বাহারি রঙের টিউলিপ ফুল

লেখক: হুমায়ুন রশিদ
প্রকাশ: ৩ years ago

রেজাউল করিম সোহাগ : প্রকৃতিতে এখনো শীতের আমেজ। দিনে হালকা গরম ভাব থাকলেও রাতে বেশ শীত অনুভুত হয়। এমন পরিবেশে সারি সারি বাহারি রঙের ভিনদেশি টিউলিপ ফুল ফুটে অন্য রকম রূপ দিয়েছে ইট পাথরের মফস্বল শহরে। টিউলিপ বাগানে ঢুকলেই যে কারও মন জুড়িয়ে যায় নিমিষেই। টিউলিপ ফুলের রূপ দেখে যে কেউ নিজেকে ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডের কোনো বাগানে ঘুরছে ভাবতে পারে।

বাহারি টিউলিপ মানেই চোখে ভাসে ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডস। শীত মৌসুমে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করে নেদাল্যান্ডে টিউলিপ ফুল ফোঁটার সৌন্দর্য দেখতে। যত বেশি শীত তত টিউলিপের রূপ বিকশিত হয়। সেখানে চোখ জুড়ানো বহু রঙের টিউলিপ ফুলে মুগ্ধ হয় ঘুরতে যায় পর্যটকরা।সেই মুগ্ধতাকে ঘিরে বছরে লাখ লাখ টিউলিপ ফুল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে ফুলের স্বর্গ রাজ্যখ্যাত নেদারল্যান্ডস। এ তো গেল ভিনদেশের গল্প।

এমনি টিউলিপের অসাধারণ গল্প তৈরি করেছেন বাংলাদেশের মৌমিতা ফ্লাওয়ার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান। রুক্ষ পরিবেশে ভিনদেশি টিউলিপ ফুল ফোঁটানো অসম্ভব এমন বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে টিউলিপের মুগ্ধতা মৌমিতা ফ্লাওয়ার্সের পলি মোড়ানো একটি সেডে বেড়েই চলেছে। এখানে ১২ রঙের অন্তত ৭০ হাজার টিউলিপ ফুল ফোঁটতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে দর্শনার্থীরাও বাগানে আসতে শুরু করছে টিউলিপ ফুলের রূপ দেখতে। তুলছেন ছবি, পোস্ট করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

এটি গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর শহরের কেওয়া পূর্ব-খণ্ড গ্রামের ফুল চাষি দেলোয়ার হোসেনের মৌমিতা ফ্লাওয়ার্স গার্ডেনের গল্প। এ ফুল চাষি দেশের অন্তত আরও দশটি স্থানে টিউলিপ ফুল ফোঁটাতে চাষিদের নানা সযযোগিতা করছেন। এ ফুল চাষকে কেন্দ্র করে তার বাগানে অন্তত ২৫ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর পরিধি আরও বাড়লে বহু মানুষের কর্মের সংস্থান হবে সহজেই। আর কয়েক বছরের মধ্যে আমাদের দেশে বাণিজ্যিকভাবে টিউলিপ ফুল চাষ হবে এমন আশা করেন এ ব্যতিক্রমী ফুল চাষি।

জানাগেছে, ২০২০ সালে পরীক্ষামূলক ভাবে দেড় শতাংশ জমিতে টিউলিপ ফুলের বাল্ব (বীজ) রোপণ করেন দেলোয়ার হোসেন। প্রথমবারের সে চেষ্টায় তিনি দারুন সফল হন। বাংলাদেশের লাল মাটিতে রুক্ষ পরিবেশে টিউলিপ ফুল ফুঁটিয়ে তাক লাগিয়ে দেন দেলোয়ার হোসেন। পরের বছর আরও একটু বড় পরিসরে আরও সফল হন তিনি। এবার চতুর্থবার বেশ বড় পরিসরে চাষ শুরু করেন টিউলিপ ফুলের।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে নিজ বাগানে প্রায় ত্রিশ শতাংশ জমিতে ৭০ হাজার বাল্ব (বীজ) রোপণ করা হয়। নেদারল্যান্ডের ফুল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জেন ডি উইট নামের ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ৯২ হাজার বাল্ব নিয়ে আসা হয়। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষক ও প্রতিষ্ঠানের কাছে রোপণের অতিরিক্তগুলো বিক্রি করা হয়েছে। এ ফুল চাষে তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রির নিচে প্রয়োজন হয়। এর বেশি তাপমাত্রা হলে ফুল ভাল হয় না। পৃথিবীতে ১৫০ প্রজাতির টিউলিপ ফুল রয়েছে। তবে লাল, বেগুনি, সাদা, হলুদ, পিঙ্ক রঙের টিউলিপ বেশি নান্দনিকতা ছাড়ায়। এগুলোর চাহিদাও বেশি।

মৌমিতা ফ্লাওয়ার্সের স্বত্তাধিকারী ফুল চাষি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ব্যতিক্রমী কাজ করার পর সেখানে সফলতা পাওয়ার অনুভুতি ভিন্ন হয়। এটা সব সময় প্রকাশ করা যায় না। তিনি বলেন, স্বপ্নের চাওয়া বাস্তবে রূপ পেয়েছে আমাদের সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে।

এবার চতুর্থবার টিউলিপ রোপণ করেছি। বাংলাদেশে টিউলিপ ফুল ফোঁটানো অসম্ভব ছিল এমন ধারনা পাল্টে গেছে। আমাদের চেষ্টায় সফলতা আসায় টিউলিপের সম্ভাবনার এক দ্বার খুলে গেল বলেন তিনি।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, জমিতে নিরাপদ সেড তৈরি করে সারি সারি করে রোপণ করতে হয় টিউলিপ (বীজ) বাল্ব। আমাদের দেশে এ ফুলের চাহিদা মিটানো হয় নেদারল্যান্ড, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদানি করে। আমাদের উত্তরের শীত প্রধান জেলা পঞ্চগড়সহ বেশ কিছু অঞ্চলের তাপমাত্রা বেশ কম থাকে। সে সব এলাকায় এ টিউলিপ চাষ হতে পারে সহজেই। দেশে টিউলিপ ফুল চাষ করে এর চাহিদা পূরণ সম্ভব বলে জানান তিনি।

বাগানে কাজ করা শ্রমিকরা জানান, স্যার ম্যাডাম (দেলোয়ার- সেলিনা দম্পতি) বেশ পরিশ্রম করেন ভালো ফুল ফোঁটাতে। তীক্ষ্ণ নজর নজর রাখেন নিয়মিত। এবারও দারুণ টিউলিপ ফুল ফোটেছে বাগানে। খবর পেয়ে মানুষজন পরিবার নিয়ে টিউলিপ বাগানে আসছেন ফুল দেখতে। তারা ছবি তোলছেন।

আগত দর্শনার্থীরা জানান, শ্রীপুরের মৌমিতা ফ্লাওয়াস এক খণ্ড নেদারল্যান্ডস। বাগানে আসলে মন জুড়িয়ে যায়। বাহারি টিউলিপ হিমেল বাতাসে দুলছে দেখলে মনে প্রশান্তি লাগে। এখানে না আসলে কখনোই বাস্তবিক টিউলিপ ফুল দেখার সুযোগ হতো না। বাগানে প্রবেশ মূল্য ২০০ টাকা। এটা এমন সৌন্দর্য উপভোগে সামান্যই বলা চলে। যে কেউ টিকিট কেটে বাহারি রঙের টিউলিপ ফুল দেখতে আসতে পারে এ মৌমিতা ফ্লাওয়ার্সে।

গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দরা জানান, দেলোয়ার হোসেন সব সময় ফুল প্রেমী মানুষ। ফুলকে ঘিরে তার যত চিন্তা ধ্যান জ্ঞান। তিনি বহু সংগ্রাম আর সাধনা করে এ ফুল চাষের সঙ্গে লেগে আছেন। তার অক্লান্ত পরিশ্রম তাকে সফলতা দিয়েছে।

শ্রীপুর উপজেলার কৃষি অফিসার সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, আমরা জেনেছি টিউলিপ ফুল ফোঁটতে শুরু করেছে। আমাদের পক্ষ থেকে যাবতীয় সহযোগিতা করবো টিউলিপ ফুল চাষ প্রসারে। আমরা নিয়মিত খোঁজ রাখছি।

গাজীপুর জেলা কৃষি কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) কৃষিবিদ এএসএম মূয়ীদুল হাসান বলেন, টিউলিপ ফুলের চাষ এ দেশে বড় পরিসরে এখনো শুরু হয়নি। তবে ফুল চাষি দেলোয়ার হোসেন আস্তে আস্তে বড় পরিসরে টিউলিপ ফুল চাষের চেষ্টা করছেন।