মানুষ একে অপরের সম্পদ অন্যায়, মিথ্যা বা জানা,ইত্যাদির পরেও অপরের অধিকার আত্মসাৎ করাকে বান্দার হক বলে।
“তোমরা ইবাদত কর আল্লাহর, তার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সঙ্গে, নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট আত্মীয়-প্রতিবেশী, অনাত্মীয়-প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সঙ্গী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী।”
(সূরা নিসা-৩৬)
মহান আল্লাহর ইবাদত যথা: সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত ইত্যাদি ছাড়া বাকি সব যা মানুষকে কেন্দ্র করে ঘটে।
মহান আল্লাহর যদি অনুগ্রহ হয় আল্লাহর ইবাদত বা আল্লাহর হক ক্ষমা করতে পারেন অর্থাৎ আল্লাহর হক ক্ষমা করার এখতিয়ার আল্লাহর রয়েছে কিন্তু যেসব বান্দার হক নষ্ট করার গুনাহ ক্ষমা করার এখতিয়ার মহান আল্লাহ নিজ হাতে রাখেননি।
অতএব বান্দার হক নষ্ট করা বা খাওয়ার আগে তো একটু হলেও চিন্তা করা পরকালের বিশ্বাসী বান্দার উচিত।
এমন কি বন্দার হক রয়েছে যথাঃ আমরা তো বান্দার হকের ব্যাপারে গাফেলতিতে প্রচুর নিমজ্জিত।
যেমন: ঘুষ, মিথ্যা বলে টাকা খাওয়া, লেনদেনে ধোঁকা, বাটপারি, চিটারি করা, কথা দিয়ে কথা না রাখা, কথায় কথায় অভিশাপ দেওয়া, কথার খোটা বা গালি-গালাজ করা, হিংসা বা নিন্দা করা, হেয় মনে করে, মিথ্যা কথা বলা, কারো প্রতি মিথ্যারোপ করা, অপরের ক্ষতি করা, কাউকে ধোঁকা দেয়া, কারো সঙ্গে প্রতারনা করা, অন্যের অর্থের লোভ করা, গীবত বা পরচর্চা করা, শত্রুতামী করা ইত্যাদি অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত যা কিছু আছে তার হক রক্ষা করা বা আদায় করার নামই হলো বন্দার হক।
হাদিসে রয়েছে,
প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জবান (কথা) ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। আর মুহাজির সেই ব্যক্তি, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা সে পরিত্যাগ করে।
(সহীহ বুখারী- ৬৪৮৪)
এখন আসুন যদি আপনার ক্ষমতার অপব্যবহার অপরের ক্ষতিতে চপনি ব্যাস্ত হয়ে থাকেন আপনি কোন প্রকারের মধ্যে রয়েছে আপনার বিবেকের বিবেচনার জন্য রেখে দিলাম।
হাদীসে হজরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা কি জানো অভাবী কে? সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে তো সেই অভাবী যার টাকা-পয়সা ও অর্থ-সম্পদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের মধ্যে সেই সবচেয়ে বেশি অভাবী হবে, যে দুনিয়াতে সালাত, সিয়াম, জাকাত আদায় করে আসবে এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই লোকেরাও আসবে, যাদের কাউকে সে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারো মাল-সম্পদ আত্মসাত করেছে, কাউকে হত্যা করেছে, কাউকে আবার মেরেছে। সুতরাং এই হকদারকে তার নেকী দেয়া হবে। আবার ঐ হকদারকেও (পূর্বোক্ত হক্বদার যার ওপর জুলুম করেছিল) তার নেকী দেয়া হবে। এভাবে পরিশোধ করতে গিয়ে যদি তার (প্রথমতো ব্যক্তির) নেকী শেষ হয়ে যায় তবে তাদের (পরের হক্বদারের) গুণাহসমূহ ঐ ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
(সহীহ মুসলিম- ৬৪৭৩)
এই থেকে বুঝা যায়, কোনো ব্যক্তি সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত আদায় করেও বান্দার হক যথাযাথভাবে আদায় না করার কারণে জাহান্নামে যেতে পারে।
এখন আপনার নষ্ট বিবেকবুদ্ধির জন্য প্রশ্ন হচ্ছে অপরের হক খেয়ে পরকালের উত্তর কি হবে?
আপনার কি মনে হচ্ছে পরকাল অনেক দূরের স্থান।
নিশ্চিয় এমন চিন্তা তো একমাত্র মুশরিকের।
মৃত্যুকেও স্বরণে দিয়ে রাখলাম।
كُلُّ نَفْسٍ ذَآىِٕقَةُ الْمَوْتِ ؕ
“প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।”
“আল্লাহকে সে ভাবেই ভয় কর, যেভাবে স্বীয় সাধ্যমত তাঁকে ভয় করা উচিত।”
(আহসানুল বয়ান)
“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং তোমরা (মুসলিম) আত্মসমর্পণকারী না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ (সুরা আল-ইমরান- ১০২)
এখন আপনার নষ্ট বিবেকবুদ্ধির জন্যে উত্তর কি এটাই হচ্ছে অপরের হক খেয়ে অপরকে কষ্ট দিয়ে অপকর্মের করে অপরকে ক্ষতি করে মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত।
একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে দুজন মহিলার কথা বর্ণিত হয়েছে, যাদের একজন মসজিদে ঝাড়ু দিতো ও বেশি বেশি নফল ইবাদত করত। কিন্তু মূর্খ হওয়ার কারণে প্রতিবেশীকে কষ্ট দিত। অন্যজন নফল ইবাদত কম করলেও প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলত। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথম মহিলাকে জাহান্নামী ও দ্বিতীয় মহিলাকে জান্নাতী বললেন।
(আহমাদ, বায়হাক্বী)
এখান থেকে আপনার অবস্থান কোথায়??
আপনার নষ্ট বিবেকে এখনো জাগবে না??
দিন কত জনের অন্তরে আঘাত দিচ্ছেন উক্ত চিন্তা কি কখনো হয়েছে আপনার নষ্ট বিবেকে??
যদি হলেও মেনে চলার ঐ-ইচ্ছে কখনো কি হয়েছে??
অস্থায়ী দুনিয়ায় আর কত?
বিদায় হজের শেষ ভাষণে রাসূল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের পরষ্পরের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান পরষ্পরের জন্য হারাম’।
(সহীহ বুখারী, মুসলিম)
“অন্যত্র রাসূল (সা.) আবার বলেন- একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে হেয় মনে করে। এক মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও মান-সম্মান অন্য মুসলিমের জন্য হারাম।”
(সহীহ মুসলিম- ৬৪৩৫)
এখন যে অপরাধ সম্পদ খাওয়ার আগ্রহ নিয়ে বসে আছেন।
এগুলো কি হবে একটুও কি নষ্ট বিবেকের চিন্তা হবে??
‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই, তাই তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও আর আল্লাহকে ভয় কর যেন তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।”
(সূরা: হুজুরত -১০)
যারদের অন্ধত্ব বিস্তার তাদের জন্য একটু মেসেজ হলো।
‘আর তুমি তার অনুসরণ কর না, যে বেশি বেশি শপথ করে, লাঞ্ছিত, যে পশ্চাতে নিন্দা করে, একের কথা অপরের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়, যে ভালো কাজে বাধা দেয়, সীমালংঘনকারী, পাপিষ্ঠ, কঠোর স্বভাবের, তদুপরি কুখ্যাত।’ (সূরা:আল-ক্বালাম:১০-১৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় গোনাহ সম্পর্কে অবহিত করব না? তিনি বললেন, মিথ্যা কথা বলা কিংবা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।
(সহীহ মুসলিম- ১৬২)
আপনি যা বলতেছেন সত্য কি মিথ্যা আপনিই উপলব্ধি করেন তো।
যদি ক্ষমা চাওয়ার ইচ্ছে হয়।
(১) যার হক নষ্ট করা হয়েছে তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে হবে।
(২) এখন যদি মন থেকে অপরাধ স্বীকার করলাম, এত দেরিতে যখন (যার হক নষ্ট করলাম), সে মারা গেছেন; সেই ক্ষেত্রে তার উপযুক্ত উত্তরাধিকার এর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। (এই নজীর মক্কা বিজয়-এর পরে দেখা যায়)
(৩) এখন, যদি মন থেকে অপরাধ স্বীকার করলাম, এত দেরিতে যখন (যার হক নষ্ট করলাম), সে মারা গেছে বা পাওয়া যাচ্ছে না এবং তার উপযুক্ত কোনো উত্তরাধিকারকেও পাওয়া যাচ্ছে না; অপরাধটি আর্থিক ক্ষতি বিষয়ক হয়; তবে সমপরিমাণ অর্থ কোনো ভালো কাজে দিয়ে দিতে হবে। (যেমন: মসজিদ নির্মাণ) আর আল্লাহর কাছে মন থেকে ক্ষমা চাইতে হবে। যদি ব্যক্তিগত আক্রমণ হয় যেমন: অহংকার, হিংসা, ঘৃণা করা, গালি দেয়া, হেয় করা ইত্যাদি এর মৃত হয় তাহলেও সাদকায়ে জারিয়ায় কোনো খাতে তার জন্য ব্যয় করতে হবে আর আল্লাহর কাছে মন থেকে ক্ষমা চাইতে হবে। রাসূল (সা.) বলেন: একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে হেয় মনে করে। (সহীহ মুসলিম: ৬৪৩৫)
(৪) উপরের কোনো ভাবেই ক্ষমা না চাইলে, তাকে অবশ্যই কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে শেষ বিচারের সময় বিচারের মুখোমুখী হতেই হবে এবং বান্দার হক তাকে নিজের নেকী দেয়ার বিনিময়ে কিংবা ঐ বান্দার গুনাহের বোঝা বহন করার বিনিময়ে পরিশোধ করতে হবে।
অতএব অন্যের অধিকার খর্ব হতে পারে এরূপ অতীব ক্ষুদ্র কাজ হতেও বিরত থাকা মুমিন বান্দার অবশ্যই কর্তব্য। কোনো ছোট খাট যুলুমকে মোটেই ছোট মনে করা উচিত নয়।
দয়াবান আল্লাহ! যারা অপরের হক আত্মসাৎ করে তাদের হেদায়েত থাকলে হেদায়েত দাও যদি হেদায়েত না থাকে তাদের বিচার দুনিয়া ও আখিরাতে হাক্কু্ল্লাহ উপর।
রব্বে কারীম! প্রতিটি মুমিনকে বান্দার হকের প্রতি সচেনত হওয়ার তৌফিক দান করুক।
