করোনা ও ভোগান্তি দুটোই যেন না বাড়ে

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : চলমান করোনা মহামারী মোকাবিলায় লকডাউন, কঠোর লকডাউন, কঠোর বিধিনিষেধ ইত্যাদি অভিধা এখন দেশের মানুষের কাছে এক নিষ্ঠুর তামাশায় পরিণত হয়েছে। যে নামে যে বিধিনিষেধই আরোপ করা হোক না কেন কাজের বেলায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিথিলতাই দৃশ্যমান। মহামারীর সোয়া বছর পেরিয়ে সারা দেশে গত এক সপ্তাহ ধরে শনাক্ত ও মৃত্যুর হার দুটোই বাড়তে থাকায় এখন করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা আরও প্রকট হয়েছে। গত এক মাস ধরে সীমান্তবর্তী উচ্চ সংক্রমণের জেলাগুলোতে চলছে এলাকাভিত্তিক লকডাউন। তাতেও আশানুরূপ ফল পাওয়া না যাওয়ায় সম্প্রতি ভারতীয় ডেল্টা ধরনের প্রকোপ ঠেকাতে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের সব ধরনের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয় ঘোষণা দিয়ে। কিন্তু এই ঘোষণাও যে বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরোতে পর্যবসিত হয়েছে তা বলা বাহুল্য। এই পরিস্থিতির মধ্যেই এলো আগামী সোমবার থেকে সারা দেশে এক সপ্তাহের জন্য ‘কঠোর লকডাউন’-এর ঘোষণা। কিন্তু এবারও প্রশাসনিক ও প্রায়োগিক শিথিলতার কারণে শেষতক করোনা ও জনভোগান্তি দুটোই বাড়বে কি না সেটাই এখন উদ্বেগের বিষয়।

করোনার বিস্তার রোধে সারা দেশে কমপক্ষে ১৪ দিন সম্পূর্ণ ‘শাটডাউন’-এর জন্য করোনা মোকাবিলা সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশের পর এই ‘কঠোর লকডাউন’-এর আদেশ জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ সময় সব ধরনের সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে। জরুরি পণ্যবাহী ছাড়া সব ধরনের গাড়ি চলাচলও বন্ধ থাকবে। শুধু অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে যানবাহন চলাচল করতে পারবে। তবে গণমাধ্যম এ বিধিনিষেধের আওতাবহির্ভূত থাকবে। এছাড়া এ সময়ে জরুরি কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়াও নিষিদ্ধ থাকবে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেছেন, দরকার হলে এই ‘কঠোর লকডাউন’-এর মেয়াদ আরও বাড়তে পারে। এবার বিধিনিষেধ কঠোরভাবে পরিপালন করতে বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি প্রয়োজনে সেনাবাহিনী মাঠে নামতে পারে বলেও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার বিদ্যমান ঘোষণা যেমন প্রায়োগিক শিথিলতায় ইতিমধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে, তেমনি আসন্ন কঠোর লকডাউনের ঘোষণার পর রাজধানী ছেড়ে ঘরমুখো মানুষের ঢলে পরিস্থিতির আরও অবনতি লক্ষ করা যাচ্ছে। অন্যদিকে, এসব বিধিনিষেধের গ্যাঁড়াকলে নিরুপায় সাধারণ মানুষ পড়েছে চরম ভোগান্তিতে। কারণ ঢাকা কিংবা বড় শহরগুলোতে সব স্থবির হয়ে গেলে কর্মহীন শ্রমজীবীদের গ্রামে ফেরা ছাড়া কোনো গতি নেই। আবার আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় চোরাপথে বাড়ি ফিরতে গিয়ে মানুষকে অন্তত পক্ষে পাঁচ থেকে সাত-আট গুণ বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। প্রশ্ন হলো এই বাস্তবতার যথাযথ প্রতিকারের পদক্ষেপ না নিয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আদৌ বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি?

বিগত সোয়া বছরের বেশি সময় ধরে মহামারীর জরুরি পরিস্থিতিতেও দেশের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও ভেন্টিলেটর সরবরাহ কিংবা আইসিইউ স্থাপনের কাজও সন্তোষজনক পর্যায়ে যায়নি। যার পরিণতি দেখা যাচ্ছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে। বিপুল বরাদ্দ সত্ত্বেও স্বাস্থ্য প্রশাসনের এমন অব্যবস্থাপনা যেমন দূর হয়নি, তেমনি নানা নামে নানাবিধ বিধিনিষেধ প্রয়োগ ও কার্যকর করার ক্ষেত্রেও জনপ্রশাসনের আশানুরূপ দক্ষতা বাড়তে দেখা যায়নি। এক্ষেত্রে বিশেষ করে দুই ঈদকে কেন্দ্র করে শহরবাসী কর্মজীবীদের গ্রামে ফেরা আর গ্রাম থেকে আবার শহরে ফিরে আসা নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকটভাবে দৃশ্যমান। বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, লকডাউনের সময় আর ঈদ ঘিরে ঘরমুখো মানুষের স্রোত আসলে ঝালমুড়ি ঝাঁকিয়ে মাখানোর মতো করোনা বিস্তারের ঝাঁকুনি দিচ্ছে দেশের মানুষকে। এই পরিস্থিতি আসলে করোনার বিস্তার ও জনভোগান্তি দুটোই বাড়াচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, ঘোষণা দিয়ে সড়কপথে দূরপাল্লার বাস চলাচল এবং নৌপথে যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার পরও বিকল্প পন্থায় ভেঙে ভেঙে সারা দেশে মানুষের চলাচল বন্ধ না করা যায় তাহলে সেটার দায় কে নেবে? ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ প্রসঙ্গে বলেছেন পুলিশ ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিলেও মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। তার বক্তব্যে চটক আছে বটে। কিন্তু বিধিনিষেধ কার্যকর করার ক্ষেত্রে যদি পুলিশ ও প্রশাসন বরাবরই ব্যর্থ হয় তাহলে এমন কঠোর কিংবা কঠোরতর লকডাউনের ঘোষণায় আসলে জনগণের কী লাভ হবে? অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত জনগণকেই নিজেদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু করোনাকালে বেকার হয়ে পড়া, আয় কমে যাওয়া, দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পক্ষে কি জীবিকার অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে নিজ নিজ সুরক্ষায় ঘরে বসে থাকা সম্ভব? সেটা যে সম্ভব না তা মহামারীর গত সোয়া বছরে বারবারই প্রমাণিত হয়েছে। ফলে জনগণকে দোষারোপ না করে মহামারী মোকাবিলার বাস্তবানুগ পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।