টেকনাফ টুডে ডেস্ক |
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে নমনীয় আওয়ামী লীগ। কারণ বিদ্রোহী দমনে কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মুখেও এ নিয়ে কোনো সাড়া শব্দ নেই। কড়া কথাও শোনা যায়নি। অপরদিকে ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদ উন্মুক্ত থাকায় আওয়ামী লীগের তৃণমূলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিএনপিহীন নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী এখন আওয়ামী লীগ। ফলে নিজেরা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন। চরিত্র হননেও পিছপা হচ্ছেন না কেউ কেউ। এতে করে তৃণমূল আওয়ামী লীগে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য যুগান্তরকে বলেন, চেয়ারম্যান পদে বিদ্রোহী প্রার্থী এবং দুই ভাইস চেয়ারম্যান পদ উন্মুক্ত রাখায় কী ধরনের সমস্যা হতে পারে তা অবশ্যই আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও জমজমাট করতে দুই ভাইস চেয়ারম্যান পদ উন্মুক্ত রেখেছে আওয়ামী লীগ। আর চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থী দিলেও অনেকটাই উন্মুক্তই বলা যায়।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়াতেই বিদ্রোহীদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের ‘উৎসাহ’ দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। এতে তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়লেও তাতে ছাড় দিয়েই এগুতে চায় ক্ষমতাসীনরা।
দলটির নেতাদের মতে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফাঁদ তৈরি করতেই বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করে তারা দেশ-বিদেশে নেতিবাচক বার্তা দিতে চায়। তাই দলের তৃণমূলে সাময়িক অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যা হলেও নিজেদের অবস্থানেই থাকবেন তারা। তাদের ধারণা- এ নিয়ে সাময়িক ‘উত্তেজনাকর’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কিন্তু চূড়ান্ত মনোনয়ন শেষে এসব বিরোধ মিটে যাবে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে যদি নৌকার প্রার্থী না জিতে বিদ্রোহী প্রার্থী জিতে তাতেও আওয়ামী লীগেরই জয় হবে। কারণ তিনিও তো আওয়ামী লীগেরই। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যদি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিবাদ বাড়ে, তাতে বিএনপির লাভ কি? রেজাল্ট তো আর তাদের পক্ষে যাবে না। উপজেলা নির্বাচনে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল বলেন, প্রার্থী হওয়ার আগে বা প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আগে আমি কাউকে বিদ্রোহী প্রার্থী বলতে পারি না।
আমরা দেখছি কারা নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণার পরও বিদ্রোহ করে। এমন কেউ করলে বিষয়টি আমরা দেখব। এর জন্য প্রার্থিতা প্রত্যাহার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
জানা গেছে, মঙ্গলবার প্রথম ধাপের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার এবং সোমবার দ্বিতীয় দফার দাখিল শেষ হয়েছে। এতে অধিকাংশ উপজেলাতেই আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে নিজ দলের ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’। কোনো কোনো উপজেলায় রয়েছে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে এ পর্যন্ত ১৯৪ জন বিদ্রোহী প্রার্থীর খবর পাওয়া গেছে। মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ ও নির্বাচনের প্রস্তুতি দেখে বোঝা যাচ্ছে বাকি ধাপগুলোতেও এমন বিদ্রোহী থাকার আশঙ্কা আছে। নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্ট অংশ না নেয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, নির্বাচন জমজমাট করতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ছাড় দেয়ার সুযোগে সারা দেশের তৃণমূলে প্রার্থীরা পরস্পরকে ঘায়েল করতে নানাভাবে চরিত্র হননে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় প্রচারণায় একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগারের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এর আগে এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে জমা পড়ে হাজারও অভিযোগ।
এ অভিযোগ আসা এখনও অব্যাহত রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রীদের কাছেও জমা পড়ছে অভিযোগ। গণমাধ্যমের কাছেও প্রার্থীরা একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। আর এতে করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। তৃণমূলে তৈরি হচ্ছে গ্রুপ-সাব গ্রুপ।
পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তিনজন। কেন্দ্রে দলীয় প্রার্থীর নাম পাঠানো নিয়ে ঘটেছে ‘অদ্ভুদ’ সব ঘটনা। সেখানে ‘যুদ্ধাপরাধী পরিবারের সদস্য’ হিসেবে উল্লেখ করার পরও তারই নাম কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে পাঠানো হয়েছে।
জেলা আওয়ামী লীগ থেকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে পাঠানো তালিকায় প্রার্থীদের নামের সঙ্গে বিবরণী ও মন্তব্য লিখে দেয়া হয়েছে। এতে দেখা গেছে, খান মো. আবু বকর সিদ্দিক সম্পর্কে মন্তব্যের ঘরে লেখা হয়েছে- ‘প্রকাশ থাকে যে, খান মো. আবু বকর সিদ্দিক যুদ্ধাপরাধী পরিবারের সদস্য। তার দাদা মৃত অন্নাত আলী খান মির্জাগঞ্জ থানা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন।
তার বাবা আবুল হাশেম খান বিএনপির মির্জাগঞ্জ উপজেলার সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি (খান মো. আবু বকর সিদ্দিক) নিজেও ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রদলের সভাপতি পদ না পাওয়ায় সে ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করে। ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন।’ এছাড়া তার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের মধ্যে বিরোধ তৈরি এবং দলীয় নেতাকর্মীদের অত্যাচার-নির্যাতনেরও অভিযোগ করা হয়েছে।
এতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শাজাহান মিয়া ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কাজী আলমগীরের স্বাক্ষর রয়েছে। এছাড়া এতে মির্জাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. ইউনুছ আলী সরদারেরও স্বাক্ষর রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শাজাহান মিয়া যুগান্তরকে বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগ যা দিয়েছে আমরা সেটাই পাঠিয়েছি। তবে আমার বিশ্বাস এসব সত্য। এ তালিকায় বাকি দু’জনের মধ্যে একজন উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক গাজী আতাহার উদ্দিন আহম্মেদ। যিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শাজাহান মিয়া এমপির আপন বেয়াই।
উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশের অভিযোগ, তার নাম এক নম্বরে দিতেই ‘কৌশলে’ ভোটে না গিয়ে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নাম পাঠানো হয়েছে। যাতে যুদ্ধাপরাধীর পরিবারের সদস্য খান মো. আবু বকর সিদ্দিকসহ তিনজনের নামই কেন্দ্রে পাঠানো যায়। এ বিষয়ে আলাদা একটি অভিযোগ আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে জমা পড়েছে বলেও দলীয় সূত্র জানায়।
এদিকে, নাটোরের সিংড়ায় নৌকার প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণার কারণে ছাত্রলীগ নেতা কামরুল সরকারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আদেশ আলী ও সমর্থকরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এর প্রতিবাদে বুধবার বিকাল ৫টায় ঝাড়ু-বৈঠা মিছিলও করেছে ৮নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নয়ন আলী মণ্ডলের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সিংড়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দলীয় প্রার্থী বর্তমান উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিক। এর আগে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলের মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আকন্দকে সংবাদ সম্মেলন করে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার জাহাঙ্গীর খান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ নানাজনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ কেন্দ্রে জমা দিয়েছে প্রতিপক্ষ। এছাড়া নানা জায়গায় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনাও ঘটছে। ১১ ফেব্রুয়ারি লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলায় চেয়ারম্যান পদের মনোনয়ন ঘিরে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয়। এতে তিন পুলিশ সদস্য ও উপজেলা ছাত্রলীগ সম্পাদকসহ ৩৫ জন আহত হয়। এছাড়া মনোনয়নপত্র দাখিলকে কেন্দ্র করে বগুড়ার ধুনটে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ১৩ জন আহত হয়। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিরাজগঞ্জের একটি উপজেলার আওয়ামী লীগ সভাপতি যুগান্তরকে বলেন, বিপদে-আপদে যারা একসঙ্গে রাজনীতি করছি। এখন তারাই নিজেদের প্রতিপক্ষ। যদিও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রয়োজনের সময় ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং বাড়লে দলের প্রয়োজনে ভবিষ্যতে সবাইকে আবার এক করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এ সমস্যাগুলোতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের গুরুত্বের সঙ্গে নজর দেয়া দরকার।
