টেকনাফ টুডে ডেস্ক : প্রতি পাঁচ বছর পর ডিসেম্বরে সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেওয়ার যে বিধান সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিতে বলা আছে তা এক প্রকার অকার্যকর হয়ে গেছে। কারণ অন্যান্য বছরের মতো এবারও হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বাকি কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের সম্পদের হিসাব দেননি। প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা সচিবরাও হিসাব দেননি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও হিসাব দেননি। তাদের দেখাদেখি অন্যরাও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অন্তত ১০টি মন্ত্রণালয়-বিভাগে খোঁজ নিয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে হিসাব বিবরণী জমা দেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা অকার্যকরই হয়ে গেছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যেমন অমান্য করা হচ্ছে, তেমনি আচরণবিধিকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে বলে মনে করেন প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব, জনপ্রশাসনে দুই-তিনজন উপ সচিব ও যুগ্ম সচিব, তিন-চারজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) এবং দু-তিনজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ৪-৫ জন কর্মচারী তাদের হিসাব বিবরণী জমা দিয়েছেন। অন্যান্য মন্ত্রণালয়-বিভাগেরও দু-একজনের বেশি কেউই হিসাব দেননি বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসন শাখা থেকে জানা গেছে।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ১৩-তে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সরকারি কর্মচারী প্রতি ৫ বছর অন্তর প্রদর্শিত সম্পত্তির হ্রাস-বৃদ্ধির হিসাব বিবরণী যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সরকারের কাছে দাখিল করবেন। প্রত্যেক সরকারি কর্মচারী চাকরিতে প্রবেশের সময় যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সরকারের কাছে তার অথবা তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন বা দখলে থাকা শেয়ার, সার্টিফিকেট, সিকিউরিটি, বীমা পলিসি এবং ৫০ হাজার টাকা বা ততোধিক মূল্যের অলঙ্কারাদিসহ স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তির ঘোষণা দেবেন। কিন্তু এমন বিধান মানছেন না কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর বিভাগে প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন দাখিল করাকেই অজুহাত দেখাচ্ছেন সরকারি চাকুরেরা। তাদের ভাষ্য, আয়কর রিটার্ন দাখিলের পর আলাদা করে সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তবে তাদের এ যুক্তি সঠিক নয় বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, কর্মচারীরা সম্পদের হিসাব দেন না। ফলে চাকরিতে যোগদানের পর তাদের সম্পদ বাড়ল কি কমল, তা জানা যায় না। অবশ্যই প্রতি ৫ বছর পর পর সম্পদের হিসাব দেওয়ার যে বিধান আছে, সেটি আরও যুগোপযোগী করে সম্পদের হিসাব নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে কর্মচারীদের স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সম্পদের হিসাবও নিতে হবে। তা হলে স্বচ্ছতা আসবে।
তিনি আরও বলেন, কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা সময়ের দাবি। এমন পদ্ধতি চালু করতে হবে যেন কেউ হিসাব না দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সেই কর্মচারীকে চিহ্নিত করা যায়। এতে সবাই হিসাব দিতে বাধ্য থাকবে। এ ছাড়া সম্পদের হিসাব না দিলে কী শাস্তি হবে, তা-ও নির্দিষ্ট করতে হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আলী আজম আমাদের সময়কে বলেন, সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিষয়ে আমরা আগামী সপ্তাহের মধ্যেই একটা মিটিং করব। আপনি মিটিংয়ের পর আমার কাছ থেকে ফলোআপ পাবেন। কেন হিসাব জমা দেয়নি সেটা মিটিংয়ে উঠে আসবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান মেয়াদে সরকার গঠনের ১০ দিনের মাথায় ২০১৯ সালের ১৭ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় দুর্নীতি বন্ধে সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে দুর্নীতি প্রতিরোধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিষয়টিও ছিল। তিনি তার বক্তব্যে বলেছিলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধেও অভিযান অব্যাহত থাকবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে, সেটি পুরো বাস্তবায়ন করা হবে।
গত বছরের ২৪ জুন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী নিতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের চিঠি দিয়েছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ওই চিঠির পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ সব মন্ত্রণালয়-বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর তাদের কর্মীদের সম্পদের হিসাব দিতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু বছর শেষ হলেও নির্দেশনার বাস্তবায়ন হয়নি।
কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিবছরই আয়কর রিটার্ন জমা দিই। সেখানেই সম্পদের তথ্য থাকে। সুতরাং আলাদা করে হিসাব দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। তবু প্রত্যেক দপ্তর/সংস্থার প্রধান চাইলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের সম্পদের হিসাব দিতে বাধ্য। কিন্তু শীর্ষ কর্মকর্তারাই এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেন না। ফলে কেউই হিসাব দিতে আগ্রহী হন না।
প্রশাসন ক্যাডারের এক কর্মকর্তা বলেন, আমি নিজেও হিসাব দেইনি। সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিষয়টিকে কেউই গুরুত্ব দেন না। যারা প্রশাসন চালান তারাও এ ব্যাপারে উদাসীন। এ কারণেই কেউ হিসাব দেন না। যারা আদেশ দেন তারাই যদি বাস্তবায়ন না করেন, তা হলে অন্যরা বাস্তবায়ন করবেন কোন দুঃখে!
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান আমাদের সময়কে বলেন, কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিধান আগেও ছিল। কিন্তু কেউই হিসাব দিতেন না। আগে ঠিক করতে হবে হিসাব কি অর্থবছর ধরে নেওয়া হবে, না ক্যালেন্ডার বছর ধরে নেওয়া হবে। সবাই যেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই হিসাব জমা দেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। লাখ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর সম্পদবিবরণী যাচাই করা সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যদি ৮-১০ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর তথ্য যাচাই করা যায়, তা হলে নিশ্চয়ই সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাবও নজরদারি করা সম্ভব। তবে এ জন্য অবশ্যই পুরো পদ্ধতি ডিজিটাইজড করতে হবে। তখন সবার সম্পদের হিসাব খুব সহজেই মনিটর করা সম্ভব।
