টেকনাফে ভুয়া ডাক্তারদের চিকিৎসা প্রতারণা

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ১০ years ago

মোঃ জাফর আলম চৌধুরী, কক্সবাজার ॥
চোঁখে চশমা, হাতে চিকিৎসার যন্ত্রপাতি, ফার্মেসীর ভিতরে চেম্বার আর চেম্বারেই রোগীর লাইন। আগত রোগীদের দেখেশুনে লিখছেন ব্যবস্থাপত্র,দিচ্ছেন বিভিন্ন দিক নির্দেশনা এভাবে চলছে টেকনাফ বাহারছড়ায় গ্রামীণ জনপদে ভূয়া ডাক্তারদের চিকিৎসার নামে রক্ত শোষণ। তারা আইনের প্রতি কোনো তুয়াক্কা না করে বেপরোয়া ভাবে শুধু মাত্র নিজের লাভের জন্য সামান্য অসুস্থতায় রোগীদের ব্যাপক হারে ঔষুধ সেবন করতে বাধ্য করছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অতিরিক্ত ঔষুধ সেবনের কারণে বাহারছড়ার গ্রামীণ জনপদের মানুষের শরীরের ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলো নষ্ট হতে চলেছে বলে স্থানীয় সতেচন মহলের অভিযোগ।
অনুসদ্ধানে দেখা গেছে, বাহারছড়ার বেশী ভাগ ডাক্তার তাদের ব্যবহৃত প্যাডের মধ্যে বেশ কয়েকটি ডিগ্রি অর্জন লেখা থাকলেও মুলত সেই ডিগ্রির সনদপত্র আসলেই নেই। এধরনের ভুয়া কিছু চিকিৎসকদের তথ্য পাওয়া গেছে। এরমধ্যে শামলাপুর বাজারের ডাঃ দীপক, ডাঃ মাকসুদুর রহমান। এরা জনগণ ও স্থানীয় সাংবাদিকদেও কাছে সিভিল সার্জন স্বাক্ষরিত একটি সনদ দেখাতে পারলেও তাদের প্যাডের মধ্যে লেখা একাডেমিক সনদ গুলো দেখাতে পারেনি। তবে তারা যে হারে বাহারছড়ার রোগীদের দীর্ঘ মেয়াদী এন্টিবায়েটিক সহ মোটা তাজা হওয়ার বিভিন্ন ঔষুধ সেবন করাচ্ছেন তা একজন পল্লী ডাক্তারে চিকিৎসার নিয়মে মধ্যে পড়ে কিনা?এমন প্রশ্নের জবাবে ওই চিকিৎসকরা (!) স্বীকার করে নেন, আসলে পড়েনা।
এছাড়াও শামলাপুর বাজারের আরও বেশ কয়েকজন ভূয়া ডাক্তার আছে যাদের প্যাডের মধ্যে ভূয়া ডিগ্রি ও ঔষুধ লেখনি দেখে রীতিমত শিউরে উঠবে যে কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও সতেচন মানুষ।
এই এলাকায় রয়েছে ডাঃ জহির উদ্দীন আরমান। তিনি আজ থেকে ৬-৭ বছর আগে জীবিকার তাগিদে পালংখালী থেকে গ্রাম্য ডাক্তারী করতে শামলাপুরে আগমন করে। বর্তমানে তিনি শামলাপুর ‘বাহারছড়া ফার্মেসী’ নামক একটি ফার্মেসীতে চেম্বার করেন। আর জহির শামলাপুরে আসার বেশ কয়েক বছর যাবত তার তেমন রোগী ছিলনা। অনেক রোগী তার কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে তার অবৈধ চিকিৎসার প্রসারের জন্য তিনি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। তার কাছে আসা রোগীদের সামান্য অসসুস্থতায় ব্যাপক হারে এন্টিবায়েটিক সহ দীর্ঘ মেয়াদী বিভিন্ন ঔষুধ তার প্রেসক্রিপশনে লিখেন। আর গ্রাম্য অশিক্ষিত গরিব রোগীরা রোগ মুক্তির আশায় কষ্ট হলেও সেই সব ঔষুধ সেবন করে। আবার অনেকে কিছু দিন ভাল থাকলেও বিনা কারণে ব্যাপক এন্টিবায়েটিক সেবন করায় তারা পরবর্তীতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তারা ভাল ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হন কক্সবাজার শহর ও চট্টগ্রামে। আর বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা শামলাপুরে অনেক রোগীর বিনা কারণে ব্যাপক ঔষুধ সেবন দেখে শিউরে উঠেন বলে অনেক রোগী ও রোগীর সাথে থাকা লোকজন জানান। আর জহির ডাক্তারের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন নিম্ন মানের ঔষুধ কোম্পানির সাথে মাসিক একটি সমঝোতা করে রোগীদের ব্যাপক হারে নিম্নমানের ঔষুধ সেবন করাচ্ছে। তিনি একজন সাধারণ গ্রাম্য ডাক্তার হয়েও তার এলাকা পালংখালীতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মান করছেন বলে জানা যায়। বিভিন্ন রোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জহির ডাক্তারের অর্জিত সনদপত্রের ব্যাপারে স্থানীয় সাংবাদিকরা তার চেম্বারে কথা বলতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাঠান সাংবাদিকদের সাথে তিনি কথা বলবেন না।
এধরনের পটিয়া থেকে আসা ডাঃ আবদুল কুদ্দুসের নেই কোনো ডাক্তারী সনদপত্র। তিনি শুধু মাত্র তার অভিজ্ঞার উপর ভিক্তি করে গ্রাম্য ডাক্তারি করছেন বলে জানান। আর তার প্যাডের মধ্যে লেখা বিভিন্ন ডিগ্রি। তিনি কেন লিখেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তিনি শুধু অভিজ্ঞার উপর ভিক্তি করে রোগীদেরকে যে হারে দীর্ঘ মেয়াদী ঔষুধ ব্যবহার করাচ্ছেন তা অন্যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন নেন আসলে এটা অন্যায়।
ডাঃ অমর কান্তি নাথ চিকিৎসার ক্ষেত্রে শামলাপুরে সতেচন মানুষের কাছে এক আতংকের নাম। তার কাছে কোনো মানুষ যদি খুব অল্প সময়ে মোটা তাজা হওয়ার জন্য আসে তাহলে তিনি ক্ষতিকারক ঔষুধ সেবনের মাধ্যমে সেই মানুষ গুলোকে মোটা তাজা করে দেন। অথচ তিনি নিজ লাভের স্বার্থে সেই মানুষ গুলোকে ঔষুধ সেবনে শরীরে কি পরিমান ক্ষতি হবে তা তাদের কাছে তুলে ধরেন না। অন্য দিকে তার ঔষুধ লিখনির প্যাডের মধ্যে বেশ কয়েকটি ডিগ্রি অর্জন লেখা থাকলেও সেই ডিগ্রির সনদ গুলো তার কক্সবাজারে বাসায় আছেন বলে জানান। একজন সামান্য গ্রাম্য ডাক্তার হয়েও শামলাপুরে এখন তিনি লাখ লাখ টাকার সম্পদের মালিক।
একটি সূত্রে জানা গেছে ডাক্তার অমরে প্রত্যেক মাসে একটি বড় অংকের মুনাফা আসে নিম্ন মানের ঔষুধ কোম্পানির কাছ থেকে। তার সাথে বিভিন্ন নিম্নমানের ঔষুধ কোম্পানির সাথে মাসিক চুক্তি আছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। ফলে সাধারণ রোগীরা তার উপর বিশ্বাস করে নিম্নমানের ঔষুধ সেবন করেও কোনো ফলাফল না পেয়ে প্রতারিত হয়ে ভাল চিকিৎসার জন্য অন্য চেষ্টা করেন বলে জানা যায়। এভাবে চলছে ডাক্তার অমরের অবৈধ চিকিৎসার বাণিজ্য। আর উল্লেখিত বেশ কয়েকজন ভূয়া ডাক্তার নিজেই ফার্মেসীর মালিক বলে স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে।
বাহারছড়ায় আরো বেশ কয়েকজন ভূয়া ডাক্তার রয়েছে যারা কোনো প্রশিক্ষণ বা ডিগ্রি ছাড়া গ্রামের মানুষের সাথে প্রতারণা করে চিকিৎসা নামে তাদের অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। এধরনের প্রতারণার শিকার বেশ কয়েকজন রোগীর সন্ধান মিলেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, হাজম পাড়ার রানা ডাক্তার, জাহাজপুরার দুলাল ডাক্তার, শামলাপুর বাজারের আকতার ডাক্তার, নির্মল ডাক্তার, তাহের ডাক্তার, মোবারক ডাক্তার সহ আরো অনেকে।
বাহারছড়ার সতেচন মানুষের একটাই দাবী এইসব ভূয়া ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অতি শীঘ্রই প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হোক।
এ বিষয়ে বাজারছড়া স্বাস্থ্য অফিসার মোঃ নুরুল আলম বলেন, বাহারছড়ার পল্লী চিকিৎসকরা ভূয়া ডিগ্রি লিখে যে হারে রোগীদের প্রতারিত করছে তা শিউরে উঠার মত । তারা মানব স্বাস্থ্যের কোনো কিছু না ভেবে শুধু নিজ লাভের আশায় রোগীদের বিনা কারণে মেডিসিন সেবন করাচ্ছে।
বাহারছড়া সরকারী পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রের ইনচার্জ মোঃ আমান উল্লাহ বলেন, একজন পল্লী চিকিৎসক কখনো ডাক্তার লিখতে পারেনা, আর বাহারছড়ায় যারা পল্লী চিকিৎসক তারা আইনের প্রতি কোনো তুয়াক্কা না করে যে হারে মানুষদের মেডিসিন সেবন করাচ্ছে তা মানব স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ক্ষতিকারক।