মুছে যাক গ্লানি মুছে যাক জরা

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৬ years ago

গাজী তানজিয়া : ‘মুছে যাক গ্লানি/ মুছে যাক জরা/অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা…’

সময়ের ঘড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলা নববর্ষ এসেছে। কিন্তু বড্ড অসময় এখন পৃথিবীর মানুষের জন্য। গোটা পৃথিবী এক মহামারীর কবলে ধুঁকছে। এমন একটা সময় হয়তো এই একবিংশ শতাব্দীর কল্পনায়ও ছিল না। কিন্তু প্রকৃতি চলে তার আপন খেয়ালে, ছন্দবদ্ধ তার প্রতিটি গতি। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই হয়তো ঘটছে সবকিছু। প্রকৃতিকে তো আমরা আমাদের ভোগ বিলাসের নিমিত্তে রেহাই দিইনি এতটুকু। কালো কার্বনে ঢেকে দিয়েছি আকাশ, সিসার বিষাক্ত বাতাসে নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছে প্রাণিকুল। আভূমি সয়লাব করেছি পলিথিনে, অকালমৃত তিমি মাছের পেট ভর্তি টন টন পলিথিন। সভ্যতার নামে, আধুনিকতার নামে আর বিশ্বায়নের নামে প্রকৃতির ধ্বংসলীলা, অমানবিক হানাহানি, বাতাসে মৃত্যু আর বারুদের গন্ধ; যার মূলে রয়েছে যুদ্ধ-অর্থনীতি, বাজার-অর্থনীতি, মুনাফার-রাজনীতি আমাদের এই পৃথিবীকে বাসের অযোগ্য করে তুলেছে। ধরেই নিলাম করোনা মানব সৃষ্ট না, কিন্তু এর পেছনেও কি মানুষের প্রকৃতি ধবংসের গূঢ় প্রচেষ্টা দায়ী নয়? এর আগে আমরা জানতাম, প্রকৃতি ধ্বংসের কারণে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে এক ভয়াবহ জলবায়ু বোমা। সেই জলবায়ুবোমা সামাল দেওয়ার আগেই এলো এই বিশ্ব মহামারী।

মানুষ প্রতিনিয়ত বদলায়। এবং সেই জীবনযাত্রার বদল প্রভাব ফেলে তার শিল্প ও সংস্কৃতিতেও। তাইতো আমাদের চিরাচরিত নববর্ষের উৎসবও গ্রাস করেছে করপোরেট সংস্কৃতি। বৈশাখ নিয়ে আমাদের যাবতীয় ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি অনেকটা করপোরেট প্রলেপ দেওয়া র‌্যাপিং পেপারে মুড়ে আমাদের মুখে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে শেকড়ের নির্যাস নেই। বৈশাখ নিয়ে আমাদের যাবতীয় লোকজ ও বাঙালির পারিবারিক সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির পথে। পার্কে বটের ছায়ায় বা রেস্তোরাঁয় রেস্তোরাঁয় আমরা যে মাটির সানকিতে একদিনের পান্তা ইলিশ খাই এই ঐতিহ্য বা ধারা প্রাকৃত বাংলার কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে পহেলা বৈশাখে আমরা যে একদিনের বাঙালিয়ানা দেখি, করপোরেট বাণিজ্যের হুড়োহুড়ি দেখি, এর সবটাই কিন্তু কৃত্রিম নয়। এর ভেতরে শক্ত শেকড়ের একটা ভীতও কিন্তু আছে। যা আমাদের আবহমান বাংলার চিরাচরিত ঐতিহ্য। এর শেকড় অনেক গভীরে। সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন আল্লামা আমির ফতেউল্লাহ সিরাজী চান্দ্রবর্ষ আর সৌরবর্ষের সমন্বয়ে সেকালে প্রচলিত বাংলা পঞ্জিকার সংস্কার করে যে রাষ্ট্রীয় ফসলি সন প্রবর্তন করেছিলেন তা-ই আমাদের আজকের বঙ্গাব্দ।

শীতকালীন ফসল বোনার মৌসুম কার্তিক মাস আর ফসল তোলার মৌসুম হলো মাঘের শেষ থেকে চৈত্রের প্রথম অবধি। সরকার মহাজন আর জমিদার শ্রেণি বুঝে নিয়েছিলেন চৈত্র মাসের মধ্যেই যা কিছু পাওনা তা কৃষকের কাছ থেকে নিয়ে নিতে হবে, ছলে-বলে-কিংবা কৌশলে। কেননা চৈত্র শেষ হয়ে গেলে কৃষকের হাতে আর কোনো টাকা থাকবে না। আর তাই খাজনা আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজনা বাজনোরও কিছু আয়োজন থাকত ভোলানোর প্রয়োজনে। তাই খাজনা আদায়ের নিমিত্তে বছরের প্রথম দিনটাকে ঘিরে কিছু উৎসব আয়োজন করা হতো।

পৃথিবীতে সব দেশেই আধিপত্যকারী শ্রেণির সংস্কৃতিই জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে পরিগণিত হয় এবং উৎসব পাগল আম জনতা এই মেওয়া লুফে নেয়। বাঙালির উৎসবের শুরুটা হয় হেঁসেল থেকে বলাই বাহুল্য। এই সময়টাতে নানা ধরনের মৌসুমি রোগবালাই ঘরে ঘরে লেগে থাকত তাই এই রোগ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য নানা ধরনের খাবারের আয়োজনও করা হতো। যেমন, দশ রকমের শাক জোগাড় করে একটা শাকান্ন তৈরি করা হতো যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। আতপ চালের ভাত বা পায়েস, বেলের শরবত, নিমপাতার ভাজিসহ নানা প্রকার তিতা খাবার খাওয়ার রেওয়াজও ছিল সাধারণের মধ্যে। বৈশাখ যেহেতু ইলিশ মাছের মৌসুম না তাই কোথাও ইলিশ খাওয়ার নজির পাওয়া যায় না। তবে অবস্থাপন্নরা বৈশাখের প্রথম প্রহরে ফলাহার দিয়ে শুরু করতেন। এই ফলাহারে দেশি ফল প্রাধান্য পেত। কলা, তরমুজ, বেল, বাঙ্গি, আনারস। দুপুরের খাবারে থাকত ওই শাকান্ন, নিমপাতা ভর্তা বা ভাজি, বকফুলের বড়া, কুমড়ো ফুলের বড়া, ইত্যাদি। তবে রাতের খাবারটা ভারী হতো, পুকুর থেকে তোলা বড় মাছ, মাংস এবং অতি অবশ্যই নতুন চালের পায়েস থাকত যা শুধু নিজেরা নয়, আত্মীয় পাড়া-প্রতিবেশীদের বাড়িতেও পাঠানো হতো।

বাদশাহি, নবাবি ও জমিদারি আমলের খাজনা আদায় ততদিনে উঠে গেলেও ব্যবসায়িক পরিম-লে হালখাতার একটা প্রচলন ছিল। যা এখনো স্বর্ণের ব্যবসায়ী ও মিষ্টির ব্যবসায়ীরা বহাল রেখেছেন। মহাজনদের বকেয়া পাওনা আদায়ই এ হালখাতার মূল বিষয় ছিল না। অনেকে অগ্রিম দাদন দিত, ব্যবসায়ীরা যেন ব্যবসা পরিচালনায় সফলতার সন্ধান পায় সে জন্য।

এরপর অপরিহার্য হয়ে আছে বৈশাখি মেলা। এসব মেলায় শুধুমাত্র শিশু কিশোরদের খই-মুরালি, কদমা-বাতাসা আর ভেজা ছোলার সব লোভনীয় খাবার আর খেলনার হাটেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কামারের দোকান, কুমোরের সরঞ্জাম ও নিত্য ব্যবহার্য্য সামগ্রীর হাট বসে মেলায় মেলায়। এইসব মেলাকে কোথাও বলে চান্নি কোথাও বলে আড়ং। এসব মেলা-আড়ংগুলোতে গবাদি পশুরও হাট বসত, থাকত কৃষি সরঞ্জাম। অনেকটা যেন তৎকালীন কৃষি ও বাণিজ্যমেলা হয়ে উঠত।

জমিদারেরা আয়োজন করতেন যাত্রাপালা ও পালাগানের। বরিশাল ও পটুয়াখালী অঞ্চলে বৈশাখ মাসে নৌকাবাইচ এবং গরুদৌড় হতো প্রতিযেগিতার ভিত্তিতে। ময়মনসিংহ ও হাওর অঞ্চলে বৈশাখে ষাঁড়ের লড়াই হতো এবং এখনো হয়। পার্বত্য চট্টগাম এবং পাহাড়ি অঞ্চলে মোরগের লড়াইয়ের সুখ্যাতি এখনো আছে।

তবে নববর্ষ পালনের বর্তমান কাঠামো সনাতন নয়। সনাতন শুধু মেলা অংশটুকু। এটা বাদ দিলে বাকি সবটাই নতুন। এই নতুন অংশটাও এক জায়গায় বাঁধা পড়ে নেই। কোনো নির্ধারিত আঙ্গিকে নেই। এর মধ্যে অনবরত গ্রহণ বর্জন প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। ঠিক যেমন সামগ্রিক ও পরিবর্তনশীল আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে আছে এই প্রক্রিয়া। নববর্ষ তার উৎসব মূর্তিতে আমাদের বৃহত্তর সংস্কৃতিরই অঙ্গ। আমরা যে শুধু উৎসবপরায়ণ তা-ই নয়। আমাদের আছে পরস্পর মিলেমিশে থাকার এক সৌহার্দ্যপূর্ণ সংস্কৃতি।

আজ আমাদের ভেতরকার সব গ্লানি দূর হয়ে যাক। মানুষ মানবিক হয়ে উঠুক। মৃত মানুষকে দাফন করতে না দেওয়ার মতো অমানবিক স্বার্থপর তো আমরা কখনো ছিলাম না। একটা ভাইরাসকে সামাল দিতে গিয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারাতে পারে না মানুষ। মানুষের এখন সত্যিকার অর্থে মানুষ হয়ে ওঠা, মানবিক হয়ে ওঠা অনেক বেশি জরুরি। আমাদের মন, আমাদের সমাজ, আমাদের রাষ্ট্র থেকে সব জরা দূর হয়ে যাক।

শুভ নববর্ষ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক