গুছিয়ে উঠতে পারছে না ব্লু ইকোনমি সেল

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৪ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমানা নির্ধারণ হওয়ার পর সরকার সমুদ্রের নানা ধরনের সম্পদ কাজে লাগাতে তৎপর হয়। অনেক ভাবনাচিন্তার পর উদ্যোগ নেওয়া হয় ‘ব্লু ইকোনমি সেল’ গঠনের। ২০১৬ সালের ২৯ জুন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘ব্লু ইকোনমি সেল’ গঠনের অনুমোদনও দেন প্রধানমন্ত্রী, যার কার্যালয় রাজধানীর কারওয়ানবাজারের পেট্রোবাংলা সেন্টারে। সেল গঠনের প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো গুছিয়ে উঠতে পারছে না ‘ব্লু ইকোনমি সেল’।

‘ব্লু ইকোনমি সেলের’ এই বেহাল দেখে বিশেজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রসম্পদ আহরণে দেশ অনেক পিছিয়ে গেছে। যে ধীরগতিতে কার্যক্রম চলছে, তাতে সমুদ্রের সম্পদ কাজে লাগাতে আরও অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সমুদ্রের নীল অর্থনীতি কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে কাজ করছে সরকারের মন্ত্রণালয় ও দপ্তর মিলে ২৯টি সংস্থা।

ব্লু ইকোনমি সেল সূত্রে জানা যায়, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ হওয়ার পর জ্বালানি বিভাগ মূলত সমুদ্রের ২৬টি ব্লক নির্ধারণ করে। উদ্দেশ্য হলো- এসব ব্লক বিদেশ কোম্পানির কাছে টেন্ডার দিয়ে তেল-গ্যাস উত্তোলন করা। এ ছাড়া মৎসসম্পদ আহরণ, বিশেষ করে দামি টুনা মাছ ও অন্যান্য সমুদ্রসম্পদ আহরণের পথ সুগম করা। নৌপরিবহন ও পর্যটনখাতে সমুদ্র ব্যবহারের উদ্দেশ্যও আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ পরিকল্পনাই এখনো পরিকল্পনার মধ্যেই আটকে আছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘ব্লু ইকোনমি সেলের’ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সেলের কাজ এখন মূলত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক বা কাজের অগ্রগতির খোঁজখবর রাখা। সেলের তেমন কোনো কাজ করার ক্ষমতা নেই। সেল কেবল বিভিন্ন কাজের সমন্বয়ের চেষ্টা করে।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখনো ব্লু ইকোনমি সেল অর্গানোগ্রাম (প্রতিষ্ঠানের কাঠামো) তৈরির কাজ করছে।’

জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের মন্ত্রণালয়ের আওতায় সবচেয়ে বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তেমন কিছুই করতে পারছে না জ্বালানি বিভাগ। সমুদ্রের ব্লক ‘এসএস ০৪’ এবং ব্লক ‘এসএস ০৯’-এ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ চলছে। তবে আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। সম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য দ্বিমাত্রিক জরিপ বা মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভের জন্য বিদেশি কোম্পানি টিজিএস স্লামবার্জারের সঙ্গে পেট্রোবাংলা ২০২০ সালের ১১ মার্চ একটি চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মধ্যে সার্ভে (জরিপ) সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ওই কোম্পানি এখনো কাজই শুরু করতে পারেনি। তবে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করেছে বলে জানা যায়। যার মধ্যে রয়েছে বঙ্গোপসাগরে অ্যাকয়াস্টিক সার্ভে, ২৯ সার্ভে ক্রুজ পরিচালনা, ১৩৮ প্রজাতির সিউইড শনাক্তকরণ। এ ছাড়া পাঁচ প্রজাতির সিইউড চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা।

তবে বেশ কিছু চলমান কাজ রয়েছে। এগুলো মধ্যে রয়েছে- ব্লু ইকোনমি সেল কর্তৃক ‘মেরিন স্পেশিয়াল প্ল্যানিং’ (এমএসপি) বাস্তবায়ন, সেলের আওতায় স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অপারেশন ব্লু গার্ড দ্বারা মৎসসহ সব সম্পদ রক্ষা, কক্সবাজার জেলার মাতারবাড়িতে একটি বাণিজ্যিক টার্মিনাল তৈরি করা, সমুদ্রে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা, জাহাজ শিল্পের উন্নয়নে কাজ করা, সামুদ্রিক দূষণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রর করা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার কার্যক্রমকে উন্নয়নের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা, সমুদ্রভিত্তিক সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল ও নিরাপদ নেভিগেশনের জন্য নিয়মিতভাবে নিউট্রিক্যাল চার্ট প্রকাশনা এবং বিতরণ করা, এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রসংক্রান্ত বিদ্যা চালু করা। তবে এসব কাজ বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদি পরিক্রমার অংশ।

ব্লু ইকোনমি সেলের এক কর্মকর্তা জানান, ‘ব্লু ইকোনমি সেল’ এখন মূলত জ্বালানি বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দায়িত্বে পরিচালিত হচ্ছে। নেতৃত্বে আছেন একজন অতিরিক্ত সচিব। তবে দুজন অতিরিক্ত সচিব, একজন উপসচিব, একজন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেনসহ ৬ কর্মকর্তা নিয়োগ রয়েছে সেলে। তবে সেলের স্থায়ী অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। সমুদ্র অর্থনীতি কাজে লাগাতে আইনি ক্ষমতাসহ একটি শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ গঠন হয়নি।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, ‘সমুদ্রসম্পদ কাজে লাগতে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে পড়েছে। ভুল পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বিশাল সমুদ্রসম্পদ কোনো কাজে লাগাতে পারছে না দেশ, যা দুঃখজনক।’ তিনি বলেন, ‘৬ বছর হলো ব্লু ইকোনমি সেল গঠন হয়েছে, অথচ তাদের কাজ এখনো মানুষের কাজে দৃশ্যমান নয়। উল্লেখ করার মতো কিছুই তারা করতে পারেনি।’