লামা-আলীকদমে প্রান্তিক ভূমি মালিকদের সীমানা দ্বন্দ একটি সামাজিক ব্যাধি

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৭ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : লামা-আলীকদম উপজেলায় স্থানীয়দের ভূমির সীমানা জটিলতা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। দিন দিন জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভূমির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়, বিরুধের মাত্রাও আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভূমির সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় মূলত: এ জটিলতা সমাজ পরিমন্ডলে বিরুপ প্রতিচ্ছায়া ফেলছে। এতদস্বার্থ দ্বন্ধে পিতা-পুত্র, আত্মীয়তার পবিত্র সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে সমাজ অঙ্গণকে এক চরম হীং¯্রতা গ্রাস করে নিচ্ছে। এ জটিলতা নিরষনে গুরুত্ব, সংশ্লিষ্ট উধ¦র্তন কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় না আনলে, সমাজের অন্য সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড বিফলে যাবে।
১৯৭৯-৮০-৮১ সালে সরকার পুনর্বাসিত বন্দোবস্তির আওতায় ভুমিহীন পরিবারদের ৫ একর করে ভূমি বরাদ্দ দেন। পাহাড়-ঝিরি-নদী অথবা কারো জোত ভূমি উল্লেখ করে চারদিকে চোহদ্দি দিয়ে প্রজাদের মাঝে বরাদ্দকৃত ভূমি আর/জি হোল্ডিং নামে বন্দোবস্তি কাগজ প্রদান করেছিলেন জেলা প্রশাসকগন। ১৯৮৯ সালে এই অঞ্চলের ভূমি জরিপ কার্যক্রম শুরুতেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জটিলতা আরো তীব্র হতে থাকে।
পাহাড়ে ভূ-বাস্তবতা এমনই, একটা চোহদ্দির সাথে আরেকটার সাদৃশ্য অনেকটা বিদ্যমান। এছাড়া কোন কোন ৫ একর জায়গার চোহদ্দিমতে ভূমির পরিমান বহুগুন হয়ে যায়। যার ফলে দোকর বন্দোবস্তিসহ কোন কোন মৌজায় বিদ্যমান ভূমির পরিমানের চেয়ে বন্দোবস্তির অনেক বেশি হওয়ার নজিরও রয়েছে।
প্রেক্ষাপট আলীকদম ২৮৭ নং তৈন মৌজার চৈক্ষ্যং ইউপির রেপাড়াপাড়া:
সম্প্রতি সেখানে দেয়ানী কার্যবিধি আইনে একটি উচ্ছেদ আদেশ বাস্তবায়ন করতে ৫টি বসত-ঘর ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, অপর মামলা নং-৫৮৮/২০১৫ থেকে উদ্ভুত অপরজারী মামলা নং-০২/২০১৯ মূলে, আলীকদম ২৮৭ নং তৈন মৌজায় হোল্ডিং নং আর/১৯৩ তপশিলের দু’ চৌহদ্দিতে মোট ৩ একর ৮৮ শতক জায়গায় এই উচ্ছেদ আদেশ দেয়। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে গত ২৭ অক্টোবর উচ্ছেদ বাস্তবায়ন করেন, নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট।
এদিকে স্থানীয়রা জানায়, উচ্ছেদ আদেশ হওয়া তপশিলের ভূমির অবস্থান আরো প্রায় এক কিলোমিটারেরও বেশি দূরে শীলবুনিয়া নামক স্থানে। সার্বেয়ার কর্তৃক পরিচিহ্নিত উচ্ছেদ আদেশ হওয়া ভূমির ট্রেসম্যাপ চ্যালেঞ্জ করেছে সেখানকার অনেকেই। এদিকে উচ্ছেদ আদেশ বাস্তবায়ন হওয়া ভূমির মালিকানা দাবী করছেন স্থানীয় সব্বির আহমদ নামের একজন।
জানাগেছে, রেপাড়পাড়া বাজার সংলগ্ন একটি জলাশয়সহ আশপাশের ভূমির একাধিক মালিকানা দাবীদার রয়েছেন। এর মধ্যে, মৃত নাগু মিয়ার নামে ১৯৮০-৮১ সনে আর/২৮৯ নং হোল্ডিং-এ তিন একর ২য় শ্রেণি ও নাগু মিয়ার ছেলে সব্বির আহমদের নামে আর/২৯০ নং হোল্ডিং-এ তিন একর ২য় শ্রেণি মোট ৬ একর জমি বন্দোবস্তি রয়েছে মর্মে সরকারি দলিল দস্তাবেজ মূলে জানাযায়। ১৯৭৮ সাল থেকে তারা সেখানে বসবাস করে আসছে।
এদিকে ২৩ অক্টোবর/১৯ তারিখে দুদক চেয়ারম্যান বরাবর করা এক আবেদনে প্রকাশ, সব্বির আহমদ ও তার মৃত পিতার নামীয় ভোগ দখলীয় ৪ একর জমিতে সৃষ্ট ৩৩ বছর যাবৎ একটি মৎস্য খামার ও ২ একর ধান্য জমিসহ তাদের বসত বাড়ি রয়েছে। কিন্তু প্রতিবেশি হানিফা বেগম, জনোয়ারা বেগম, জসিম উদ্দিন, সাকেরা বেগম, মালেকা বেগম, রোকেয়া বেগম, আবদুল মতিন, মো: শফি, ইয়াছমিন, বশির আম্মদ, এই ১০ জন মিলে মৎস্য খামার (জলাশয়)টি জবর দখল করে। এরা সংঘবদ্ধ হয়ে জলে রক্ষিত সাড়ে পাঁচ হাজার ঘনফুট সরকার অনুমোদিত সব্বির আহমদের সিভিট গাছ লুটপাট করে নিয়ে যায়। এর ফলে সব্বির আহম্দ দু’কোটি টাকা সমপরিমান ক্ষতির শিকার হন বলে আবেদনে উল্লেখ করেন।
আবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, বর্ণিত লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে সব্বির আহমদ ও তার পিতার নামীয় ভ‚মিতে সৃষ্ট জলাশয়টির বিপরীতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংক ও জেলা মৎস্য অফিস থেকে মোটাংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়। এসব বিষয়ে সব্বির আহমদ বাদী হয়ে ১৯৮৬-৮৭ সালে জেলা প্রশাসক বান্দরবান আদালতে ৩৩/ ডি মামলা দায়ের করেন। প্রায় এক দশক পর ২/৭/১৯৯৬ সালে উক্ত মামলায় বিজ্ঞ আদালত বাদী সব্বির আহমদের অনুকুলে রায় প্রদান করেন। অপরদিকে ১৯৯৬ সালে তার পিতা নাগু মিয়াও মৃত্যুর পূর্বে বিবাদীদের বিরুদ্ধে ৯৬/ডি-৯৬-৯৭ আরো একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। ওই মামলায় রায়ের আদেশমতে, বিগত ২৪/০৭/২০০৩ সালে জেলা কানুনগোদ্বারা সব্বির আহমদের অনুকুলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ গন্যমান্য ব্যাক্তিদের উপস্থিতিতে জমির দখল বুজিয়ে দিয়েছিলো বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সব্বির আহমদ তার আবেদনে জানান, বিবাদীগন জনবলে বলিয়ান-প্রভাবশালী হওয়ায়, বিজ্ঞ আদালতের রায়কে তোয়াক্কা করছেন না। তারা সব্বির আহমদের ৪০ শতাংশ জমির উপর নির্মিত দোকান ঘর জোরপূর্বক দখলে নিয়েছে। বিবাদীদের জোর-জুলম আচরণে নিরবতা পালন না করলে, তারা প্রাণ নাশে চেষ্টাসহ বিভিন্ন মিথ্যা অজুহাতে হয়রানি করতে থাকে। এসব জুলমের প্রতিকার চেয়ে সব্বির আহমদ দুদক চেয়ারম্যান বরাবর আবেদনে তাদের সম্পদ জবর দখলমুক্ত করার দাবীসহ জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শংকা প্রকাশ করেন।
অনুসন্ধানে জানাযায়, দীর্ঘ প্রায় ৪ দশক ধরে রেপাড়পাড়া বাজার ঘেঁষে কয়েকটি আর হোল্ডিং ও খতিয়ানের জমির সীমানা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে পরস্পর বিরোধ রয়েছে। এসব সীমানা বিরোধ নিয়ে দীর্ঘ বছর ধরে অপরাপর মামলা মোকাদ্দমায় সকলেই আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। এই বিরোধের জের ধরে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকে।
জানাযায়, বিভিন্ন হোল্ডিং বা খতিয়ানের প্রকৃত সীমনা নির্ধারিত হলে একটি মহলের স্বার্থে আঘাত হানবে। বিরোধপুর্ন জায়গাটি বর্তমানে বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে ক্রমে প্রসারতা লাভ করছে। এ কারণে সমস্যাটি জিয়ে রাখার নেপথ্যে কলকাটি নাড়ছে স্বার্থান্বেষী গুটি কয়েক লোক। সুতরাং কোন মহলই এই বিরোধ নিস্পত্তি করে সমাজকে কলহমুক্ত করার আন্তরিক উদ্যোগ নিচ্ছেন না বলে জানান শান্তিপ্রিয় লোকজন।
সমাজের শোষিত জনগোষ্ঠির এই করুণ রোদন বন্ধে হয়তোবা কোন মহল এগিয়ে আসবেন। তবেই সরকারের বহুমুখি উন্নয়ন কর্মকান্ড’র স্বার্থকতা আসবে, এমনটি প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।