বই পড়ার অভ্যাস

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

ইমদাদুল হক মিলন : কালের কণ্ঠ শুভসংঘের কাজে প্রায় প্রতি মাসেই বাংলাদেশের কোনো না কোনো জেলায় যাওয়া হয় আমার। সেই সব জায়গায় লক্ষ করি, আমার সময়কার বা আমার ঠিক পরের প্রজন্মের অনেকেই আমার বিভিন্ন বইয়ের কথা বলেন। কেউ ‘নূরজাহান’-এর কথা বলেন, কেউ কোনো কোনো গল্পের কথা বলেন, কেউ বা বলেন কোনো রোমান্টিক উপন্যাসের কথা। এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরাও বলেন, কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম। তাতে আমি পরিষ্কার বুঝতে পারি, এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের পড়ার অভ্যাস কমে গেছে।

বিদেশে গেলে বাঙালিরা অনেকেই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন বা কোনো না কোনো অনুষ্ঠানে তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়। এমন বহু প্রবাসী মানুষ আমাকে বলেছেন যে, বিদেশে আসার সময় তাঁরা হাতে করে আমার ‘পরাধীনতা’ বইটা নিয়ে এসেছেন। সেই বই পড়ে প্রবাসজীবনের নির্মমতা পদে পদে অনুভব করেছেন। যেসব প্রবাসী ‘পরাধীনতা’ বইটির কথা বলেন তাঁদেরও বেশির ভাগ আমার পরবর্তী প্রজন্মের। এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা ঠিক সেভাবে বলেন না। কেউ কেউ শুধু বলেন, আপনাকে টেলিভিশনে দেখেছি।

বই পড়ার অভ্যাস যে কমে গেছে, আমাদের বইমেলাগুলোতেও তা টের পাওয়া যায়। ’৯৩ সালের বইমেলায় শুধুমাত্র এক মেলাতেই আমার ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ বইটি ৮৭ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল। এখন দেশের যাঁরা জনপ্রিয় লেখক তাঁদের বই এক মেলায় কত কপি বিক্রি হয় ভাবলে দম বন্ধ হয়ে আসে।

অবস্থাটা এমন হয়েছে কেন? তার পেছনে অনেক কারণ আছে। টেলিভিশন একটা বড় কারণ। মোবাইল ফোন একটা বড় কারণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটা বড় কারণ। ছাপার অক্ষর থেকে মোবাইল স্ক্রিনে এসএমএস বা টুকটাক অন্যান্য লেখা পড়তেই এই প্রজন্ম যেন অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এই বিশেষ ক্ষেত্রটির প্রতি নজর দেওয়া উচিত। মোবাইল স্ক্রিনেই পড়ুক, ই-বুকসই পড়ুক বা অন্যান্য যে মাধ্যমেই হোক পড়ার অভ্যাসটা অন্তত থাকুক বা তৈরি হোক আমি এটাই চাই। সাহিত্য পড়তে হয়। পড়তে হয় নিজের মনোজগেক, ভাবনার জগেক আলোকিত করার জন্য। সাহিত্য মানুষের মনোজগত্ বদলে দেয়, ভাবতে শেখায়, বড় হতে শেখায়। আলোকিত মানুষ হতে শেখায়।

এই বইবিমুখকালেও সাত-আট বছর ধরে আমি লক্ষ করছি, বইমেলায় শিশু-কিশোরদের বইয়ের বিক্রি বেড়ে গেছে। মা-বাবা বা অভিভাবকরা শিশু-কিশোরদের নিয়ে বইমেলায় আসছেন এবং তাদের হাতে বই তুলে দিচ্ছেন। এ এক অতি শুভ লক্ষণ। অভিভাবক ও শিক্ষকরা সচেতন হলে আমাদের ছেলে-মেয়েদের বই পড়ার অভ্যাস নিশ্চয় তৈরি হবে। অভ্যাস তৈরি হয় ঘর থেকে, স্কুল থেকে। অভিভাবক ও শিক্ষকরা আমাদের সন্তানদের বই পড়ার অভ্যাসটা তৈরি করে দিন, এই আমার প্রার্থনা।

করোনার কারণে প্রাণের মেলা বইমেলা হচ্ছে শুরু হচ্ছে ১৮ মার্চ। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বইয়ের রূপ। ই-বুক, পিডিএফ, অন্তর্জাল—কত উপায়েই না বই পড়ছে এখনকার পাঠক! তাই বলে কাগজের বইয়ের আবেদন কি কমে? এ প্রজন্মের বই পড়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন আতিফ আতাউর

প্রতিবছর বইমেলায় হাজারো পাঠকের মিলনমেলায় পরিণত হয় বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। করোনার কারণে এবার বইমেলা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সেই শঙ্কা ঠেলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অবশেষে শুরু হচ্ছে প্রাণের মেলা বইমেলা। যাঁরা বইমেলা থেকে বই কেনার অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে কদিন পর। যাঁরা ‘পড়ার সময় পাই না’ বলে আক্ষেপ করেন—এই করোনাকাল তাঁদের জন্য এক প্রকার শাপে বরই বলা যায়। অফিসে কম হাজিরা, বাইরে বের হতে ভয়—এমন সময়ে বাসায় বসে অখণ্ড সময় কাটাতে বইয়ের চেয়ে ভালো বন্ধু আর কী হতে পারে! তা ছাড়া স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টগ্রাম, ইউটিউবের আগ্রাসন থেকে বাঁচতেও বইয়ে ডুব দেওয়ার অভ্যাস করুন।

বই পড়ার আগ্রহ জন্মাতে

মানুষের জীবনে প্রযুক্তিনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় বই পড়ার সময় বা সুযোগ কমে যাচ্ছে। শিশুরা বড় হওয়ার সময় বইয়ের চেয়ে স্মার্টফোনের ছোঁয়া পাচ্ছে বেশি। এর ফলেও নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ কম। এ জন্য ছোট থেকেই শিশুদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া জরুরি। অনেকের কাছেই এখন পাঠ্যপুস্তকের বাইরে পড়া ব্যাপারটা শুধুই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও অনলাইনে কিছু পত্র-পত্রিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রযুক্তির প্রতি মানুষের এই ঝোঁকের পরিণতি খুব ভালো নয়। মানুষের আচার-আচরণেও এর প্রভাব পড়ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার জানান, সুস্থ মানসিকতার জন্য বই পড়া জরুরি। মানুষের সৃজনশীল ও মননশীল হওয়ার মতো গুণাবলি বিকাশে বই পাঠ খুব কাজের। বই পড়ে যে নির্মল আনন্দ পাওয়া যায় তা অন্য কিছুতে সম্ভব নয়। পাঠের মাধ্যমেই মানুষের কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে সবচেয়ে বেশি। এ জন্য ছোট থেকেই শিশুর মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে দিতে হবে অভিভাবককেই। কারণ শৈশবই ব্যক্তিত্ব বিকাশের প্রথম পর্ব। শুরুতে শিশুকে বড় বড় ছবিযুক্ত বই, মজার ছড়ার বই ও কমিকসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। বড় হতে হতে বয়স বুঝে বই বেছে দিন। একবার বই পড়ার মজা পেয়ে গেলে ওরা নিজ থেকেই পড়তে শুরু করবে।

বই পড়ার অভ্যাস বাড়াতে প্রতিদিন পড়ার চেষ্টা করুন। হোক না কয়েক পাতা, তবু পড়ুন। এরপর ধীরে ধীরে পড়ার পরিধি বাড়াতে পারেন। বন্ধুদের কাছে কোন বই পড়বেন সে বিষয়ে পরামর্শ চাইতে পারেন। এ ছাড়া যে বই ভালো লাগে সে বই দিয়েই পড়া শুরু করতে পারেন। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় শুধু বই পড়ার জন্য ঠিক করতে পারেন। এ ছাড়া রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বইয়ের পাতায় চোখ বুলাতে পারেন। এভাবেই ধীরে ধীরে পাঠের অভ্যাস তৈরি করতে পারেন।

তরুণদের কী পছন্দ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী তাসফিয়া তাজরিন জানালেন, গল্প ও উপন্যাস সবচেয়ে বেশি পছন্দ। এর বাইরে খ্যাতিমান মানুষদের জীবনী ও সাক্ষাত্কার পড়তে পছন্দ করেন তিনি। ঢাকা কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুর রহমান হিমেলের পছন্দ থ্রিলার ও রোমান্স। এ ছাড়া গোয়েন্দা গল্পও টানে তাঁকে। বললেন, ‘ছোট থেকেই মাসুদ রানা ও তিন গোয়েন্দার ভক্ত আমি। শার্লক হোমসও পছন্দ। ইদানীং বেশি পড়ছি বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাস বিষয়ক বই।’ লালমাটিয়া মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী পুজা রাণী ঘোষের আবার কবিতা না পড়লে চলে না! তাঁর কথায়, ‘প্রতিদিন অন্তত একটি কবিতা পড়ি। নির্মলেন্দু গুণ, সুনীল গঙ্গোপ্যাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপ্যাধায়ের কবিতা বেশি ভালো লাগে।’ তরুণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তাঁরা গল্প-উপন্যাস-কবিতা পড়েন বেশি। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের আলোচিত বই ও আত্মোন্নয়নবিষয়ক বইও পড়ছেন তরুণরা।

কাগজের বইয়ের কদর বাড়ছে

অনেকেই আছেন কাগজের বই ছাড়া অন্য কিছু পড়েন না। কাগজের বই পাঠই তাঁদের কাছে আসল পাঠের স্বাদ দেয়। উত্তরার সাজিদুল ইসলাম জানালেন, ছোট থেকেই বইয়ের সঙ্গে পরিচয় তাঁর। কমিকস দিয়ে শুরু। বড় হওয়ার পর গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ইতিহাস, গবেষণামূলক বই—সবই পড়েন। প্রতিদিন রাতে বই না পড়লে তাঁর ঘুম হয় না। এ জন্য বালিশের পাশেই বই নিয়ে ঘুমান। তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে মোবাইল, কম্পিউটারে বই পড়ার সুযোগ থাকলেও সেগুলো তাঁকে খুব একটা টানে না। কিন্তু দুনিয়াজুড়েই শোরগোল ই-বুক ও স্মার্টফোনের কারণে কাগজের বইয়ের পাঠক ও ক্রেতার সংখ্যা নাকি দিন দিন কমছে। ছাপা বইয়ের মৃত্যু ঘটতে যাচ্ছে বলেও আক্ষেপ অনেকের। কিন্তু আমাদের বইমেলার বই বিক্রির পরিসংখ্যান বলে উল্টো কথা। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতবছর বইমেলায় বিক্রি হয়েছে মোট ৮২ কোটি টাকার বই। তার আগের বছর বিক্রি হয়েছিল ৭৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বই। অবাক করা তথ্য হচ্ছে ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে একুশে বইমেলায় মোট বই বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি। অর্থাত্ ২০১৪ সালে বিক্রি হয়েছিল ১৬ কোটি আর ২০২০ সালে এসে তা দাঁড়ায় ৮২ কোটি টাকায়। ফেসবুকে ‘বেচে দিন’ নামে একটি বিকিকিনি গ্রুপ পরিচালনা করেন রায়হান উদ্দিন। তিনি জানান, আমাদের গ্রুপের মেম্বাররা বাসায় থাকা অব্যবহূত জিনিস কম দামে বিক্রির জন্য ছবি তুলে পোস্ট করেন। অনেক সময় সেগুলো বিক্রিও হয়ে যায়। তবে বই বিক্রির পোস্টগুলো খুব কম সময়ের মধ্যেই ক্রেতারা পেয়ে যায়। যাঁরা কাগজের বই পড়তে বেশি পছন্দ করেন, তাঁরাই কম দামে পুরনো বই কিনে নেন।’

আছে ই বুক

তথ্য-প্রযুক্তির উন্নতি কাগজের বইয়ের কাটতিতে ভাগ বসালেও বই পড়ার সুযোগকে কিন্তু বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে কাগজের বইয়ের মতো বহন করার ঝামেলাও নেই ই-বইয়ের। সংগ্রহ করে রাখার জন্য তাক কেনার দরকার নেই। ভয় নেই হারিয়ে যাওয়ার বা চুরি হয়ে যাওয়ার। যখন-তখন যেখানে খুশি পড়া যায়। ই-বুক সহজলভ্য। একই বই, যেটা কাগজে ছাপা তার চেয়ে পিডিএফ কপি বা ই-বুক সংস্করণ কেনা যায় অনেক কমে। আলোচিত ও জনপ্রিয় অনেক বই ফ্রি পাওয়া যায় বিভিন্ন ওয়েবসাইটে। বুকল্যান্ড লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা মো. মাসুমুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের লাইব্রেরিতে ২০ হাজারের বেশি বই আছে। পাঠকরা ভর্তি হয়ে এখান থেকে বই নিয়ে পড়তে পারেন। সম্প্রতি লাইব্রেরিটিকে ডিজিটালাইজ করতে আমরা বইগুলো নিয়ে একটি অ্যাপ চালু করেছি। এর ফলে পাঠকরা এখন মোবাইলেও আমাদের লাইব্রেরির বই পড়তে পারবেন।’ এখন বিভিন্ন অ্যাপেও আছে ই-বুক পড়ার সুযোগ। গুডরিডস, সেই বই, বই ঘর, বেঙ্গল ই-বই, আলোর পাঠশালা, ওয়াটপ্যাড, পকেটসহ বিভিন্ন সাইটে পড়া যাবে এসব বই।