: ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৬৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯৪৯ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জন্ম নেয় দলটি। এরপর জাতি গঠনের সোপানে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে আওয়ামী লীগ।
দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণীতে সংগঠনের অগণিত নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীসহ দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশে পরিণত করবে। বাঙালি জাতির প্রতিটি মহৎ, শুভ ও কল্যাণকর অর্জনে আওয়ামী লীগের ভূমিকা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠালগ্নে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নাম থাকলেও ১৯৫৫ সালে এ দলটি ধর্মনিরপেক্ষতাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। এর পুনঃনামকরণ হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে ’৬৬-এর ছয় দফা এবং ’৬৯-এর গণআন্দোলনসহ দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি লাভ করে স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। দলটির নামকরণ হয় ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’। সংগ্রাম ও সাফল্যের ৬৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য আয়োজনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করার লক্ষ্যে বরাবরের মতো এবারও নেয়া হয়েছে বিস্তারিত কর্মসূচি।
১৯৪৭ সালে সম্পূর্ণ পৃথক দুটি ভূখণ্ড, স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতির অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র চার মাস ২০ দিনের মধ্যে তখনকার তরুণ যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠন করেন সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠন ‘পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’।
এরই ধারাবাহিকতায় পরের বছর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার স্বামীবাগে কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে গঠন করা হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ।
জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, প্রখ্যাত ভাষাসৈনিক টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং তরুণ যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে (কারাবন্দি ছিলেন) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় আওয়ামী (মুসলিম) লীগের প্রথম কমিটি।
আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে বাংলার জনগণকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে স্বাধিকার আদায়ের জন্য ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেন।
সেই ৬ দফা গণআন্দোলনের পথ বেয়েই আসে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। ’৭০-এর নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ ছিল তারই ধারাবাহিকতা। অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলার তৎকালীন সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের ২৬ মার্চ ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। দীর্ঘ ২৪ বছরের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সফল নায়ক ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই তো তিনি বাংলাদেশের জাতির পিতা।
দীর্ঘ ৬৮ বছরের পথপরিক্রমায় দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন রাজনৈতিক দলটিকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরুতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর অনেকটা অস্তিত্ব সংকটেই পড়ে আওয়ামী লীগ। দলের ভেতরেও শুরু হয় ভাঙন। এর মধ্যে আবদুল মালেক উকিল-জোহরা তাজউদ্দীনের দৃঢ়তায় সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করে দলটি।
১৯৮১ সালে দলের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দেশে ফিরতে সক্ষম হন বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই দলটির পুনঃজাগরণ হয়। এরপর এক দশক ধরে সারা দেশ ঘুরে দলকে সংগঠিত করেন তিনি। স্বৈরাচারবিরোধী তীব্র গণআন্দোলনও হয় তারই নেতৃত্বে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই ২১ বছর পর সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আবার সরকার গঠন করে দলটি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে পুনরায় নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে ক্ষমতাসীন দলটি।
সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো ক্ষমতার স্বাদ পায় আওয়ামী লীগ। এর ১৭ বছর পর ১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে প্রথম সরকার গঠন করে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দেশি-বিদেশি চক্রান্তে জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় দফাতেও ক্ষমতাচ্যুত হয় দলটি
। দীর্ঘ ২৪ বছরের নানা চড়াই-উতরাই, ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবারও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলটি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের স্মরণীয় অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
এরপর ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের দায়িত্বে আসেন। তারই সফল ও দূরদর্শী নেতৃত্বে তিন দফায় প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সুযোগ পায়।
সংগ্রাম ও সাফল্যের ৬৮তম পূর্তিসহ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপনের জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। কর্মসূচিতে আছে আজ সূর্যোদয়ের ক্ষণে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৯টায় ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণের মাধ্যমে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন।
দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার গৌরবোজ্জ্বল ৬৮ বছর পূর্তিতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের জন্য আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সব জেলা, উপজেলাসহ সবস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
