‘আঁরার শ্রম বাজার দখল গইজ্যে রোহিঙ্গারা’

লেখক: হুমায়ুন রশিদ
প্রকাশ: ৩ years ago

তারেকুর রহমান : ‘শ্রম বেচিতো আয়, রোহিঙ্গার হারণে শ্রম বেচিত ন পারি। রোহিঙ্গার দাপটে শ্রম বাজার আঁরার দখলত নাই। আঁরার শ্রম বাজার দখল গইজ্যে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের দাপটের কারণে শ্রম বিক্রি করতে এসে ব্যর্থ হই। শ্রম বাজার এখন আমাদের দখলে নেই। রোহিঙ্গারা কম পারিশ্রমিকের বিনিয়ে শ্রম বাজার দখল করে নিয়েছে।’ অশ্রুসিক্ত নয়নে আক্ষেপের কথাগুলো বলেছেন কক্সবাজার চকরিয়া থেকে প্রতিদিন শহরে শ্রম বিক্রয় করতে আসা দিনমজুর মো. দুলাল।

সোমবার (১ মে) সকালে শহরের লাল দিঘীপাড়ে মহান মে দিবসের মিছিলে এসব কথা বলেন এই দিনমজুর। এদিন সকাল থেকে মে দিবস স্মরণে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের দিনমজুর, শ্রমজীবী মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষে মিছিল-র‍্যালীতে মুখর থাকে।

পঞ্চাশোর্ধ দুলাল ২৭ বছরের বেশি সময় ধরে কক্সবাজার শহরে দিনমজুরের কাজ করেন। আগে ভালো পারিশ্রমিক পেলেও রোহিঙ্গা আসার পর তার দাম কমেছে বলে জানান তিনি। এক সময় দিনমজুর কাজ করার জন্য লোকজন খবর দিয়ে ডাকতো। এখন রোহিঙ্গা শ্রমিক হাতের নাগালে পাওয়ায় তাদের খোঁজখবর নেয় না কেউ।

তিনি বলেন, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ মুছে রওনা দেই কক্সবাজার শহরে। সূর্য মাথায় নিয়ে অপেক্ষায় থাকি শ্রম বিক্রয় করার জন্য। কিন্তু আমাদের পারিশ্রমিকের অর্ধেক টাকায় সহজে মিলে রোহিঙ্গা শ্রমিক। তাদের অবাধ বিচরণ শহরের আনাচে কানাচে। তাই আমাদের পরিবর্তে রোহিঙ্গাদের শ্রম কিনে বিত্তশালীরা। বেশিরভাগ সময় দিনের শেষে আমরা বাড়ি ফিরি খালি পকেটে।’

পূর্ব খরুলিয়ার দিনমজুর মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘প্রতিদিন ভোরে কক্সবাজার শহরের গুনগাছ তলা এসে আমরা জড়ো হই। কিন্তু কিছু দূরে রোহিঙ্গারা দাঁড়িয়ে থাকে। যাদের শ্রমিক প্রয়োজন হয় তারা আমাদের কাছে না এসে রোহিঙ্গাদের কাছে গিয়ে তাদের শ্রম কিনে। তাদের অভিযোগ আমরা নাকি টাকা বেশি দাবি করি। অথচ আমাদের ন্যায্য পারিশ্রমিকও দেয় না তারা। স্থানীয় দিনমজুরের শ্রম কিনতে দৈনিক ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা দিতে হবে তাই ৪০০/৫০০ টাকায় রোহিঙ্গা শ্রমিক কিনে তারা। অথচ রোহিঙ্গাদের কোনও অভাব নেই। তারা সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহায়তা পায়। আমরা তো কিছু পাই না।’

কক্সবাজার দিনমজুর ঐক্য পরিষদের আবদুস সালাম বলেন, ‘বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসে রোহিঙ্গারা শ্রমবাজার দখল করেছে। তারা আমাদের ভূমি-বনভূমি দখল করেছে। এখন আবার শ্রমবাজার দখল করতে আসছে। আমরা আজ আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হয়েছি। আমাদের ঘরে অভাব। সংসার, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে দিনমজুরি করি। কিন্তু আমাদের মূল্যায়ন না করে যাদের অভাব নেই (রোহিঙ্গা) তাদের শ্রম হিসেবে নিয়ে যাচ্ছেন লোকজন। এভাবে হতে থাকলে শ্রমিকরা না খেয়ে মরে যাবে। আমরা রোহিঙ্গা শ্রমিক নির্মূলসহ স্থানীয় শ্রমিকদের মূল্যায়নের দাবি জানাচ্ছি।’

এ ব্যাপারে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, ‘রোহিঙ্গারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার পরও স্থানীয় শ্রমবাজার দখল করার বিষয়টা জানলাম। ক্যাম্প থেকে বের হয়ে এসব রোহিঙ্গারা শহরে এসে ইজিবাইক (টমটম) চালানোর অভিযোগও পেলাম। স্থানীয় শ্রমবাজার দখল করার অধিকার তাদের নেই। কারণ তারা ভালোভাবে চলতে পারছে। তাদের অভাব নেই। এ বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। তাদের ব্যাপারে আমাদের অভিযান থাকবে। হাতেনাতে ধরা পড়লে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর আমাদের স্থানীয় শ্রমিকদেরও কর্ম পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি তার দায়িত্বের প্রতি সচেতন হতে হবে। মালিকদের সঙ্গে সদাচরণ করতে হবে। সবমিলিয়ে ‘শ্রমিক মালিক ঐক্য গড়ি, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলি’ এ প্রতিপাদ্যে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।’