(FILES) In this file photo taken on April 25, 2018, Rohingya refugees gather in the "no man's land" behind Myanmar's boder lined with barb wire fences in Maungdaw district, Rakhine state bounded by Bangladesh. - The Myanmar military launched a ferocious crackdown against its Rohingya Muslim population in 2017, driving about 740,000 into neighbouring Bangladesh. On December 10, 2019, the UN's top court, the International Court of Justice (ICJ), is hearing a case brought by Gambia accusing Myanmar of genocide against the Rohingya. (Photo by Ye Aung THU / AFP) / To go with Myanmar-UN-Suu Kyi-Rohingya-trial-justice,FOCUS by Hla-Hla HTAY and Richard SARGENT
গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় লড়তে সু চি’র নেতৃত্বে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল * লজিস্টিক সহায়তা দিতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলও হেগে গেছে
মাসুদ করিম |
রোহিঙ্গা সংকট শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আদালতে গড়াল। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলাটির শুনানি হবে বাংলাদেশ সময় ১১-১২ ডিসেম্বর। হেগে জাতিসংঘের ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজে’ (আইসিজে) শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
বাদী গাম্বিয়া এবং বিবাদী মিয়ানমার উভয়েই আইনজীবী নিয়োগ করেছে। দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলও হেগে পৌঁছেছে। মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্টেট কাউন্সিলর নোবেল বিজয়ী নেত্রী অং সান সু চি।
গাম্বিয়ার পক্ষে লজিস্টিক সহায়তা দিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) মাসুদ বিন মোমেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ থেকেও একটি প্রতিনিধি দল গেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংকট তাৎপর্যপূর্ণ টার্নিং পয়েন্টে পৌঁছাল। বিশ্ববাসী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের নিন্দা জানাচ্ছে।
তারা মনে করছেন এবার আন্তর্জাতিক আদালত থেকে বিষয়টি সমাধানে একটি যৌক্তিক দিকনির্দেশনা আসতে পারে। যা মিয়ানমারকে চাপে ফেলতে পারে। কারণ এরই মধ্যে প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার আন্তরিক নয়। তারা সম্প্রদায়টিকে নির্মূল করতে গণহত্যা চালিয়েছে।
এসব কারণে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে দেশটির ওপর চাপ বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে হেগের স্থানীয় সময় ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর (বাংলাদেশ সময় ১১-১২ ডিসেম্বর) পর্যন্ত বিশ্ববাসীর নজর থাকবে এই আন্তর্জাতিক আদালতের শুনানির ওপর।
আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় নিজ দেশের পক্ষে লড়াই করতে নেদারল্যান্ডসের হেগের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন নোবেল বিজয়ী মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি।
রোববার নেপিডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে তিনি হেগের উদ্দেশে রওনা দেন। এ সময় বিমানবন্দরে তাকে দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিদায় জানান।
সু চি হেগের উদ্দেশে রওনা দেয়ার আগে দেশটির মিত্র চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের গণহত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দেন অং সান সু চি।
গত ২১ নভেম্বর ঘোষণা দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতে তিনি নিজে তাদের আইনি দলের নেতৃত্ব দেবেন। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী খ্যাতিমান আইনজীবী প্রফেসর স্যার উইলিয়াম এ শাহবাসকে মিয়ানমারের পক্ষে নিযুক্ত করা হয়েছে।
কানাডীয় ও আইরিশ নাগরিক আইনজীবী প্রফেসর শাহবাস মানবিক ও মানবাধিকার প্রশ্নে কসোভোতে গণহত্যা হয়েছে বলে মনে করেন না। রোহিঙ্গাদের বিপক্ষেও তার অবস্থান একইরকম।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া গত ১১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলাটি দায়ের করে। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করতে রাখাইনে গণহত্যা, গণধর্ষণসহ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ করা হয়েছে ওই মামলায়।
আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলা শুনানির জন্য বাংলাদেশ সময় ১১ ও ১২ ডিসেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে । প্রথম দিনে শুনানিতে অংশ নেবে গাম্বিয়া আর দ্বিতীয় দিনে মিয়ানমার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ল’ ফার্ম ফলি হককে গাম্বিয়া আইনজীবী নিযুক্ত করেছে।
এই ফার্মটি মিয়ানমার ও ভারতের বিপক্ষে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের পক্ষে আইনজীবীর দায়িত্ব পালন করেছে। গাম্বিয়ার পক্ষে এই ফার্মের প্রধান আইনজীবী পায়াম আখাবানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
আইসিজেতে মিয়ানমারের বিপক্ষে দায়ের করা মামলায় বাংলাদেশ সরাসরি কোনো পক্ষ নয়। তবে গাম্বিয়ার পক্ষে এ ব্যাপারে লজিস্টিক সহায়তা দেবে বাংলাদেশ।
এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) মাসুদ বিন মোমেন বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে নেদারল্যান্ডসের হেগে গেছেন। তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন।
জাতিসংঘে তিনি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ কারণে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে তাকেই হেগে পাঠানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে শুনানিকে সামনে রেখে সীমান্তে মিয়ানমার অংশে নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে তোড়জোড় লক্ষ্য করা গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘জাতিসংঘের অধীন আইসিজেতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চলা মামলায় বাংলাদেশ সরাসরি কোনো পক্ষ নয়। গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের মধ্যে এই মামলায় লড়াই চলবে। তবে মামলা পরিচালনায় বাংলাদেশ লজিস্টিক সহযোগিতা দেবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সব সময়ই মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে আগ্রহী। কিন্তু মিয়ানমার এ বিষয়ে আন্তরিক নয়।’
আন্তর্জাতিক আদালতে তিন দিনের শুনানিতে জাতিসংঘ নিযুক্ত ১৬ জন বিচারক প্যানেল উভয়পক্ষের আইনজীবীদের প্রশ্ন করবেন। আদালত রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় পরিপূর্ণ শুনানির আগে অন্তর্বর্তী আদেশ দিতে পারেন। জাতিসংঘের অধীনে দু’ধরনের আন্তর্জাতিক আদালত আছে।
একটা হল ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট’ (আইসিসি) এবং অপরটি হল ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজ’ (আইসিজে)। কোনো ব্যক্তি আন্তর্জাতিক ফৌজদারি অপরাধ করলে তার বিচার ও সাজা নির্ধারণ করে আইসিসি।
রোম চুক্তিতে যেসব দেশ সই করেছে, সাধারণত ওই দেশগুলোর কেউ গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ করলে অপরাধী ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিসহ সাজা দিতে পারে আইসিসি।
বাংলাদেশ রোম চুক্তিতে সই করলেও মিয়ানমার এতে সই করেনি। আইসিসিতে এ কারণে বিচারে কিছুটা অসুবিধা থাকলেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সুপারিশ করলে আইসিসি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংগঠিত অপরাধের বিচার করতে পারে।
অপরদিকে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময়ই ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আইসিজে। দুই দেশ কোনো বিরোধে জড়ালে আইসিজে শুনানি গ্রহণ করে রায় দিতে পারে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমার ও গাম্বিয়া পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়বে।
আইসিজে রায়ে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বলতে পারে। কিংবা আইসিজে বলতে পারে যে, রোহিঙ্গারা ঐতিহ্যগতভাবে মিয়ানমারের নাগরিক হওয়ার যোগ্য তাই তাদের নাগরিকত্ব দেয়ার আদেশ দিতে পারে আন্তর্জাতিক এই আদালত। তবে আইসিজে রায় কার্যকর করতে পারে না।
মিয়ানমার, গাম্বিয়া, বাংলাদেশ আইসিজে’র সদস্য। ফলে রায় সদস্য দেশগুলো নিজেরা কার্যকর করতে পারে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রায় কার্যকরে পদক্ষেপ নিতে পারে। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী কোনো সদস্য দেশ রায় কার্যকরে বল প্রয়োগও করতে পারে।
যদিও ফিলিস্তিনের পক্ষে আইসিজে রায় দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তা কার্যকর করতে পদক্ষেপ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র বরং উল্টো ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পক্ষে রয়েছে।
মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর অভিযান চলাকালে দমনপীড়নের কারণে ২০১৭ সালে প্রায় সাত লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে।
জাতিসংঘ আগেই বলেছে, রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা তথা হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণের লক্ষ্যে এই অভিযান পরিচালনা করেছে মিয়ানমার। এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠলেও অং সান সু চি রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার পক্ষে অবস্থান নেন।
যুগান্তর
