কবির হোসেন এর ভ্রমণ: গোলাপী প্রাসাদের আহসান মঞ্জিল

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৬ years ago

কবির হোসেন : মন ও মননের বিকাশে ভ্রমণের গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা জীবনের কতটুকু সময় ভ্রমণে ব্যয় করি, এর উপর নির্ভর করে গড়ে উঠে আমাদের মানষিক বিকাশ। আপনার অতিক্রান্ত দূরত্বের হিসাবে আপনার ঠিক ততটুকুই প্রাপ্য, আপনি যতটুকু ভ্রমণ করেছেন।

আজকে আপনাদের কাছে শেয়ার করবো, গোলাপী প্রাসাদের আহসান মঞ্জিল ভ্রমণের খুটিনাটি বিষয়। আমার গ্রামের বাড়ি উত্তরবংঙ্গে। কর্মের কারণে অনেক সময় ঢাকাতে কাটাতে হয়। করোনা মহামারীর কারণে দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়ে উঠেনি অনেকদিন যাবৎ। তাই অনেকদিন ধরেই মন আনচান করছিলো। ১৬ ডিসেম্বর সকালে হালকা নাস্তা সেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। মিরপুর-১০ থেকে সদরঘাটগামী বাসে চেপে বসি। গন্তব্য সদরঘাট বাসস্ট্যান্ড। এখন ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম স্বাভাবিক অবস্থায়। করোনা মহমারীতে ঝিমিয়ে পড়া ঢাকা শহর এখনও তার আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।

নানা ভাবেই ঢাকার যেকোন প্রান্ত থেকে খুব সহজেই এখানে আসতে পারবেন। ঢাকার বাইরে থেকে বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ যেকোনও বাহনে আসা যাবে। বাসে এলে মহাখালী থেকে আজমেরী পরিবহন ও স্কাইলাইন বাস জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসে। সেখান থেকে রিকশায় চড়ে যাওয়া যায়। গাবতলী থেকে ৭ নম্বর ও সাভার পরিবহন বাস আসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। তারপর রিকশায় চড়ে যেতে হবে। সায়েদাবাদ থেকে বেছে নিতে পারেন রিকশা বা উবার। ট্রেনে এলে কমলাপুর থেকে উবার বা রিকশা করে যাওয়া যায়। লঞ্চে এলে সদরঘাট টার্মিনাল থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে গোলাপী প্রাসাদের আহসান মঞ্জিল।

ইতিহাস বই ও অনলাইনের সুবাদে অনেক তত্ত্বই জানতে পারবেন এই গোলাপী প্রাসাদ সম্পর্কে। আহসান মঞ্জিল বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কুমারটুলি এলাকায় ঢাকার নওয়াবদের আবাসিক প্রাসাদ ও জমিদারির সদর কাচারি। বর্তমানে জাদুঘর। কথিত আছে, মুঘল আমলে এখানে জামালপুর পরগণার জমিদার শেখ এনায়েতউল্লাহ্’র রঙমহল ছিল এ স্থানটি। পরে তাঁর পুত্র মতিউল্লাহ্’র নিকট থেকে রঙমহলটি ফরাসিরা ক্রয় করে এখানে একটি বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। ১৮৩০ সালে খাজা আলীমুল্লাহ্ ফরাসিদের নিকট থেকে কুঠিবাড়িটি কিনে নেন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করে এটি নিজের বাসভবনে পরিণত করেন। এ বাসভবনকে কেন্দ্র করে খাজা আব্দুল গণি মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানী নামক একটি ইউরোপীয় নির্মাণ ও প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরী করান যার প্রধান ইমারত ছিল আহসান মঞ্জিল। ১৮৫৯ সালে আহসান মঞ্জিলের নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৮৭২ সালে সমাপ্ত হয়। আব্দুল গণি তাঁর পুত্র খাজা আহসানউল্লাহ’র নামানুসারে ভবনের নামকরণ করেন আহ্সান মঞ্জিল। ওই যুগে নবনির্মিত প্রাসাদ ভবনটি রঙমহল এবং পূর্বেকার ভবনটি অন্দরমহল নামে পরিচিত ছিল। আহসান মঞ্জিল দেশের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন। ১ মিটার উঁচু বেদির উপর স্থাপিত দ্বিতল প্রাসাদ ভবনটির আয়তন দৈর্ঘে ১২৫.৪ বর্গমিটার ও প্রস্থে ২৮.৫ বর্গমিটার। নিচতলায় মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উচ্চতা ৫ মিটার ও দোতলায় ৫.৮ মিটার। প্রাসাদটির উত্তর ও দক্ষিণ উভয় দিকে একতলার সমান উঁচু করে গাড়ি বারান্দার উপর দিয়ে দোতলার বারান্দা থেকে একটি সুবৃহৎ খোলা সিঁড়ি সন্মুখস্থ বাগান দিয়ে নদীর ধার পর্যন্ত নেমে গেছে। সিঁড়ির সামনে বাগানে একটি ফোয়ারা ছিল যা বর্তমানে নেই। প্রাসাদের উভয় তলার উত্তর ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে অর্ধবৃত্তাকার খিলান সহযোগে প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দা ও কক্ষগুলির মেঝে মার্বেল পাথরে শোভিত।

আহসান মঞ্জিলের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশ সরকার ভবনটিকে সংস্কার করে জাদুঘরে পরিণত করেছে। গণপুর্ত ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের দায়িত্বে এর সংস্কার কাজ ১৯৯২ সালে সম্পন্ন করে ওই বছরেরই ২০ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাসাদটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর-এর নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং এখানে একটি জাদুঘর স্থাপন করা হয়। আহসান মঞ্জিল জাদুঘর এ সর্বমোট গ্যালারির সংখ্যা ২৩ টি। গ্যালারি ১ ও ২ এ আহসান মঞ্জিলের পরিচিতি । প্রাসাদ ভবনের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যাদি তুলে ধরা হয়েছে এই দুই গ্যালরিতে। ৩ নং গ্যালারিতে ডাইনিং রুম। এটি হলো নবাবদের আনুষ্ঠানিক ভোজন কক্ষ। ৪ নং গ্যালারি গ্যালারি গোলঘর (নিচতলা)। আহসান মঞ্জিল প্রাসাদের শীর্ষে দৃশ্যমান সুউচ্চ গম্বুজটি এই গোলাকার কক্ষের ওপরেই নির্মিত।৫ গ্যালারি হলো প্রধান সিঁড়িঘর (নিচতলা)। বাংলার স্থাপত্যে এরূপ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কাঠের সিঁড়ি সাধারণত দেখা যায় না। ৬ নং গ্যালারি ও ৭ নং ইতিহাসে বিবেচনায় অনন্য। গ্যালারি ৮ এ দেখতে পারবেন বিলিয়ার্ড কক্ষ, বিলিয়ার্ড টেবিল, লাইট ফিটিংস, সোফা ইত্যাদি। ৯ গ্যালারি হলো সিন্দুক কক্ষ। যা ঢাকার নবাবদের কোষাগার হিসেবে ব্যবহৃত কক্ষটিকে তাঁদের প্রাচুর্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সাজানো হয়েছে। ১০ গ্যালারি এ নবাব পরিচিতি। গ্যালারি ১০ এ থাকা বড় বড় আলমারি ও প্রদর্শিত তৈজসপত্রগুলো নবাব শাসনামলের নিদর্শন দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে। গ্যালারি ১১ তে ঢাকার খাজা পরিবারের লোকেরা বিভিন্ন কাজে তাদের সমসাময়িক যেসব খ্যাতনামা ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিলেন তাদের দেখা যাবে। গ্যালারি ১২ খুবই গুরুত্ব বহন করে। এটি নওয়াব সলিমুল্লাহ স্মরণে। নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুরের প্রতি বিশেষ সম্মান দেখাতে কক্ষটিকে ‘সলিমুল্লাহ স্মরণে’ গ্যালারি হিসেবে সাজানো হয়েছে। গ্যালারি ১৩ এর কক্ষ দিয়ে নবাব পরিবারের সদস্যরা আহসান মঞ্জিলের পূর্বাংশের রঙমহল থেকে গ্যাংওয়ের মাধ্যমে পশ্চিমাংশে যাতায়াত করতেন। গ্যালারি ১৪ হলো হিন্দুস্তানি কক্ষ। গ্যালারি ১৫ হলো প্রধান সিঁড়িঘর (দোতলা)। প্রাসাদের নিচতলা থেকে ওপর তলায় ওঠানামার জন্য তৈরি কাঠের সিঁড়ির ওপরাংশের দৃশ্য। গ্যালারি ১৬ কে বলা যেতে পারে বিখ্যাত লাইব্রেরি কক্ষ। এটি ছিল নবাবদের ব্যক্তিগত প্রাসাদ লাইব্রেরি। ১৭ নং গ্যালারি ঢাকার নবাবদের তাস খেলার রুম। গ্যালারি ১৮ তে নবাবদের অবদান তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকায় পানীয় জলের ব্যবস্থা, নবাব কর্তৃক ঢাকায় পানীয় জল সরবরাহ বিষয়ক নিদর্শন ও তথ্যাদি দিয়ে গ্যালারিটি সাজানো হয়েছে। গ্যালারি ১৯ হলো স্টেট বেডরুম। বিশিষ্ট ও রাজকীয় অতিথিদের বিশ্রামের জন্য এ প্রাসাদে স্টেট বেডরুম নির্দিষ্ট থাকতো।

২০ নং গ্যালারিতে নবাবদের বিশেষ অবদান ঢাকায় প্রথম বিদ্যুৎ ব্যবস্থা প্রবর্তন বিষয়ক নিদর্শন, তথ্যচিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। ১৯০৪ সালে তোলা আলোকচিত্র অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। গ্যালারি ২২ এর গোলঘর এর কক্ষের উপরে নির্মিত প্রাসাদের শীর্ষে দৃশ্যমান সুউচ্চ গম্বুজটি। সর্বশেষের ২৩ নং গ্যালারি নাচঘর বা বলঘর। নবাবদের পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কক্ষটি সাজানো হয়েছে।

যেখানেই ঘুরতে যান না কেন, ঘুরতে গেলে অবশ্যই পরিদর্শনের সময়সূচি জেনে যাবেন। গ্রীষ্মকালীন সময়সূচি (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর): সকাল ১০.৩০ টা – বিকাল ৫.৩০ টা (শনিবার-বুধবার)। শুধুমাত্র শুক্রবার দুপুর ৩.০০ টা – সন্ধ্যা ৭.৩০ টা। শীতকালীন সময়সূচি (অক্টোবর –মার্চ): সকাল ৯.৩০ টা – বিকাল ৪.৩০ টা (শনিবার-বুধবার)। শুধুমাত্র শুক্রবার দুপুর ২.৩০ টা – সন্ধ্যা ৭.৩০ টা। বৃহস্পতিবার – সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন জাদুঘর বন্ধ থাকে। তবে বিশেষ দিবস যেমন ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চে কিংবা ১৬ ডিসেম্বর খোলা থাকে।

আহসান মঞ্জিলের পূর্ব পাশে যে ফটকটি উন্মূক্ত, তার ডান পাশে টিকেট কাউন্টার অবস্থিত। কাউন্টার হিসেবে যেসব কক্ষ ব্যবহৃত হচ্ছে, পূর্বে এগুলো সৈনিকদের ব্যারাক ও গার্ডরুম ছিল। টিকেটের মূল্য তালিকা: প্রাপ্ত বয়স্ক বাংলাদেশি দর্শক = ৫ টাকা জনপ্রতি, অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাংলাদেশি শিশু দর্শক (১২ বছরের নিচে) = ২ টাকা জনপ্রতি, সার্কভুক্ত দেশীয় দর্শক = ৫ টাকা জনপ্রতি, অন্যান্য বিদেশি দর্শক = ৭৫ টাকা জনপ্রতি, উল্লেখ্য যে, প্রতিবন্ধি দর্শকদের জন্য কোন টিকিটের প্রয়োজন হয় না ও পূর্ব থেকে আবেদনের ভিত্তিতে ছাত্র-ছাত্রীদের বিনামূল্যে জাদুঘর দেখতে দেয়া হয়। আহসান মঞ্জিল জাদুঘর ছাত্র-ছাত্রীদের বিনা টিকিটে প্রবেশ করতে দেয়া হয়ে থাকে। অগ্রিম টিকিটের কোন ব্যবস্থা নেই। তবে উল্লিখিত দিনগুলোতে আহসান মঞ্জিল বন্ধ হওয়ার ৩০ মিনিট আগ পর্যন্ত টিকেট সংগ্রহ করা যায়।

এখানে ঘুরতে এলে ইতিহাসের সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারবেন অনায়াসেই। তাই হাতে একদিন সময় নিয়ে ঘুরে আসুন এই গোলাপী প্রাসাদ থেকে। তবে অবশ্যই মাস্ক পরিধান করবেন, যেখানেই যান না কেন। আর এই গোলাপী প্রাসাদের ভিতরের ছবি উঠিয়ে আইন অমান্য করবেন না। তবে বিশাল ভবনটির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি উঠাতে ভুলবেন না।