েদের শৃঙ্খলা, নিয়মনীতি শেখানোর চেষ্টা চলে মাত্র। ফলে স্বাভাবিকভাবে এখনকার ছাত্রছাত্রীদের মাঝে স্কুলপ্রীতি নেই বললেই চলে। তাদের কাছে স্কুল মানে আতঙ্ক, পরীক্ষা আর পরীক্ষা, মুখস্থ করা, খাতায় লিখে দিয়ে আসা ইত্যাদি।

একসময় স্কুলে শারীরিক নির্যাতন ছিল একটি নিত্যদিনের স্বাভাবিক বিষয়। এখন আইন থাকায় শারীরিক নির্যাতন কমেছে সত্য, কিন্তু বর্তমানে স্কুলের পরিবর্তে ঘরে ঘরে শিশুদের শারীরিক নির্যাতন বেড়েছে। এখনকার পড়ালেখা শিশুদের আনন্দ দিতে পারছে না, আকৃষ্ট করতে পারছে না; তাই ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা বাদ দিয়ে অন্য অনেক অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করছে। পড়ালেখায় পরিবর্তন না আনা গেলে শিশুদের আগামীতে আরও অনেক কিছুতে আসক্তি করে তুলতে পারে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

nmong7@yahoo.com