৫০বছর পর পুর্বপুরুষের জমিতে মসজিদ নির্মাণ করে নামাজ পড়লেন রামপুর সমিতির ওয়ারিশরা

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৬ years ago

নিজস্ব প্রতিবেদক : অবশেষে ৫০বছর পর পুর্বপুরুষের জমিতে মসজিদ নির্মাণ শেষে জুমার নামাজ পড়লেন রামপুর সমিতির ওয়ারিশরা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে রামপুর সমিতি চকরিয়া উপজেলার চিংড়িজোনের রামপুর মৌজার পুর্বপুরুষের সম্পত্তি উদ্ধারে দীর্ঘ ৫০বছর ধরে আইনী লড়াই করে আসছেন। সর্বশেষ উচ্চ আদালত উল্লেখিত জমি রামপুর সমিতির অনুকুলে ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিলেও প্রশাসনের একটিপক্ষ তা লঙ্ঘন করে চলছেন। তারপরও আইনী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রামপুর সমিতির সভ্যরা দীর্ঘ ৫০বছর পর পুর্বপুরুষের সম্পত্তিতে একটি নান্দনিক মসজিদ নির্মাণ করেছেন। সেখানে পবিত্র জুমার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে তাঁরা ধর্মীয় অনুষ্ঠানদি শুরু করেছেন। একইসঙ্গে একটি মন্দিরও নির্মাণ করেছেন। সেখানে শারদীয় দুর্গাৎসবের মধ্যদিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু করবেন সনাতন ধর্মের সমিতির সভ্যরা। এদিকে দীর্ঘবছর পর হলেও পুর্বপুরুষের জমিতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে পেরে আনন্দে আত্মহারা সকলধর্মের অনুসারী সমিতির সভ্য-পোষ্যরা।
রামপুর সমিতির সম্পাদক শহীদুল ইসলাম লিটন বলেন, চকরিয়া উপজেলার চিংড়িজোনের রামপুর মৌজার ৫,১১২ একর চিংড়ি জমি নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজসে দীর্ঘদিন ধরে জবরদখলের অপচেষ্টা চালিয়ে আসছেন একটি চক্র। উল্লেখিত চিংড়িজমি রামপুর সমিতির পূর্বপুরুষের সম্পত্তি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে রামপুর সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি লিমিটেডের (রেজি: নং ২৩৯৯/৭২(চট্ট) সভ্য-পোষ্য প্রায় ১০ হাজার ভূমিহীন পরিবার ৫০ বছর ধরে আইনী লড়াই করেও অনুকূলে বুঝে পাচ্ছেনা। এমনকি চিংড়িজমি সমূহ দখল বুঝিয়ে দিতে স্থানীয় প্রশাসনকে ইতোমধ্যে উচ্চ আদালত রিট পিটিশন মামলার আদেশে নির্দেশনা দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তা উপেক্ষা করে চলেছেন। উল্টো দখলবাজ চক্রকে গোপনে সহযোগিতা দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এ অবস্থার কারণে সমিতির সদস্য ১০ হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
রামপুর সমিতির সম্পাদক শহীদুল লিটন বলেন, চকরিয়া উপজেলার রামপুর মৌজার আর.এস ১০৮৩, ১০৮৪, ১০৮৬, ১১১০, ১১১১, ১১১২ অধীনে সর্বমোট ৫,১১২ একর চিংড়ি জমি ১০ হাজার ভূমিহীন পরিবারের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি। যা স্বাধীনতার আগে থেকে ভূমিহীন পরিবার সদস্যদের নামে সিএস ও এমআরআর খতিয়ান রেকর্ডভূক্ত রয়েছে। ১৯০৩ সালে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর চকরিয়া উপকূলে সুন্দরবন তৈরীর উদ্দেশ্যে বিনা নোটিশে অধিগ্রহণপূর্বক বনবিভাগের কাছে উল্লেখিত জমি হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু ওইসময় বনবিভাগ সুন্দরবন করতে ব্যর্থ হলে পরবর্তীতে এসব জমি মৎস্য বিভাগকে উন্নত মৎস্য খামার করার লক্ষ্যে ৫ বছর চুক্তি ভিত্তিতে হস্তান্তর করেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ওইসময় মৎস্য বিভাগের অসাধু কর্মকর্তারা মৎস্যচাষে খামার না করে আর্থিক সুবিধা নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার ধনী শ্রেণীর লোকজনের নামে দীর্ঘ মেয়াদী চুক্তিতে মৎস্যঘের ইজারা দেয়। যা সরকারের সংবিধান বিধি মোতাবেক অপরাধ যোগ্য। পরবর্তীতে পূর্বপুরুষের এই সম্পত্তি ফেরত চেয়ে ভূমিহীন পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে আইনের আশ্রয় নেয়া হয়। তৎপ্রেক্ষিতে নিন্ম আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোট বিভাগ পর্যন্ত সর্বআদালতে তাদের পক্ষে রায় হয়।
উল্লেখ্য যে, সমিতির পক্ষ থেকে ১৯৭৯ সালে উল্লেখিত জমি ফেরত পেতে আইনি লড়াই শুরু হয়। এরই আলোকে চট্টগ্রাম সাবজজ-২য় আদালতে একটি মামলা (নং৬৭/৭৯) দায়ের করা হয়। দীর্ঘশুনানি শেষে আদালত সমিতির সদস্যদেরকে উল্লেখিত জমিগুলো বন্দোবস্ত মূলে ফেরত দেয়ার অগ্রগামী বলে বিবেচিত হয় মর্মে রায় প্রদান করেন। কিন্তু মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে উক্ত জমি দখলে রাখার জন্য আদালতের আদেশকে অবমাননা করেন।
চট্টগ্রাম সাবজজ-২য় আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না করায় পরবর্তীতে ২০১২ সালে সমিতি কর্তৃপক্ষ পুনরায় হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (নং- ১০৯৬২/১২) দায়ের করেন। মামলার প্রথম শুনানীতে আদালতের বিজ্ঞ বিচারপতিগণ সমিতির দাবীকৃত জমির উপর কোন ধরনের ইজারা নবায়ন না দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেন। কিন্তু ‘কে শুনে কার কথা’ প্রথা অনুযায়ী আদালতের সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মৎস্য কর্মকর্তারা উল্লেখিত জমি পুনরায় ইজারা নবায়ন দেন।
সম্পাদক শহীদুল ইসলাম লিটন বলেন, সমিতির হাইকোর্টে দায়েরকৃত রিট পিটিশন নং- ১০৯৬২/১২ পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ শুনানিক্রমে ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারী আদালত আদেশে ভূমি সচিবকে দুইমাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করে সমিতির সদস্যদেরকে জমিগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ রায় প্রদান করেন। সরকারী কর্মকর্তাগণ হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরবর্তীতে দুই মাসের মধ্যে কোন ধরনের ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো সমিতির সদস্যগণের বসবাসকৃত জমি হতে উচ্ছেদ করতে শুরু করেন। এতে সমিতির সদস্যগণ কোন উপায়ন্তর না দেখে পুনরায় হাইকোর্টে একটি কনটেম্পট পিটিশন (নং ২৬১/১৭) দায়ের করলে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রুল ইস্যু করেন।
মামলার বাদি শহীদুল ইসলাম লিটন বলেন, উচ্চ আদালতের রুলের কোন জবাব না দিলে সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৬ জুন আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইনজাংকশন প্রদান করেন এবং কক্সবাজারের তৎকালীন জেলা প্রশাসককে পরবর্তী জুলাই মাসের ২৫ তারিখ হাইকোর্টে স্ব-শরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ধার্য্য তারিখে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক হাইকোর্টে স্ব-শরীরে হাজির হয়ে তাঁর জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দির প্রেক্ষিতে আদালত জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, চকরিয়ার ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং থানার ওসিকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সমিতির সদস্যদের জমিগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন। পরিতাপের বিষয় হলো উল্লেখিত কর্মকর্তারা আদালতের আদেশের কোন ধরনের তোয়াক্কা না করে অদ্যাবধি সমিতির সদস্যগণের কাছে জমিগুলো বুঝিয়ে দেননি।
পরবর্তীতে সমিতির পক্ষে জমিগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার আদেশের বিরুদ্ধে মৎস্য অধিদপ্তর থেকে ইজারা গ্রহীতা রামপুর দশ একর মালিক গং আপীল বিভাগে একটি সিভিল মিচ পিটিশন (নং ১৬৭৪/১৭) দায়ের করেন। ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর ওই মামলাটি পূর্ণাঙ্গ শুনানীক্রমে আদালত সিভিল পিটিশন দায়ের করার নির্দেশ দেন। কিন্তু মৎস্য বিভাগের পক্ষে রামপুর দশ একর মালিক সমিতি বিজ্ঞ আদালতে সিভিল পিটিশনটি রুজু না করায় ওই মামলাটি খারিজ করে দেন সাত সদস্যের বিজ্ঞ বিচারপতি সম্বনয়ে গঠিত আপীল বিভাগ। মূলত মামলাটি খারিজ হবার মধ্যদিয়ে ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর তারিখে রামপুর সমিতির পক্ষে হাইকোর্টের দেয়া আদেশটি বহাল থাকে।
তিনি বলেন, রামপুর সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি অবৈধ পন্থায় পূর্বপুরুষের সম্পত্তি দখলে নেই। আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে মূলত নিজেদের সম্পদ উদ্ধারে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জমিগুলো ফেরত দিতে উচ্চ আদালতের আদেশ বারবার উপেক্ষিত হওয়ার কারণে সর্বশেষ হাইকোর্টে আবারও মৎস্য বিভাগের দাবীকে অবৈধ ঘোষণা করে সমিতির পক্ষথেকে আরো একটি রিট পিটিশন মামলা (নং ৬০৪৭/১৭) দায়ের করা হয়। মামলার শুনানীতে আদালত মৎস্য বিভাগের দাবিকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না? এবং উল্লেখিত জমি রামপুর সমিতির সদস্যদেরকে কেন হ্যান্ডওভার করা যাবে না? এই মর্মে চার (৪) সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে আদেশ দেন। কিন্তু মৎস্য বিভাগ দীর্ঘদিন যাবত আদালতের কাছে জবাব প্রদান না করলে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল তারিখে মামলার সর্বশেষ শুনানীতে আদালত সমিতির দাবীকৃত জমিগুলো একমাসের মধ্যে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য পুনরায় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন।
শহিদুল ইসলাম লিটন দাবি করেন, মূলত দীর্ঘ আইনী লড়াই শেষে আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক রামপুর সমিতি জমিগুলো ফেরত পেতে একটি পর্যায়ে পৌঁছলে ঠিক ওইসময়ে প্রশাসনের নজরদারি অন্যদিকে প্রভাবিত করতে দখলবাজ চক্রের সক্রিয় সদস্যরা চিংড়ি প্রজেক্টে বঙ্গবন্ধু কলোনী অপবাদ রটিয়ে পূর্বপুরুষের মালিকানাধীন চিংড়িজমি থেকে রামপুর সমিতিকে উচ্ছেদের পাঁয়তারায় মেতে উঠেছে। তিনি হুশিয়ারি দিয়েছেন, রামপুর সমিতির ১০ হাজার সভ্য-পোষ্য বেঁচে থাকতে দখলবাজ চক্রের এই অপকৌশল কোনদিন সফল হতে দেবেনা। #