মুফতি মাহফূযুল হক : মানুষ জানাজায় আসে পরিচিত মৃতের জন্য দোয়া করতে, দয়াময় আল্লাহর কাছে তার জন্য মাগফিরাত কামনা করতে। কোনো জীবিত ব্যক্তির বক্তব্য শোনতে মানুষ জানাজায় আসে না। ছোট-বড় প্রতিটি মানুষই কর্মব্যস্ত। মানুষ নিজের কাজ ফেলে জানাজায় আসে শুধুই জানাজা পড়তে।
কিন্তু কিছু মানুষ এই বাস্তবতা ভুলে যায়। মুসল্লিদের ব্যস্ততা, সময়ের স্বল্পতা এমনকি দাঁড়িয়ে থাকার কষ্টকে পর্যন্ত গুরুত্ব দেয় না। একজনের পর একজন বক্তৃতা দিতে থাকে। জানাজার বক্তব্যগুলোতে মৃতের মাগফিরাত কামনার চেয়ে বক্তাদের আত্মপ্রচার ও দলীয় প্রচারণা বেশি থাকে। মৃত্যুর প্রস্তুতির দাওয়াত নেই, আল্লাহর বড়ত্বের চর্চা নেই নিজেদের চর্চা পুরোটাই। তাদের সময়জ্ঞান-বিবর্জিত অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য জানাজার ভাবগাম্ভীর্য আবহকে নষ্ট করে ফেলে।
জানাজায় শরিক হয়ে মানুষ নিজের মৃত্যুকে উপলব্ধি করবে, নিজের মৃত্যুকে স্মরণ করবে, কবরের আজাবের কথা স্মরণ করবে, জান্নাত-জাহান্নামের কথা স্মরণ করবে, নিজের ন্যায়-অন্যায় কর্মগুলোকে মনে মনে মূল্যায়ন করবে এমন পরিবেশ এখন আর জানাজায় পাওয়া যায় না।
বক্তব্যগুলো মৃতের মাগফিরাত কামনায় শতভাগ ভরপুর থাকলেও তা অপরাধ। কেননা জানাজা নিজেই মাগফিরাত কামনা। সম্মিলিতভাবে মৃতের মাগফিরাত ও কল্যাণ কামনার জন্য শরিয়ত এই পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। বক্তব্যের মাধ্যমে মাগফিরাত কামনা হতে থাকলে শরিয়ত-নির্দেশিত পন্থা গুরুত্বহীন হয়ে যায়।
মৃতের গুণকীর্তন করতে চাইলে, তার সুকর্মগুলোর চর্চা করতে চাইলে, তার অবদানগুলো স্মরণ করতে চাইলে পৃথক স্মরণসভা, শোকসভা করা যেতে পেরে। কিন্তু জানাজা পড়তে আসা আপামর জনতাকে দাঁড় করিয়ে রেখে বক্তৃতা শোনতে বাধ্য করা নেহাতই অভদ্রতা এবং শিষ্টাচারের চরম পরিপন্থী একটা কাজ।
পরিস্থিতি এতটাই নষ্ট হয়ে গেছে, বক্তৃতার জন্য বক্তা খোঁজা হয়। আবার অনেকেই বক্তৃতা করার জন্য স্বেচ্ছায় লাইন ধরেন। অনেকেই আবার বক্তব্য দিতে না পারলে জানাজায় আসাটাকেই বৃথা মনে করেন। অনেকেই আবার তার নাম ঘোষণা না করলে অপমানিতবোধ করেন। একজন সঞ্চালক হয়ে যান। নির্বাচনের সামনে কেউ মারা গেলে তার জানাজা হয়ে যায় নির্বাচনী প্রচারণা কেন্দ্র। অনেক সময় জানাজার স্থান হয়ে যায় রাজনৈতিক শোডাউনের জায়গা।
জানাজার ফরজ দুটি। দাঁড়ানো আর চার তাকবির বলা। এ থেকেই বোঝা যায় এটা আল্লাহর বড়ত্ব আলোচনার জায়গা ও সময়। এটা কোনো দল বা নেতার বড়ত্ব চর্চার জায়গা নয়।
মৃতের গোসল, কাফন পরানো ও কবর খনন শেষ হলে কবর দিতে বিলম্ব করা নাজায়েজ। জানাজা সামনে রেখে বক্তৃতা করলে এ নাজায়েজ কাজটিই করা হতে থাকে। তাই এসব বক্তৃতা দেওয়া নাজায়েজ।
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা লাশকে দ্রুত কবরস্থানে নিয়ে যাও। কেননা মৃত ব্যক্তি যদি নেক লোক হয়, তাহলে কল্যাণের দিকেই তোমরা তাকে নিয়ে যাচ্ছো। আর যদি মন্দ হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে তোমাদের ঘাড় থেকে আপদ সরিয়ে দিচ্ছো। সহিহ বোখারি : ১৩১৫
হজরত তালহা ইবনে বারা (রা.) অসুস্থ হলে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন। অতঃপর বললেন, আমি তালহার মধ্যে মৃত্যুর আলামত দেখতে পাচ্ছি। অতএব (সে মারা গেলে) এ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করবে। আর তোমরা দ্রুত কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে। কেননা কোনো মুসলমানের মৃতদেহকে পরিবারের লোকদের মধ্যে আটকে রাখা উচিত নয়।’ সুনানে আবু দাউদ : ৩১৫৯
লাশ সামনে রেখে বক্তৃতা করতে থাকলে নবীজির দ্রুত কবরদানের নির্দেশ অমান্য হয়। লাশ জানাজার স্থানে আসার পর শুধু পরিবারের একজন খুব সংক্ষেপে মৃতের জন্য ক্ষমা চাইবে, ঋণের ব্যাপারে ঘোষণা দেবে। এরপর ইমাম সাহেব জানাজা শুরু করবেন।
