ইমরান জাহেদ : রোহিঙ্গারাই ছিলেন আরাকানের প্রধান মুসলিম জনগোষ্ঠী। জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের নামে আবারো মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে আরাকানে। স্থানীয় মগ জনগোষ্ঠী এবং প্রশাসনের প্রকাশ্য সহায়তায় আরাকানের মংডু এবং বুচিদং এলাকায় চলছে নির্বিচারে গণহত্যা,অগ্নিসংযোগ এবং লুটতরাজ। রোহিঙ্গাদের হাজার হাজার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে বিরানভূমিতে পরিণত করছে গ্রামের পর গ্রাম। রোহিঙ্গা যুবতী নারীদের অপহরণ করে ধর্ষণ করা হচ্ছে নির্দ্বিধায়। ধর্ষণ শেষে নির্মমভাবে তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে সেখানে। মানবিক বিপর্যয়ের এক জ্বলন্ত জাহান্নামে পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গাদের বসতভিটে। এমন নির্মমতায় প্রাণ হারাচ্ছে অসহায় নারী শিশু ও বৃদ্ধসহ সেখানকার খেটে খাওয়া অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিতসহ সমগ্র রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। সর্বস্ব হারিয়ে নিজেদের প্রাণটুকু বাঁচানোর তাগিদে তারা পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে পাশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কক্সবাজার ও বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চল সহ উখিয়া ও টেকনাফের ২টি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এবং বস্তিতে বসবাস করছে ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। সচেতন মহল মনে করছে ১৯৭৮ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারে ৪ দফা সামরিক জান্তার জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতন এবং ধর্ষণের কবল থেকে রক্ষা পেতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এদেশে পাড়ি জামায় এসব রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গা বিশ্লেষকদের মতে, কোন পথে হাঁটছে রোহিঙ্গা সমস্যা? মিয়ানমারে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান মংডু, বুচিদং এলাকা পরিদর্শনের পরও থামছে না রোহিঙ্গা দমন, নিপীড়ন ও নির্যাতন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৮ সালে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ফাত্রাঝিড়ি বিজিবি (তৎকালীন বিডিআর) ক্যাম্পে মিয়ানমারের তৎকালিন নাসাকা বাহিনী ক্যাম্পে লুট করে অস্ত্র ও গোলা বারুদ নিয়ে যায়। সে সময় নিহত হয় একজন বিজিবি (বিডিআর) সদস্য। তখন রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর চরম নির্যাতনের অজুহাত তুলে ৩ লাখের অধিক রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে চলে আসে। দু’দেশের কূটনীতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার পর পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত নিয়ে যায়। বেশির ভাগ রোহিঙ্গা ফেরত গেলেও অর্ধ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়ে যায়।
এরপর ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসের দিকে আবারো মিয়ানমারে সরকারের নিপীড়ন নির্যাতন, অত্যাচার, জুলুম সহ্য করতে না পেরে এদেশে পাড়ি জামায় ২ লাখ ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা। উখিয়া, টেকনাফ, নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় ২০টি শরণার্থী শিবিরে তাদেরকে আশ্রয় দেওয়া হয়। এসব রোহিঙ্গাদের যথাযথ শরণার্থী মর্যাদা দিয়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। অন্যদিকে ২০০৫ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ হয়ে গেলে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা রেজিস্ট্রার্ড শরণার্থী ক্যাম্প ও টেকনাফের নয়াপাড়া রেজিস্ট্রার্ড শরণার্থী ক্যাম্পে আটকা পড়ে যায় সাড়ে ৩২ হাজার রোহিঙ্গা।
২০১২ ও ২০১৭ সালে রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমার সরকারের বর্বরোচিত নির্যাতনের কথা বলে এদেশে চলে আসে আরো দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। তারা বর্তমানে উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, থাইংখালী হাকিমপাড়া, তাজনিমারখোলা রোহিঙ্গা বস্তি ও টেকনাফের মুছনি, নয়াপাড়া এবং শাপলাপুর রোহিঙ্গা বস্তি এলাকায় ঝুঁপড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট মিয়ানমার বিদ্রোহী বাহিনী রাখাইনের রাজ্যের ৩১টি সেনা চৌকিতে একসাথে হামলা করে ১২ সেনা সদস্যসহ ৮৪ জন নিহত হয়। এছাড়া ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর মিয়ানমার বিদ্রোহী বাহিনী মংডু শহর এলাকায় তিনটি সেনা ক্যাম্পে হামলা করলে ৯ জন সেনা সদস্যসহ ১৪ জন নিহত হয়। এঘটনার জের ধরে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা আবারো রোহিঙ্গা অধ্যূষিত রাখাইন এলাকায় বিদ্রোহী দমনের নামে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর দমন,নিপীড়ন, অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষন অব্যাহত রাখে।
যে কারণে প্রাণ বাচাঁতে ২৫ আগষ্ট থেকে এ পর্যন্ত ৫ লাখের অধিক রোহিঙ্গা উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, থাইংখালী হাকিমপাড়া, তাজনিমারখোলা রোহিঙ্গা বস্তিতে এবং টেকনাফের মুছনি ও লেদা, নয়াপাড়া, শাপলাপুর রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আশ্রয় নিয়েছে আরো অসংখ্যা রোহিঙ্গা নাগরিক। সীমান্ত বিভিন্ন পয়েন্টে উখিয়া, টেকনাফ অঞ্চলে দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যরা প্রতিদিন নাফ নদীতে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা বোঝাই নৌকা ফেরত দিলে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে সীমান্তের চোরাই পথ দিয়ে রোহিঙ্গারা স্ব-পরিবারে ঠিকই অনুপ্রবেশ করছে। সরকারি ভাবে এসব রোহিঙ্গাদের সাহায্য সহযোগীতা করা করে যাচ্ছে, পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থা ও ব্যক্তি উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করছে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা রাজাপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী জানান, প্রায় লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গার ভারে ন্যূয়ে পড়া জনপদ উখিয়ার সাধারণ মানুষ তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এমতাবস্থায় আরো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকলে এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
কুতুপালং ক্যাম্প কমিটির সভাপতি মৌলভী আলি আহমদ জানান, রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পে যেসব অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছে তাদেরকে পার্শ্ববর্তী অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বস্তিতে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক জানান,তার বস্তিতে প্রায় ৪২ হাজার রোহিঙ্গা ছিল। বর্তমানে সদ্য অনুপ্রবেশকারী আরো লক্ষাধিকেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ রেজাউল করিম জানান,তার ক্যাম্পে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা নাগরিক আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আসার জন্য ক্যাম্পে সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে যার ফলে ক্যাম্পে বাইরে ভিতরে রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রণ,ত্রাণ বিতরণের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এসেছে।
