নিত্যপণ্যে ফের বাড়তি মূল্যের উত্তাপ

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৪ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক :’একদাম ১৩০ টাকা’-সবজি দোকানি এক কেজি শিমের দাম বলতেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন ক্রেতা, বেসরকারি চাকরিজীবী আব্দুর রহমান। বললেন, ‘গত বুধবার ১০০ টাকা দরে শিম কিনেছি। দুই দিনের ব্যবধানে ৩০ টাকা বাড়ল। এটা কি মগের মুল্লুক পাইছেন?’ ব্যস্ত দোকানি তর্ক না বাড়িয়ে বললেন, ‘সবুর করেন, আর দুই দিন পরেই ১৫০ টাকায় কিনতে হবে।’

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মালিবাগ কাঁচাবাজারে শোনা গেল ক্রেতা ও বিক্রেতার এই কথোপকথন। শুধু মালিবাগে নয়, কারওয়ান বাজার, কাঁঠালবাগান ও মগবাজার ঘুরেও দেখা গেছে, কয়েকটি পণ্যের দাম বেশ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহনের ভাড়া ও অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে কাঁচাবাজারে-বলছেন বিক্রেতারা। ভোক্তাদের অভিযোগ, অযৌক্তিক হারে আগে কেনা অর্থাৎ মজুদ থাকা পণ্যের দামও বেশি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তারা আশঙ্কা করছেন. বেড়ে যাওয়া পণ্যমূল্য কমে আসার সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ।

গত কয়েক মাস ধরেই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে চাল, ডাল, চিনি, সয়াবিন তেল, ব্রয়লার মুরগি, পেঁয়াজ, আলুসহ বিভিন্ন পণ্য। এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম ভোক্তার শঙ্কাকে বাড়িয়েছে দ্বিগুণ। গত বৃহস্পতিবার থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১৫ টাকা এবং ফার্নেস অয়েলে তিন টাকা বাড়িয়েছে সরকার। অন্যদিকে এলপি গ্যাসের দামও বেড়েছে। ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে ৫৪ টাকা। এতে সংসার চালাতে নতুন করে হিসাব কষতে হবে ভোক্তা সাধারণকে।

ডিজেল-গ্যাসের দাম বাড়ার খবরে অস্থিতিশীল হতে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজার। বাজারে দুই দিন আগের ৪০ টাকার ঢেঁড়সের কেজি ৬০ টাকা, ৩০ থেকে ৪০ টাকার ফুলকপির পিস ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এছাড়া কয়েকটি কাঁচা সবজি কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে ক্রেতাদের। সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও উত্তাপ দেখা গেছে। ২৫০ থেকে ২৮০ টাকার রুই মাছের কেজি ৩০০ টাকা ছাড়িয়েছে। বাজারে পর্যাপ্ত ইলিশ থাকলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এক কেজি ওজনের ইলিশ দুই দিন আগে ৯৫০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন এর দাম ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা দাম হাঁকছেন মাছ ব্যবসায়ীরা।

ফলের দামও বাড়তির দিকে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিক্রেতারা এক কেজি আপেলের দাম রাখছেন ২০০ থেকে ২২০ টাকা। গত দুই-তিন দিন আগে এটি পাওয়া যেত ১৭০ থেকে ১৯০ টাকায়। বিক্রেতারা অন্যান্য ফলের কেজিতেও ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি দাম নিচ্ছেন বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।

এ বিষয়ে খুচরা ফল ব্যবসায়ী বোরহান বলেন, বাদামতলী বাজারে পাইকাররা সব ধরনের ফলের দাম বাড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবারের চেয়ে গতকাল শুক্রবার প্রতি কেজি আপেল পাইকারি পর্যায়ে ১০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে। এছাড়া মালটা, ড্রাগন, আঙুরসহ প্রায় সব ধরনের ফল কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

অবশ্য আগে থেকেই বাড়তি দামে বিক্রি হওয়া ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, চাল, ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামে এখনও কোনো প্রভাব পড়েনি। যদিও এসবেরও মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কায় ভুগছেন ক্রেতারা।

কারওয়ান বাজারে সবজি কিনতে আসা ক্রেতা কামাল আহমেদ বললেন, ডিজেলের দাম বাড়ানোর পরদিনই কাঁচামালের দাম বাড়ার কথা নয়। কিন্তু কয়েকটি সবজির দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা এই অজুহাতে ইচ্ছামতো ভোক্তার পকেট কাটছে। তার আশঙ্কা, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে ব্যবসায়ীরা সব পণ্যের দাম বাড়াবেন। এতে তার মতো স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশের বাজার প্রতিযোগিতামূলক নয়। প্রতিযোগিতা থাকলে অযাচিত দাম বাড়ানোর সুযোগ পেতেন না ব্যবসায়ীরা। এ দেশে পণ্যের মূল্য যখন বাড়তে থাকে, তড়তড়িয়ে বাড়ে। কিন্তু দাম কমার ক্ষেত্রে সেই গতি দেখা যায় না। ডিজেলের দাম বাড়ানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরা এক ধরনের আগাম আভাস দিচ্ছেন নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ানোর। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে পণ্যের মূল্য যেই হারে বাড়ার কথা, ঠিক সেই হারে নয়, বরং অস্বাভাবিক হারে এই দাম বাড়বে। উৎপাদন থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত এই ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, করোনাকালে মানুষ এমনিতেই কষ্টে রয়েছেন। জীবনযাত্রার মান চাপে রয়েছে। সরকারের এখনও সুযোগ রয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করার। এ ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে। অথবা বিপিসি এতদিন যে মুনাফা করেছে, তা দিয়ে সমন্বয় করা যেতে পারে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে এমনিতেই মানুষের জীবন-জীবিকায় নাভিশ্বাস উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। এর ফলে পণ্য পরিবহন, যাতায়াত খাতে ব্যয় বাড়বে। প্রত্যেক পণ্য ও সেবার দাম বাড়াবেন ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির দরও বাড়ানো হয়েছে দফায় দফায়। কয়েক নদিন আগে সীমিত আয়ের মানুষের ভরসাস্থল টিসিবির পণ্যের দামও বাড়িয়েছে সরকার। এ পরিস্থিতিতে কেরোসিন এবং ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ভোক্তার ওপর ‘মারাত্মক বিরূপ প্রভাব’ ফেলবে। তাই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তিনি।