টেকনাফে বন্দুক যুদ্ধের পর নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নুরুল আলম ডাকাত যুগের অবসান!

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৭ years ago

হুমায়ূন রশিদ : টেকনাফে র‌্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধে আনসার ক্যাম্প হামলাকারী, অস্ত্র ও বুলেট লুট মামলার আসামী, কথিত আরসা কমান্ডার ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণকারী ডাকাত সর্দার ডাকাত নুর আলম ওরফে কমান্ডার জুবাইর বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে বিদেশী পিস্তল ও বুলেট উদ্ধার করা হয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অতিষ্ঠ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠে সাধারণ মানুষ।
জানা যায়, ২২ ফেব্রুয়ারী সকাল ভোর সাড়ে ৫টারদিকে উপজেলার দমদমিয়া ১৪নং ব্রীজ সংলগ্ন বেত বাগান এলাকায় র‌্যাব-১৫ এর টেকনাফ ক্যাম্পের কমান্ডার লেঃ মির্জা শাহেদ (পিপিএম,বার) এর নেতৃত্বে একটি আভিযানিক দলের সাথে কুখ্যাত ডাকাত দলের সাথে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। র‌্যাবের গুলিবর্ষণে নিরুপায় হয়ে ডাকাত দল পিছু হটে যায়। ঘটনাস্থল তল্লাশী করে ২টি বিদেশী পিস্তল, ১৩ রাউন্ড বুলেটসহ নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পের এইচ বøকের এমআরসি নং-৩৪৮৮১, শেড নং-১২৩০, ৬নং রোমের বাসিন্দা মৃত হোসেন প্রকাশ লাল বুইজ্জার পুত্র ডাকাত নুরুল আলম (৩০) এর মৃতদেহ উদ্ধার করে। লেদা রোহিঙ্গা বস্তির সভাপতি মাষ্টার আব্দুল মতলব নুরুল আলম ডাকাতের লাশ সনাক্ত করেন। মৃতদেহ উদ্ধার করে পোস্ট মর্টেমের জন্য মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। লেঃ মির্জা শাহেদ এই অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করেন। কুখ্যাত ডাকাত সর্দার, আনসার কমান্ডার খুন, অস্ত্র ও বুলেট লুট, দমদমিয়া হতে উলুচামরী পর্যন্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণকারী নুর আলম ডাকাত ওরফে কমান্ডার জুবাইর নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়ায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ উল্লাসে মেতে উঠে। পোস্টমর্টেম শেষে বাদে এশা এইচ বøকের গোরস্থানে নামাজে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়েছে। এরফলে নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে ডাকাত নুরুল আলম যুগের অবসান ঘটেছে বলে মনে করেন।
উল্লেখ্য, গত ২০১৬ সালের ১৩ মে ভোররাত সোয়া ২টারদিকে টেকনাফের নয়াপাড়া রেজিষ্টার্ড শরণার্থী ক্যাম্পের এই ডাকাত নুরুল আলমের নেতৃত্বে নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে একদল স্বশস্ত্র ডাকাত হানা দিয়ে আনসার ব্যারাকে হানা দিয়ে টাঙ্গাইলের শফিপুরের মৃত শুক্কুর আলীর ছেলে ও আনসার কমান্ডার আলী হোসেন (৫৫) এর উপর হামলা চালায়। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। এসময় ১১টি অস্ত্র ও ৬শ ৭০ রাউন্ড বুলেট লুট হয়। মিয়ানমারের উগ্রপন্থী সংগঠন আল ইয়াকিনের ব্যানারে মিয়ানমার সীমান্ত চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নেয়। শরণার্থীদের সাথে এই পারে পালিয়ে এসে নানা অপকর্ম শুরু করে। এরপর র‌্যাবের একটি দল নাইক্ষ্যংছড়িতে অভিযান চালিয়ে নয়াপাড়া ক্যাম্প হতে লুট হওয়া অস্ত্রসহ তাকে আটক করে। কিছুদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে এসে নানা অপকর্ম শুরু করে।
এরপর ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট ভোররাতে উগ্রপন্থী সংগঠন আরসার ব্যানারে মিয়ানমারের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকার ২৫টি সীমান্ত চৌকিতে স্বশস্ত্র হামলায় অংশ নেয়। যার ফলে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী গণহারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর হামলা ও নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে। উক্ত নুরুল আলম ডাকাত নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে দমদমিয়া নেচারপার্ক, জাদিমোরা, শালবন, নয়াপাড়া, মোচনী, পশ্চিম লেদা, আলীখালী, রঙ্গিখালী, গাজীপাড়া ও উলুচামরী এলাকার চিহ্নিত অপরাধীদের নিয়ে পাহাড়ে গড়ে তোলে টুইন নেটওয়ার্ক গ্রæপ। আরসা কমান্ডার ও কুখ্যাত নুরুল আলম ডাকাত তথা কমান্ডার জুবাইরের স্বশস্ত্র বাহিনী ভাড়াটে খুনী, ডাকাতি, অপহরণ ও মুক্তিপণ এবং মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। নুরুল আলম বাহিনীর স্বশস্ত্র গ্রæপের দাপটে সাধারণ রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা পর্যন্ত জিম্মি হয়ে পড়ে। স্থানীয় ইয়াবা কারবারী ও টাকাওয়ালা লোকজনকে অপহরণ করে পাহাড়ে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের পর ছেড়ে দেয়।
এই নুরুল আলম সিন্ডিকেটের ৩৫জন স্বশস্ত্র গ্রæপের অপতৎপরতায় রোহিঙ্গাসহ পাশর্^বর্তী গ্রামের সাধারণ মানুষ জিম্মি অবস্থায় ছিল। আইন-শৃংখলা বাহিনী তার বিরুদ্ধে কঠোর হলে মোটাংকের টাকা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বশে রাখতো। প্রশাসনের কেউ তার বিরুদ্ধে গেলে ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়। এক সময়ের পুলিশের আইসি এই ডাকাত নুরুল আলমের বিরুদ্ধে অবস্থান করায় নানা ষড়যন্ত্র এবং প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়। শেষ পর্যন্ত আইসি কবির হোসেন বদলীয় হওয়ায় এই ডাকাত নুরুল আলম স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে। এই ডাকাত নুরুল আলম আইন-শৃংখলা বাহিনীর অভিযান থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য পাশর্^বর্তী এলাকার চিহ্নিত অপরাধীদের সাথে ব্যবসায়িক, ধর্মীয় ভাই-বোনের সম্পর্ক গড়ে তোলে। গত ২/৩ মাস আগ হতে জাদিমোরা, নয়াপাড়া, মোচনী, লেদা, আলীখালী, রঙ্গিখালীতে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, ভাড়াটে হিসেবে গুম ও খুন, মাদকের বড় বড় চালান ছিনতাই, মাদক চালানের লেন-দেনের বকেয়া টাকা উদ্ধার কাজে এই চক্রের সদস্যরা সরাসরি জড়িত ছিল।
গত ২০১৮ সালের জুন মাসের শেষের দিকে রহিম উল্লাহ-রশিদুল্লাহ নিখোঁজ হয়। ২২দিন নিখোঁজ থাকার পর নাফনদী হতে রশিদুল্লাহ রক্তাক্ত ও ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় নুরুল আলমের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল। অথচ প্রাণের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছেনা। একই বছরের ১৬ জুলাই একটি হিরের আংটির জন্য এইচ বøকের তজল আহমদের পুত্র কেফায়ত উল্লাহ (৩০) কে গুম করে ফেলে। একই শেষের দিকে মিয়ানমার সীমান্তে গিয়ে ৬ লাখ ইয়াবার চালান ছিনতাই করে নিয়ে আসে। যা ক্যাম্পের “ছৈয়দ আলম মাঝি ” নামের হেড মাঝির মাধ্যমে বিক্রির গুঞ্জন উঠে। এই নুর আলম গ্রæপের স্বশস্ত্র সদস্যরা ক্যাম্প ও পাহাড় কেন্দ্রিক অপরাধ করে ক্ষান্ত নয়, গ্রামে-গঞ্জে ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে নানা খুন-খারাবীর মতো অপকর্ম করে বেড়ায়। এই গ্রæপের কোন সদস্য আহত হলে পাহাড়ে চিকিৎসা করার জন্য চিকিৎসক দলও রয়েছে। এক সময়ের আলোচিত আব্দুল হাকিম ডাকাত পর্যন্ত শালবাগানে নুরুল আলম ডাকাতের ছত্র-ছায়ায় এসে জঙ্গি কার্য্যক্রম চালাতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে শরণার্থী ক্যাম্পে শান্তি-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা এসব অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্য গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধির পাশাপাশি ফাঁদ তৈরী করে। অবশেষে নারী লোভী এই ডাকাত নুরুল আলম বন্দুক যুদ্ধে নিহতের পর মানুষের মন থেকে রোহিঙ্গা ডাকাত আতংক কেটে গেছে। এদিকে এলাকার সচেতন মহল,লোভের বশীভূত হয়ে স্থানীয় যেসব মানুষ চোরা,ডাকাত, বনদস্যু ও ছিনতাইয়ের পথে পা দিয়েছিল তারা সুস্থ মস্তিষ্কে এবং স্বজ্ঞানে সমাজের স্বাভাবিক জীবন ধারায় ফিরে আসবেন বলে আশাব্যক্ত করেন।