টেকনাফে সংখ্যালঘু রাখাইনদের শত বছরের পুরনো ভূ-সম্পত্তিতে ভূমিদস্যুদের থাবা ; দখলে নিচ্ছে জমিজমা-মার্কেট-জমিদার বাড়ী

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৪ years ago

নিজস্ব প্রতিনিধি : কক্সবাজারে টেকনাফে সংখ্যালঘু রাখাইনদের শত বছরের পুরনো কোটি টাকার ভূ-সম্পত্তি জবর দখলের অভিযোগ উঠেছে। ভূঁয়া ওয়ারিশ তৈরী করে জাল দলিল সৃজন করে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি চক্র এই জবর-দখল পক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রকৃত জমির মালিকদের অভিযোগ। আইন-আদালত ও প্রশাসনের আশ্রয় নিয়েও দখলবাজি ঠেকাতে পারছেন না জমি মালিকরা।

টেকনাফ পৌরসভার উপরের বাজার এলাকায় বসত-বাড়ি, জমিজমা, মার্কেট নিয়ে শত বছরের পুরানো রাখাইন জমিদার ক্যাজা প্রু চৌধুরীর বংশধরদের অবস্থান। বংশ পরস্পরায় যুগ যুগ ধরে এই সম্পত্তি ভোগ দখল করে আসছেন তার ওয়ারিশগন। সম্প্রতি সেই জমিজমার উপর কুনজর পড়েছে ভূমি দস্যু সিন্ডিকেটটির। তারা ভূঁয়া ওয়ারিশ তৈরী ও জাল দলিল সৃজন করে বসত-ভিটা, মার্কেটসহ ২ একর ৩২শতক জমি জবর দখলে তৎপর হয়ে উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএস ৭২০ ও ৯১০ নং খতিয়ানের ২ একর ৩২ শতক জমির স্বত্ত্ব রয়েছে রাখাইন জমিদার ক্যাম্রাউ চৌধুরীর দুই পুত্র ওখা খাইন চৌধুরী উরুফে মংগ্রী চৌধুরী ও কি মং চৌধুরীর নামে। কিন্তু ২০১৫ সালে প্রকাশিত দিয়ারা খতিয়ানে(নং ৮৯৬) বিএস খতিয়ানের মালিক উখা খাইনের স্থলে উথা থাউ এবং পিতা ক্যাম্রাউ চৌধুরীর স্থলে ফেম্রাউ চৌধুরী লিপিবদ্ধ হয়। এদিকে দিয়ারা জরিপটি ভূল হলেও মংগ্রী চৌধুরীর ছেলে ক্যাথিন জ্য চৌধুরীর জীবদ্দশায় কেউ দখলের সুযোগ পায়নি। কিন্তু গেলো বছর ক্যাথিন জ্য চৌধুরীর মৃত্যু হয় এবং পরিবারের অপরাপর সদস্যদের দীর্ঘ বছর প্রবাসে অবস্থান এবং দিয়ারা জরিপের ভূলের সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট দখলের উদ্দেশ্যে উথা থাউ চৌধুরী নামের একজন ভূয়া উয়ারিশ সৃষ্টি করে এবং ঝিনাইদাহ পৌরসভা থেকে বৌদ্ধ বিহার রোড , বড়ুয়া পাড়া, কক্সবাজার এর ঠিকানায় জন্ম নিবন্ধন (নং- ১৯৮৬২২১২৪৪৭১০৬৩৭৩) সনদ সংগ্রহ করে। কিন্তু এই ঠিকানায় উল্লেখিত ব্যক্তির খোঁজে পাওয়া যায়নি এবং উথ থাই নামে ঐ ব্যক্তিকে কেউ চেনেনা কেউ।

সেই ভূয়া ওয়ারিশ উথা থাউ কে দাতা ও টেকনাফ ডেইলপাড়া এলাকার মৃত আবুল হোসেনের ছেলে মৌলভী ছৈয়দ হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রহীতা করে আম মোক্তার নামা দলিল সৃজন করে, (যার নং- ১২৯০/২০২১ইং)। সে আম মোক্তার নামামূলে আরো বিভিন্ন জনের কাছে জমি ও দোকানপাট বিক্রি শুরু করে দেয়। এমনকি তারা সেখানে অবৈধ জবর দখল স্থাপনা নির্মান চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি জানতে পেরে প্রকৃত ওয়ারিশগন আদালতের শরনাপন্ন হয়ে ওই দলিলটি ভূঁয়া দাবী করে বাতিলের আবেদন করে এবং উল্লেখিত জমিতে ১৪৪ ধারা বজায় রাখার নির্দেশ দেয় আদালত। কিন্তু ভুমি দস্যু সিন্ডিকেটটি প্রভাবশালী মহলের ছত্র ছায়ায় লাটিয়াল বাহিনী নিয়োগ করে স্থাপনা নির্মান করে দখলদারিত্ব অব্যাহত রেখেছে। আর এই জবর-দখলের নেতৃত্ব দিচ্ছে মৌলভী হাবিব উল্লাহ প্রকাশ হাবিব শাহ নামে এক ব্যক্তি। প্রভাবশালী মহলের যোগ-সাজশে এই জবর-দখলের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় স্থানীয় আইন-শৃংখলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন জামির প্রকৃত মালিকরা। পরবর্তিতে গত ৯ই মার্চ ভূমি দস্যু সিন্ডিকেটের মূল হোতা মৌলভী হাবিব শাহসহ সিন্ডিকেটের বাকী সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কক্সবাজার পুলিশ সুপার বরাবরে লিখিত আবেদন করা হয়।
এই ব্যাপারে জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান বলেন- উক্ত দলিল নিয়ে ইতিমধ্যে প্রচুর ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে। আমি যোগদানের আগেই এই দলিলটি সম্পাদন হয়েছে। তবুও আমি এই দলিলটি নিয়ে দুপক্ষের চাপে রয়েছি। কোন জমির দাতা-গ্রহীতা ভূঁয়া সনদ অথবা এনআইডি দিয়ে দলিল সম্পাদন করলে সরকারীভাবে যাচাই করার কোন নিয়ম নেই। মুলত দলিল লিখকরাই সেসব যাচাই-বাচাই করে থাকেন। এছাড়া জমি আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সনাক্তকারীর উপরেই মূল দায় বর্তায়।
জানা গেছে এই র্ভঁয়া দলিলটি সম্পাদন করেন দেলোয়ার হোসেন নামে একজন দলিল লিখক। তিনি আবার নিজে ঐ জমির ভূঁয়া দাতা উথা থা চৌধুরীর সনাক্তকারীও।

এদিকে, আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভূমি দস্যু চক্রটি হাবিব শাহ ও সন্ত্রাসী ৭ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ প্রকাশ লাস্ট্রিপের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে ২২ জানুয়ারী জমিটিতে ঘেরা-বেড়া দিয়ে জায়গাটি তাদের দখলে নেয় এবং ইট কংক্রিট দিয়ে স্থাপনা নির্মান শুরু করে।

মৌলভী হাবিব ও নূর মোহাম্মদ উরফে লাস্ট্রিপ উক্ত জমিতে ২৫-৩০ বছর ধরে যেসব পুরাতন ভাড়াটিয়া দোকানদার রয়েছে তাদেরকেও পুরনো তারিখে নতুন করে চুক্তি করতে ভয় ভিতি প্রদর্শন করে যাচ্ছে। দোকান মালিকরা চুক্তি করতে অপারগতা জানালে রাতের আধারে নূর মোহাম্মদ লাস্ট্রিপের নেতৃত্বে দোকানে তালা লাগিয়ে দেয়। স্থানীয় কাউন্সিলরের হস্তক্ষেপে দুই দফা তালা খোলা হয়।

স্থানীয়দের মতে, নূর মোহাম্মদ লাস্ট্রিপ ৭নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ট জন বলে পরিচিত।

আপরদিকে স্থানীয়রা আরো জানায়, এক সময়ের মাইক দোকানদার মৌলভী হাবিব প্রকাশ হাবিব শাহ ধর্মীয় লেবাজকে পুঁজি করে ইতিপূর্বেও বিভিন্ন জনের জমিজমা কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযুক্ত নুর মোহাম্মদ অভিযোগ অস্বীকার করেন। অপরদিকে মৌলভী হাবিব ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য জানা যায়নি।

জানতে চাইলে জাল দলিল গ্রহীতা সৈয়দ হোসেন তাদের জমি দাতা এই জমির প্রকৃত ওয়ারিশ বলে দাবী করেন। তবে দলিলের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলাকালীন জমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে কোন সদুত্তর দিতে পারেন নি।

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী নুরুল বশর বলেন, যেখানে সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। ঠিক এমন সময় ভূমিদস্যু চক্র সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ করে বিতাড়িত করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে। এসব বন্ধে প্রশাসনের সংখ্যালঘুদের পাশে থাকা উচিত।
টেকনাফ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় পৌরসভার বাসিন্দা মোজাম্মেল বলেন, জন্ম থেকে আমরা দেখে আসছি এসব ভূমি গুলোতে রাখাইন জমিদার পরিবারের বসতি। এসব রাখাইন জমিদার ক্যাজাপ্রু, ক্যাম্রাউ চৌধুরীর আদি ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ। আজ প্রভাব খাটিয়ে তাদের সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে বিতাড়িত করা খুবই দুঃখ জনক। উথা থাউ নামে যে ব্যক্তির নামে যে জমি দখল করা হচ্ছে আমরা কোন দিন তার নাম শুনিনি আর চিনিও না।
টেকনাফ উপজেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাধারণ সম্পাদক এবিএম আবুল হোসেন রাজু বলেন, যেকোন ধরনের জবর দখল বেআইনী। কেরো কোথাও স্বত্ব থেকে থাকলে আইন-আদালত ও সালিশের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।

রেফারিজ এসোসিয়েশনের সদস্য উক্ত জমিতে দুই পুরুষ ধরে বসবাসকারী বাবুল শর্মা জানান, জমিদার ক্যাম্রাও চৌধুরী তার পিতা রেফতি শর্মাকে প্রায় ৭০ বছর আগে এখানে বসবাস করতে দেন সেই থেকে বসবাস করে আসছেন । গত কিছুদিন আগে এক রাতে জালিয়াপাড়া এলাকার কিছু লোক তার পাশের জমি গুলো দখল করে নেয়। এখন তাদেরকেও উঠে যেতে হুমকি দিচ্ছে।

রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রবীণ ব্যক্তি ও টেকনাফ সরকারী মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক মং উইন মিনথ প্রকাশ মগ স্যার বলেন, রাখাইন নাম বাংলা্য় লিখতে গেলে প্রায় সময় ভূল হয়ে থাকে। মংগ্রী চৌধুরীর দালিলিক নাম ছিল উখ্যাখাইন চৌধুরী। ভূমি জরিপে নামের ভূলের সুযোগ নিচ্ছে ঝামেলার সৃষ্টি হয়েছে। উথা থাউ নামে কাউকে চিনেন না বলে জানান তিনি।

টেকনাফ থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমানের কাছে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিষয়টি জানতে চেয়ে বেশ কয়েক দফা ফোন করেলেও এই সংক্রান্ত প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে তিনি ব্যবস্তার অজুহাতে কৌশলে এড়িয়ে যান।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজ চৌধুরীর কাছেও লিখিত অভিযোগ দেয়া হলেও মুঠোফোনে তিনি জানান দখলবাজির বিষয়টি তাকে কেউ জানাননি তবে অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। (তিনি সম্প্রতি বদলী হয়েছেন) জমির মালিকেরা তাকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে দাবী করেছেন এবং সেই কপি প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

অপরদিকে জেলা পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামানের কাছেও গত ৯ মার্চ ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ প্রদান করেছেন জমি মালিকরা। কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান, জমি সংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশের যতটুকু এখতিয়ার রয়েছে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে টেকনাফ থানায় পাঠানো হয়েছে।

এদিকে জমি মালিক মৃত ক্যা থিন জ্য চৌধুরীর স্ত্রী খিন ওয়ান মে জানান, ভূমিদস্যুদের ভয়ে তিনি নিজ বাড়ীতে যেতেও ভয় পাচ্ছেন। ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। ভূমিদস্যুরা জমিজমা ও দোকান-পাট দখলের পর এবার জমিদার বাড়িটিও তাদের দাবী করে আদালতে মামলা করেছে বলে জেনেছি।