dead body with a blank toe tag, in monochrome
আলমগীর মোহাম্মদ: বিএনএস ঈসাখানের সামনে বাস থেকে নামলাম, নেমেই ঈসাখানের গেইটের সামনে বিখ্যাত মুসা ভাইয়ের দোকান থেকে শখ করে একটা কেমন বাহার মশলা দিয়ে পান মুখে পুরে ডকইয়ার্ডের ভিতর দিয়ে হেটে জাহাজে ফিরছিলাম, চাকুরী ফ্রিগেট আলী হায়দারে, রাত প্রায় ১১ টা, জাহাজের সামনে পন্টুনে একটা জিপ দাঁড়িয়ে আছে, ড্রাইভারটার চেহারা দেখে বুঝলাম সে খুবই বিরক্ত, আমি জাহাজে উঠলাম, গ্যাংওয়েতে লেঃ কমান্ডার ইমরান স্পোর্টস রিগ পরে দাঁড়িয়ে আছে, সালাম দিলাম…তিনি অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন, উনার হাতে একটা চাইনিজ সাব মেশিন গান, গলায় ঝুলানো ওয়াকিটকি, আমি কোয়ার্টার মাস্টারের কাছে গিয়ে রেজিস্ট্রারে নাম ইন করে মেসের দিকে যাচ্ছিলাম, শামীম….ইমরান স্যার আমাকে ডাকলেন, তিনি কোয়ার্টার মাস্টারকে বললেন…এত রাতে আর কাউকে ডেকোনা আমি শামীমকে নিয়ে যাচ্ছি, স্যার আমাকে বললেন রিলাক্স ….পিটি রিগ পরে আসো …..জরুরী কাজ আছে, মজাদার কেমন বাহারের পানটা বিঃস্বাদ লাগছে, বুঝেছি রাতের ঘুম হারাম হলো, দ্রুত মেসে গিয়ে পিটি রিগে সিভিল কেডস এবং জকিকেপ পরে গ্যাংওয়েতে এলাম, স্যার আমার হাতে একটা চাইনিজ মেশিন গান আর দুইটা ফুল লোড মেগজিন দিলেন এবং গলায় একটা ওয়াকিটকি, কোয়ার্টার মাস্টারকে স্পেশাল ডিউটি বুকে আমার নাম লিখতে বললাম, স্যার বললেন চলো, দুই জনেই সশস্র অবস্থায় জীপে চড়ে বসলাম, কোথায় যাচ্ছি স্যারকে জিজ্ঞাস করলামনা কারন তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, নেভিগেশন ডিপার্টমেন্টের এই অফিসার সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা আছে, তিনি অত্যান্ত কম কথা বলেন, খুব সাধারণ তার সব কিছু, ঢাকা কর্মিটোলা পুরানো বিমান বন্দরে প্রথম সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে তার সাথে একসাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার, কোন কাজকেই উনি ছোট মনে করেন না, স্বচ্ছ মন এবং অত্যান্ত নিরহংকারী মানুষ তিনি, সাধারণ নাবিকের মতো আমাদের সাথে মিলে মিশে কাজ করেছেন তখন, ড্রাইভার খুব দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে, ঈসাখানের ভিতর দিয়ে গাড়িটি বেরিয়ে পতেঙ্গা বীচের দিকে যাচ্ছিলো, স্যার আমাকে বললো মেগজিন লোড করো শামীম-আমি তাই করলাম, বুঝলাম আমরা কোন গুরুত্তপূর্ণ অপারেশনে যাচ্ছি, এক অজানা আশংকায় মনে দোলা দিতে লাগলো, পতেঙ্গা বীচের মোড়ে গাড়ি থামলো, গাড়ি থেকে নামা মাত্র দূরে সাগরের দিক থেকে থেমে থেমে গুলির শব্দ শুনতে পেলাম, স্যার ড্রাইভারকে নেভাল একাডেমী গার্ডরুমে যেতে বললো, গাড়িটা চলে যাবার পর হটাৎ জায়গাটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল, কোন মানুষজন নেই, অন্ধকার রাত্রি, চাঁদটাও আজ উঠেনি, ইমরান স্যার বীচের দিকে দ্রুত হাঁটতে শুরু করলো, তিনি হাঁটছেন আর আমি হাল্কা দৌড়াচ্ছি কারণ তিনি হাঁটছিলেন অনেক দ্রুত, যাহোক পতেঙ্গা বাঁধের উপর উঠে এলাম দুইজনে, “ইমরান” কে যেন স্যারকে নাম ধরে ডাকলো, আমি আর ইমরান স্যার চারিদিকে তাকালাম কাউকে দেখলাম না, অন্ধকারে একটা টং দোকানের আড়াল থেকে একজন লোক আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো…..ক্যাপ্টেন আব্দুল মুকিত, কমান্ডিং অফিসার বাংলাদেশ নেভাল একাডেমী, খুব রহস্যময় একজন মানুষ, আমরা দুজনেই ক্যাপ্টেনকে স্যালুট করলাম, অবাক হলাম এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে স্যার একা, ক্যাপ্টেন স্যার আমার দিকে একবার তাকালো, আমি সালাম দিয়ে দুই কদম পিছে চলে গেলাম, এই সেই ক্যাপ্টেন আব্দুল মুকিত-যিনি সেনা বাহিনীর দুইজন ক্যাপ্টেনকে নেভাল একাডেমীর লেকের পানিতে নামিয়ে দিয়ে দুই বাহিনীর ক্যাপ্টেন পদবীর পাথ্যর্কটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ক্যাপটেন আব্দুল মুকিত ইমরান স্যারকে খুব নিচু স্বরে নির্দেশনা দিয়ে বাঁধের উপর দিয়ে হেঁটে একাডেমীর দিকে চলে গেলেন, আমিও হাফ ছেড়ে বাচঁলাম, সিনিয়রদের কাছে শুনেছি বিপদজনক লোক তিনি, কিসে যে মাইন্ড করে বসেন বলা মুশকিল, পরবতীতে একটা ঘটনায় বুঝতে পেরেছিলাম আসলে তিনি অত্যন্ত অমায়িক মানুষ, ভাবগাম্ভীর্যের আড়ালে উনার ভিতরের শিশুটাকে লুকিয়ে রাখতেন, একদিন নেভাল একাডেমী ওয়ার্ডরুমের গেস্টরুমে অনির্বানের জন্য একটা গানের শুটিংয়ের অবসরে কমান্ডার আজাদ ভাবীকে (সাবেক ডিজি কোস্ট গার্ড) কিভাবে গানের জন্য ক্যামেরার সামনে পোজ দিতে হবে তা শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, এ দৃশ্য দেখে আমি, আজাদ ভাবি, “ওরে নীল দরিয়া” খ্যাত কমান্ডার হারেস স্যার এবং বিটিভির স্টাফরা অনেক হেসেছিলাম, যাহোক ইমরান স্যার বাঁধ থেকে নেমে গিয়ে তরমুজ ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে পতেঙ্গা বাঁধের উত্তর পশ্চিম দিকে হাঁটতে লাগলেন আর আমি উনাকে ফলো করছিলাম, প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার পর আমরা বাঁধের কাছাকাছি চলে এলাম, জোয়ারের পানির শব্দ কানে আসছিলো, স্যার ওয়াকিটকিতে খুব লো ভয়েসে বিএনএস তামজীদের সাথে কথা বলছিলেন, ওয়াকিটকিতে শুনলাম জাহাজটা সাগরে-আলফা এরিয়ায়, এবার বুঝলাম ফায়ারিং কোথা থেকে হচ্ছিলো, বিএনএস তামজীদ চোরাচালানির বোট তাড়া করছিলো, হটাৎ আমরা একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলাম, অনেকটা গাড়ির কষে ব্রেক করার মতো, বাঁধের উপর উঠে এলাম, কিছুদূর হাটঁতেই দেখতে পেলাম বাঁধের নিচে সাগরের দিকে একটা বিশাল কাঠের বোট কিছুটা কাত হয়ে গ্রাউন্ডিং হয়ে আছে, শেলও ওয়াটার, ভাটার সময় এখন, ইমরান স্যার গান কক করতে নির্দেশ দিলেন, আমি দ্রুত গান কক করে একটা ঝোপের আড়ালে গেলাম, উনি আমার পাশে, স্যার ইশারায় আমার মাথা নিচু করতে বললো, আসে পাশে কোন মানুষ দেখলাম না, প্রায় ঘন্টা খানেক এভাবে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকার পর মানুষের সাড়া শব্দ না পেয়ে গান তাক করে দুজনেই সতর্কতার সাথে বোটের কাছে গেলাম, দেখলাম বোটটা কাত হলেও উল্টে যাবেনা, ভেজা বালিতে আটকে আছে, অত্যান্ত দ্রুত গতিতে বোটটা গ্রাউন্ডিং হয়েছে এই জন্য শব্দ হয়েছিল, স্যার বোট সার্চ করতে চাইলো, কিন্তু উঠবো কিভাবে? প্রায় ২৫ ফিট লম্বা বোটের উচ্চতা অনেক, হেভি ডিউটি বোট, বোটে উঠার মতো কিছু পেলামনা, স্যার বললো..শামীম আমার কাঁধে উঠো, আমি ইতস্তত করছিলাম, মনে অস্বস্তি লাগছিলো, তিনি ধমক দিলেন, হাতে সময় নেই তাড়াতাড়ি করো, মেশিন গানটা পিঠে ঝুলিয়ে নিয়ে স্পেয়ার ম্যাগাজিনটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরলাম, স্যারের কাঁধে দুই পা দিতেই তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন, আমি বোটে উঠলাম, এক কদম এগিয়ে যেতেই তৈলাক্ত কিছুতে স্লিপ কেটে শব্দ করে বোটের ডেকে পড়ে গেলাম, ভাগ্য ভালো মেশিন গানটা পিঠে ছিলো, মুখে কামড়ে ধরা ম্যাগজিন ছিটকে গেলো, বুকে প্রচন্ড ব্যথা পেলাম, নিঃশাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো, ইমরান স্যার জিজ্ঞাস করলো- কি হয়েছে..শব্দ কিসের?….ব্যথায় আমার মুখ দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিলোনা, ব্যথায় চোখ থেকে পানি বের হচ্ছে, দুতিন মিনিট পর বুকের ব্যথা একটু কমলে বললাম.. কিছু হয়নি …স্লিপ কেটেছি …ওয়াকিটকিতে স্যার বোট সার্চ করতে বললো, অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছিলনা তার উপর টর্চ নিয়ে আসিনি, পকেটে ব্যক্তিগত লাইটার ছিলো, জ্বালালাম, লাইটারের আলোতে আমার বুকের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম, আমার সাদা টি-শার্টে তাজা রক্তে লাল হয়ে আছে, শিরদাড়া বেয়ে একটা শীতল অনুভূতি নেমে গেলো, আমি কি উইন্ডেড? বুকের কাপড় উঠিয়ে চেক করলাম, না? তাহলে?? মাথা ঝিম ঝিম করছিলো, লাইটার বেশিক্ষন জ্বালিয়ে রাখতে পারছিলাম না, একেতো বাতাস তারউপর আগুনের তাপ আঙুলে এসে লাগছিলো, একটু সময় নিয়ে লাইটার আবার জ্বালালাম, দেখলাম ডেকের উপর একটা লাশ, জমাট রক্তের উপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, তার রক্তের উপরেই স্লিপ কেটে পড়ে গিয়েছিলাম আমি, দেখে শরীরটা শির শির করে উঠলো, মেগজিনটা দেখতে পেলাম…কুড়িয়ে নিয়ে শর্ট পেন্ট এর পিছনের পকেটে রাখলাম, সময় নিয়ে সম্পূর্ণ বোটটা সার্চ করলাম, 555, বেনসন এন্ড হেজেজ সিগারেট, 7’O clock bleed এবং ওয়াকম্যান সিডি প্লেয়ার দিয়ে পুরা বোট ঠাসা, কয়েক কোটি টাকার জিনিস হবে, স্যারকে ওয়াকিটকিতে সব রিপোর্ট করলাম, আমি বোটের উপর স্যার নিচে, স্যার বললেন….উপরে থাকো… ওয়াকিটকি নিরব, ঝি ঝি পোকার শব্দের সাথে পতেঙ্গা বাঁধের উপর ঝাউ গাছগুলোর শো শো শব্দও কানে আসছিলো, হালকা শীত শীত লাগছিলো, রাত তিনটার দিকে স্যার নিরবতা ভেঙে বললো, “তোমার ভয় লাগছে শামীম” আমি বললাম… না স্যার, হু….কিছুক্ষণ পর আবার বললেন….লাশটাকে কিছু দিয়ে ঢেকে দাও, আমি বললাম ঢেকে দিব স্যার…ভোর হোক, মৃত লোকটার রক্ত শরীরে লেগে আছে স্যারকে বলিনি, তিনি আবার বললেন….আমি একাডেমীর দিকে যাব, ওয়াকিটকি অন রেখ, কিছু হলে আমাকে রিপোর্ট করো, বোটের কাছে কাউকে আসতে দিবেনা, বললাম … ওকে স্যার ….কি মনে করে স্যার দাঁড়িয়ে রইলো, আমি বললাম…স্যার যান… পারলে কারও কাছ থেকে একটা শার্ট নিয়ে আসবেন… শার্ট? .. শার্ট কেন? ….. আমি বললাম….এমনি…. আর কোন সমস্যা হলে আপনাকে জানাবো, যদি সিরিয়াস কিছু হয় ম্যাগজিন দুটাই খালি করে দিবো…. স্যার কিছু বললেন না…. সোজা বাঁধের দিকে হাঁটা দিলেন…..ইমরান স্যার চলে যাবার পর এক অজানা আতংক চেপে বসলো মনে…..সতর্ক হলাম…চারিদিকে দেখলাম…শুনশান নীরবতায় ভয় কাটাতে গুনগুন করে মান্নাদের “আমি সাগরেরও ভেলা”- গাইতে ইচ্ছে করছিলো… লাশের সামনে গান?… দমে গেলাম… লাশের পাশে কিছু রশি স্তূপ আকারে রাখা আছে, শরীরের ক্লান্তি কাটাতে রশির স্তূপের উপর বসে পড়লাম, লাইটার জ্বালালাম, লাশের দিকে তাকালাম,২৪-২৫ বয়সের যুবক, পিঠে বেশ কয়েকটা গুলি লেগেছে, শার্ট পেন্ট পরা, শার্টটা রক্তে লাল হয়ে আছে, উজ্জ্বল শ্যমলা মায়াময় চেহারা, আভিজাত্যের চাপ আছে চেহারায়, হাতে দামি ঘড়ি, আমার মত বয়স, তার কপালের চুলগুলু বাতাসে হালকা উড়ছে, যেন ঘুমিয়ে আছে ডাক দিলেই উঠে যাবে, জীবনের ক্লান্তি আর সুখের ভবিষৎ ছেড়ে বড় অসহায় ভাবে চিরদিনের জন্য শুয়ে আছে সে, আমি জেগে আছি, ছেলেটার শান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে মায়া লাগছিলো, দুবেলা ভালো খাওয়া,ভালো কাপড় আর ভালো থাকার জন্য আমরা কত কিছুইনা করি, ওকে দেখে আমার ভিতরের ভালো মানুষটা জেগে উঠলো, একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক থেকে, হয়তো তার মা,বাবা, ভাই-বোন,প্রিয়তমা স্ত্রী, সন্তানেরা তার পথ চেয়ে বসে আছে, তারা কি জানে তাদের প্রিয় মানুষটা বুলেট বুকে নিয়ে এখানে নির্বাক শুয়ে আছে? জীবনের লম্বা আশা গুলো এভাবেই নির্ধারিত মৃত্যুর কাছে শেষ হয়ে যায়, পূর্ব দিকে ভোরের আবছা আলো উঁকি দিচ্ছে, বোটের উপরের অংশ দেখা যাচ্ছে, বোটে উঠার একটা লম্বা লেডার দেখলাম, খুব ভারি, অনেকক্ষন চেষ্টার পর লেডার দিয়ে বোট থেকে নামার ব্যবস্থা করলাম, ভোর হয়ে এল, একটা গামছা পেলাম, ওটা দিয়ে আমার হাতে লাগা রক্ত মুছতে যেয়ে থেমে গেলাম, মৃত ছেলেটার কাছে গিয়ে ওর মাথাটা গামছা দিয়ে ঢেকে দিলাম, ভোরের আলোতে দেখলাম ইঞ্জিনরুমের আসে পাশে অসংখ গুলির চিহ্ন, বোটের পাটাতন রক্তে লাল হয়ে আছে, দেখে মনে হলো অনেক মানুষ আহত বা নিহত হয়েছে, লেডার দিয়ে বোট থেকে নিচে নেমে এলাম, জোরে শাস নিলাম, শুকনা ঘাস দিয়ে দুহাতে লেগে থাকা রক্ত মুছে ফেলার বৃথা চেষ্টা করলাম, বাঁধের উপর দিয়ে কয়েকজন মানুষ হেটে আসছে, সতর্ক হয়ে দ্রুত মেশিন গানটা হাতে নিলাম, পুলিশের লোক, সবাই কনস্টেবল, ওরা কাছে এসে স্যালুট করলো আমাকে, জিজ্ঞাসা করলাম……ইনচার্জ কে? ওদের একজন বললো…..স্যার আসছেন, আমি তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে বললাম, বোটের উপরে উঠে ওয়াকিটকিতে পুলিশের কথা ইমরান স্যারকে জানালাম, বললেন কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি আসছেন, বাঁধের উপর থেকে পুলিশের একজন এসআই নেমে আসছে, তাকে চিনে ফেললাম-আনোয়ার ভাই, চট্টগ্রাম বন্দর থানার এসআই…হালিশহর বাস স্ট্যান্ডে বাসা, লেঃ কমান্ডার আবছার (এল) (পরবর্তীতে কমডোর) ও মেজর আজিম (পরবর্তীতে অর্ডিনেন্স কর্নেল) উনাদের ছোট ভাই, আমার বড় ভাই, আমার মায়ের দিক দিয়ে ঘনিষ্ট আত্মীয় উনার আম্মা, ওরা মহেশখালির আমরা টেকনাফের, আবছার এবং আজিম ভাইয়ের সাথে আমি ফ্রি হলেও আনোয়ার ভাইকে ছোটবেলায় খুব ভয় পেতাম, পড়ার জন্য মারতো আমাকে, দুষ্টামির জন্য আবছার ভাইয়ের হাতেও মারও খেয়েছি তবে আনোয়ার ভাই বেশী মারতেন, জেঠিমা… ওনার আম্মা আনোয়ার ভাইকে এজন্য বকাও দিতো খুব…সেই রকম মাইরের পর আমার কপালে জুটতো এ-ব্লক আল-জিলানী স্টোরের ১০ পয়সা দামের নাবিস্কোর কোকোলা চকোলেট, ভাইকে দেখে মনটা ভালোলাগায় ভরে গেলো, ছোট বেলার অনেক পুরানো স্মৃতি মনে পড়লো আমার ….আমি মুচকি হেসে বোটের উপর থেকে নেমে আসলাম, বহুদিন পরে মুখুমুখি হলাম দুই ভাই, আমার রক্তমাখা কাপড় দেখে অবাক হলেন….ভাইয়া বললেন, কিরে তোর এই অবস্থা কেন? গুলি লেগেছে নাকি?….আমি হেসে বললাম..না ভাইজান…বললাম…বোটের উপরে একটা লাশ আছে…ওর রক্ত লেগেছে…এনকাউন্টার করেছিস?…নাহ …..কনস্টেবলরা অবাক হয়ে আমাদের দুই ভাইকে দেখছে…আমি তাকে বললাম…ভাইয়া তুমি একটু দাঁড়াও…আমার অফিসার আসছেন…আমি একটু হালকা হয়ে আসি, অনেকক্ষন ধরে প্রস্রাব আটকে রেখেছি, আমি হালকা হয়ে এসে একটা দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেলাম…এরি মধ্যে পুলিশের তিনজন কনস্টেবল ফুলে ফেঁপে গেছে, মৃত ছেলেটার ঘড়িটা এক কনস্টেবলের হাতে দেখে রক্ত মাথায় উঠে গেলো, নিজেকে অনেক কষ্টে সংবরণ করলাম, আনোয়ার ভাই একটু দূরে ওয়াকিটকিতে কথা বলছে, আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম, একদিকে ভাই অন্যদিকে চাকুরী, আনোয়ার ভাইকে ডাকলাম…ভাইয়া তোমার কনস্টেবলদের অবস্থা দেখো … আমরা নৌ বাহিনীর লোকেরা এই সব দেখে অভস্থ্য না…..আমার অফিসার দেখলে নির্ঘাত শুট করবে এদের…..ওদের অবস্থা দেখে ভাইয়া খুবই লজ্জা পেলো… নিচু স্বরে আমাকে বললো….তুই কিছু কর…..আমার ১০ মিনিটের অনুপস্থিতিতে তারা পুলিশের উনিফর্মের ফাঁকে ফাঁকে সিগারেট, ব্লেড, ওয়াকম্যান ঢুকিয়ে নিল, আমি তাদের কাছে ডেকে ভদ্র ভাষায় বুঝিয়ে বললাম… যা নিয়েছে সব যেন বোটে রেখে দেয়…পুলিশের যে লোকটা মৃত ছেলেটার হাত থেকে ঘড়ি খুলে নিয়েছিল তাকে কাছে ডাকলাম…..আপনি এই অমানবিক কাজটা কেন করলেন?….তিনি মাথা নিচু করে রইলেন….বললাম…যান ওর ঘড়িটা ওকে ফেরৎ দিয়ে আসুন…..ভাইয়া লজ্জায় অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে…. মুখ কালো করে ওরা বোটে উঠে সবকিছু রেখে আসলো…এরই মধ্যে ইমরান স্যার চলে এলেন সাথে কাস্টমসের দুইজন লোক, আমি স্যারকে স্যালুট করলাম, আমার দেখাদেখি ভাইও করলো, ইমরান স্যার আমার টি-শার্টের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আমার দিকে একটা সাদা শার্ট এগিয়ে দিলেন…কিছুই বললেননা….স্যারের স্বভাবই এরকম….আমি দ্রুত রক্তাক্ত টি-শার্টটা বদলে নিলাম…আনোয়ার ভাইকে স্যারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম…বললাম ডকইয়ার্ডে রেডিও শপের ওআইসি লেঃ কমান্ডার আবছারের ছোট ভাই এবং আমার বড় ভাই… স্যার অবাক হলেন .. ভাইয়ার সাথে হ্যান্ডশেক করলেন…ইমরান স্যার অতি দ্রুত বোটটি কাস্টমকে এবং লাশটি পুলিশকে বুঝিয়ে দিলেন… আমাকে বললেন চলো যাই…ভাইয়ের দিকে একবার তাকিয়ে স্যারের পিছনে বাঁধের দিকে হাঁটাতে শুরু করলাম… বাঁধের উপর উঠে পিছন ফিরে তাকালাম…আনোয়ার ভাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে…. ভাইয়ার চেহারা মলিন…আমি হেসে দিলাম…তিনিও হেসে দিলেন…বাসায় যেন কিছু না বলি এজন্যই তাকিয়ে ছিলেন…ছোট বেলার মারের মধুর প্রতিশোধ নিলাম…রাতের ক্লান্তি ভুলে মৃত ছেলেটার শুকনো চেহারাটা বার বার অন্তরে ভেসে উঠছিলো… খুব খারাপ লাগছিলো তার জন্য…জীবনটা এত কঠিন কেন ? ?
লেখক : আলমগীর মোহাম্মদ
সাবেক নৌবাহিনী কর্মকর্তা
