দেশে সুবর্ণজয়ন্তীতে নতুন রাজনীতির আশা

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৪ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : আজ বাংলাদেশের বিজয়ের দিন। পঞ্চাশতম বিজয় দিবসে আজ আনন্দ সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনকারী দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য এবারের বিজয় দিবস তাই বিশেষ। স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পূর্ণ করার এই আনন্দ আরও তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে চলতি বছরটি একই সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ মুজিববর্ষ হিসেবে উদযাপনের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তির লড়াইয়ের সুদীর্ঘ গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বাঙালি জাতি এবং এই দেশের অপরাপর জাতি-গোষ্ঠীর কাছে চির প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। কিন্তু ইতিহাসের অনুপ্রেরণা থেকে আমরা কতটা শিক্ষা নিতে পেরেছি তা অবশ্যই স্বাধীনতার পাঁচ দশকের অর্জন ও ব্যর্থতার নিরিখে বিবেচনা করতে হবে। তবেই সামনে এগিয়ে চলার পথ নির্মাণ করা সম্ভব হবে।

স্বাধীনতার এই পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্জন আজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের তুলনামূলক চিত্র থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। ১৯৭০ সালে স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল মাত্র ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২১ সালে এসে জিডিপি পৌঁছেছে ৩৩৫ বিলিয়ন ডলার। একইভাবে মাথাপিছু আয় ১১০ ডলার থেকে বেড়ে চলতি বছরে ২৫৫৪ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি শিল্পায়ন, গৃহায়ন, নগরায়ণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, দারিদ্র্যবিমোচন, বিদ্যুতায়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো প্রভৃতি ক্ষেত্রে যেমন বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে তেমনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, গড় আয়ু, ইপিআই, নারীর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রগতির কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে অগ্রগতি অভাবনীয়। খাদ্য উৎপাদন ১ কোটি ১০ লাখ টন থেকে বেড়ে ৫ কোটি টনে উন্নীত হয়েছে। আজকের বাংলাদেশ অন্তত ১৩টি ক্ষেত্রে উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। এ প্রসঙ্গে এটা উল্লেখ করতে হয় যে, বিগত দশকগুলোতে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা টানাপড়েন সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি লাগাতার সমৃদ্ধির পথে এগিয়েছে। যমুনা সেতু, হাইওয়ে, ফ্লাইওভার, মেট্রো রেল এবং সর্বশেষ পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নতির অগ্রগতি দৃশ্যমান। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ কাঠামো নির্মাণের সাফল্য একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহীত বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সফল সমাপ্তির আশা জাগিয়েছে।

এটা মনে রাখা জরুরি যে, অর্থনীতি মূল চালিকাশক্তি হলেও, উন্নয়ন টেকসই করতে হলে মানবিক প্রগতি অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাক্সিক্ষত মান অর্জন করা ছাড়া যেমন সেই সামাজিক অগ্রগতি ও মানবিক প্রগতি অর্জন করা সম্ভব নয়, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা ছাড়াও সেটা সম্ভব নয়। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জাগরণের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। তাই আজ ও আগামীর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির পূর্ণ প্রতিষ্ঠাই এখন জাতির অঙ্গীকার হওয়া জরুরি।

একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রেরই জন্ম দেয়নি, একই সঙ্গে তা দুনিয়ার বুক থেকে বাংলার সমৃদ্ধ প্রাচীন সভ্যতার নাম-নিশানা মুছে দেওয়ার চক্রান্তকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল বাংলা ও বাঙালিকে এক পুনর্জন্ম দান করেছিল। বাংলা নামের এই দেশ সম্পর্কে একদিন বলা হতো ‘বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত ভাবে আগামীকাল’। প্রবাদপ্রতিম এই উক্তির শক্তি নিহিত ছিল বাঙালির মেধা ও শক্তিতে। কোনো সভ্যতাই চিরদিন একই স্থানে থাকে না। কিন্তু একটা জাতি চাইলে যেকোনো পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির দিশারী হয়ে উঠতে পারে, বাংলাদেশ নিজেই তার উদাহরণ। ভাষা আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালির আলোকমশাল আজ বাংলাদেশের হাতে। যে আলো পথ দেখিয়েছিল সব রকমের শোষণ-বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুক্তির সংগ্রামে। নিজ দেশের সব মানুষকে মুক্তির এই আলোকশিখায় আলোকিত না করে বাংলাদেশ সামনে এগোতে পারবে না। একইভাবে বিজয়ের এই সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে আজ ভাবতে হবে যে, বিশ্ব আজ যা ভাবছে, বাংলাদেশ কি তা আগামীকাল ভাববে, নাকি বাংলাদেশ সময়ের চেয়ে অগ্রবর্তী হওয়ার সাধনায় আত্মনিয়োগ করবে। সেটা করতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। একইসঙ্গে আগামী বিশে^র উপযোগী পরিবেশ-প্রতিবেশ সংবেদনশীল নতুন রাজনীতি নির্মাণের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সাংস্কৃতিক নবজাগরণের মধ্য দিয়ে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের সংকট থেকে মুক্ত হয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ওঠার নতুন রাজনীতির পথে হাঁটতে হবে। কেননা, একুশ শতকের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল যুগে আসন্ন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে রাজনীতির নতুন বিনির্মাণ ছাড়া সামনে এগুনোর পথ নেই। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। দেশ-বিদেশের সব বাংলাদেশিকে বিজয়ের আন্তরিক শুভেচ্ছা।