উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিবিরে গোপন বৈঠক !

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৯ years ago

নিজস্ব প্রতিনিধি, উখিয়া :
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের একটি মসজিদে রোহিঙ্গা জঙ্গীদের এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত উক্ত বৈঠকে রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত সৌদি নাগরিকের উপস্থিতিতে এ বৈঠকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানকে চরম ন্যাক্কার জনক বলে অভিহিত করেছে। উক্ত বৈঠকে আগামীতে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বিদ্যমান পরিস্থিতি ও বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। উক্ত বৈঠকে রোহিঙ্গা জঙ্গী ক্যাডারদের সংগঠিত করতে মাথা পিছু ৫ হাজার টাকা করে প্রায় ৩০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
কুতুপালং এ- ১ পাহাড়ের আমগাছ তলা সংলগ্ন একটি মসজিদে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন রোহিঙ্গা আওয়াজ জঙ্গী সংগঠনের উপদেষ্টা মৌলভী হামিদ হোছাইন। উপস্থিত ছিলেন, রোহিঙ্গা জঙ্গী হাফেজ নাঈম উল্লাহ, ত্বোহা মাঝি, হাফেজ জালাল, মৌলভী ডাঃ মোহাম্মদ শফি, মৌলভী মনজুর, রামু থোয়াইঙ্গাকাটা ইবনে আব্বাস (রা:) মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা শফি উল্লাহ, মৌলভী আবু সালেহ, হাফেজ রুহুল আমিন ও নাইক্ষ্যংছড়ির শফি উল্লাহসহ অর্ধ শতাধিক রোহিঙ্গা জঙ্গী ক্যাডার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা বংশোদ্ভুত জঙ্গি হাফেজ ছালাহুল ইসলাম ও চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতিতে অবস্থান নেওয়া ছালামত উল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় মাথা ছাড়া দিয়ে উঠছে রোহিঙ্গা জঙ্গিরা। এ জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধাচারণকারী রোহিঙ্গাদের উপর চালানো হচ্ছে কঠোর বর্বরতা। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সংস্থার পক্ষ থেকে এ জঙ্গি সংগঠনের পক্ষ থেকে উচ্চ পর্যায়ে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে গোপনে রোহিঙ্গা শিবিরে অনুষ্ঠিত বৈঠক থেকে মাথা পিছু ৫ হাজার টাকা ৫শ রোহিঙ্গা জঙ্গীদের মাঝে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার মতো বিতরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
উখিয়ার কুতুপালং, টেকনাফের নয়াপাড়া, লেদা, বালুখালী বস্তি ও শামলাপুরে প্রায় ৩২ হাজার বৈধ তালিকাভুক্ত শরণার্থীর পাশাপাশি বিভিন্ন বস্তি এলাকায় আরও প্রায় ২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। মূলত এসব অসহায় নিরীহ রোহিঙ্গাদের পুঁিজ করে মিয়ানমার ও এ দেশীয় কতিপয় মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনের মদদে রোহিঙ্গাদের নিয়ে নতুন করে জঙ্গি তৎপরতা চালানোর পরিকল্পনা করছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। এদের উদ্দেশ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফেরত না যেতে কঠোর চাপ ও বল প্রয়োগ করা, রোহিঙ্গাদের বিদ্যমান দূরাবস্থার চিত্র বর্হিবিশ্বে বিশেষ করে মুসলিম দেশ সমূহে ফলাও করে প্রচার করা, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অপরাপর বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সমূহের সাথে সমন্বয় করে বিদেশী ত্রাণ ও অনুদান আদায় করা, শরণার্থী শিবির ও বাইরে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গা মজলুমদের উপর বাংলাদেশ সরকারের ইন্ধন ও পশ্রয়ে স্থানীয় লোকজন, প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক চরম নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিষয় সমূহ তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যম বর্হিবিশ্বে প্রচার করা। রোহিঙ্গা জঙ্গিদের এসব উগ্র কাজে আর্ন্তজাতিক সমর্থন আদায়ে গোপনে সহযোগিতা করছে হল্যান্ড ভিত্তিক চ্যারিটি সংস্থা এমএসএফ, ফ্রান্স ভিত্তিক চ্যারিটি সংস্থা এসিএফ ও যুক্তরাজ্য ভিত্তিক একই সংস্থা মুসলিম এইড ইউকে। এসব এনজিওর কার্যক্রম নানা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় প্রধান মন্ত্রীর এনজিও বিষয়ক দপ্তরের নির্দেশ থাকা সত্বেও কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন অজ্ঞাত কারণে বন্ধ করছে না।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, “রোহিঙ্গা রিফুউজি ভয়েস ফর হিউম্যান রাইটস্ বা আরআরভিএইচআর” যাকে আরবিতে সাতুল্লাজিম এবং বাংলায় রোহিঙ্গাদের আওয়াজ নামে অবহিত করা হচ্ছে। উক্ত সংগঠনের ১৫ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি টেকনাফ-উখিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ও সংলগ্ন বস্তিতে জোরালো ভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ সংগঠনের চেয়ারম্যান হিসেবে মাওলানা আবু আনোয়ার ওরফে আনোয়ার ছাদেক, কো-চেয়ারম্যান মাওলানা মনজুর, জেনারেল সেক্রেটারী মাওলানা হামিদ, কো-জেনারেল সেক্রেটারী মাওলানা ফরিদুল ইসলাম, অফিস সেক্রেটারী মাওলানা মোহাম্মদ শফি, ফাইন্যান্স সেক্রেটারী হাফেজ হামিদ, কো-ফাইন্যান্স সেক্রেটারী মাওলানা বদরুল ইসলাম, ট্রেজারার মাওলানা জানে আলম, সদস্য আকতার হোছাইন, মোহাম্মদ সেলিমসহ রয়েছে নয়াপাড়া শিবিরের আয়ুব মাঝি, মাষ্টার মোহাম্মদ নুর, মাষ্টার মোহাম্মদ এনাম, টেকনাফের শামলাপুর এলাকার ডাঃ খাইরুল আমিন, মাষ্টার কামাল, আবু ছিদ্দিক, উখিয়ার মরিচ্যার হাজী ফজল আহমদ, কুতুপালংয়ের মোহাম্মদ ইউনুছ, মোহাম্মদ ইদ্রিস প্রমূখ।
রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী জঙ্গিদের রাম রাজত্ব চলছে। এখনো তাদের কথা মতো সব কিছু চলে। সরকারী প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী বা অন্য কোন সংস্থার নিয়ন্ত্রণ এখানে নেই। এসব জঙ্গি ক্যাডারের প্রকাশ্যে শারিরীক কসরত ও অন্যান্য ভয়ভীতি, আতংক সৃষ্টিকর কাজ করে থাকে বলে রোহিঙ্গারা জানান। আরএসও সহ একাধিক জঙ্গি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সমন্বয়ে জঙ্গি নেতা হাফেজ ছালাহুল রামু, উখিয়ায় বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা, সাঈদীর রায় নিয়ে সহিংষতার মামলায় গ্রেপ্তার হন। তার নির্দেশে চট্টগ্রামের ফায়জুল্লাহ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণের ত্রাণ সামগ্রী ও আর্থিক অনুদান পেয়ে যাচ্ছে এসব রোহিঙ্গারা। যদিও সেগুলো সাধারণ রোহিঙ্গাদের নামে আনা হয়ে থাকলেও বাস্তবে সাধারণ রোহিঙ্গারা তার সিকি ভাগও পায়না বলে রোহিঙ্গাদের অভিযোগ। চট্টগ্রামের ফায়জুল্লাহ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তার্কিশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, তুর্কি ডিয়ানাত ফাউন্ডেশন, কুয়েতের আবদল্লাহ আল নূরীর চ্যারিটি, ইন্টারন্যাশাল ইসলামিক চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশন, আবদল্লাহ আল মুতাওয়া চ্যারিটি ফাউন্ডেশন, মুয়াল্লিম আল জামিল, আরব আমিরাতের সারজাহ চ্যারিটি হাউস, একই দেশের দাতা আবদর রহমান মোহাম্মদ আত্ তামিমী, ওমানের দাতা মোহাম্মদ আদল্লাহ আল ফায়মী ছাড়া মধ্য প্রাচ্য ইউরোপ আমেরিকা ভিত্তিক বিভিন্ন মুসলিম দাতা ও দাতব্য সংস্থার কাছ থেকে মোটা অংকের অনুদান ও ত্রাণ নিয়ে রোহিঙ্গা জঙ্গীরা আতœসাত করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় তুলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের ইনচার্জ শামশুদ্দোজা জানান, এ ধরনের খবর আমার জানা নেই। সংশ্লিষ্ট অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওযা হবে। উখিয়া থানার ওসি মোঃ আবুল খায়ের, বর্ণিত জঙ্গি সংগঠনসহ অন্য কোন জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতা সম্পর্কে পুলিশ বা গোয়েন্দা সূত্রে সংবাদ আমার কাছে নেই। তবে যে কোন ধরণের জঙ্গি বা বিশৃংখলাকারীদের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের স্থায়ী করণের লক্ষ্যে জঙ্গী রোহিঙ্গারা এ ধরনের আচরণ করলে এ দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যেতে অনাগ্রহী হবে। তাই ওইসব রোহিঙ্গা জঙ্গীদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দাবী জানান।