হাতি রক্ষায় কঠোর শাস্তি জরুরি

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৪ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : বন্যপ্রাণীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আইইউসিএন’-এর হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে এশীয় প্রজাতির পূর্ণাঙ্গ বয়সী হাতির সংখ্যা এখন ২৫০টির কম। এজন্য এই বন্যপ্রাণীটিকে বাংলাদেশে ‘মহা-বিপন্ন’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তথাপি একদিকে বন উজাড় ও হাতির আবাসস্থলের বন্য পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংস এবং আরেকদিকে একের পর এক হাতি নিধনযজ্ঞ চলছে দেশে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাতি হত্যার প্রবণতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তা ছাড়া বছরের পর বছর ধরে দেশে হাতি হত্যা চলতে থাকলেও আজ পর্যন্ত হাতি হত্যার কোনো একটি মামলারও বিচার হয়নি, শাস্তি পায়নি কোনো হত্যাকারীই। পরিবেশকর্মী ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হাতি হত্যার বিচার না হওয়ার কারণেই ক্রমাগত হাতি হত্যা বেড়ে চলেছে।

শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘বিচার হয় না হাতি হত্যার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দেশে ‘মহা-বিপন্ন’ এই বন্যপ্রাণী হত্যা এবং এ সংক্রান্ত মামলার বিচারহীনতার কথা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, বন বিভাগের হিসাবে ১৯৯২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ১৪১টি বন্যহাতি হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ৬ বছরেই হত্যা করা হয়েছে অর্ধেকের বেশি। ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যেই হত্যা করা হয়েছে ৭৬টি বন্যহাতি। তবে বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি। বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করে এমন কয়েকটি সংগঠনের তথ্য বলছে, গত দুই বছরেই ৪০টি বন্যহাতি হত্যার তথ্য পেয়েছে তারা। এর মধ্যে ২০২০ সালে ২২টি ও ২০২১ সালের সাড়ে ১০ মাসে ১৮টি। আর সদ্য শেষ হওয়া নভেম্বর মাসেই হত্যা করা হয়েছে আটটি হাতি। বন বিভাগের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও দায়ের করা মামলাসূত্রে জানা গেছে, বেশিরভাগ হাতিই গুলি করে, বিষ প্রয়োগ করে কিংবা বিদ্যুৎস্পৃষ্টে হত্যা করা হয়। গত নভেম্বর মাসেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৮টি হাতি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মাত্র তিন দিন আগে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে একটি বন্যহাতির মরদেহ পাওয়া গেছে। আনুমানিক ২২ বছর বয়সী হাতিটিকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে সেটি আড়াল করতে দেওয়া হয় মাটিচাপা। পাহাড়ে কাজ করতে গিয়ে স্থানীয়রা সেটি দেখে খবর দিলে বন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসেন। এই ঘটনায় মামলা করার কথা জানিয়েছেন বন কর্মকর্তারা।

বন বিভাগের হিসাব বলছে, ১৯৯২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সারা দেশে দেড়শ’র মতো হাতি হত্যার ঘটনা ঘটলেও মামলা হয়েছে মাত্র ৩৭টি। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটি মামলারও রায় হয়নি। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, দেশের বর্তমান আইনে হাতি হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি ২ থেকে ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ থেকে ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। সেইসঙ্গে হাতির হামলায় কেউ মারা গেলে ৩ লাখ টাকা, আহত হলে ১ লাখ টাকা এবং ফসলের ক্ষতি হলে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের বিধানও রয়েছে আইনে। কিন্তু এই আইনের কোনো প্রয়োগ হচ্ছে না। মামলার বিষয়ে বন সংরক্ষকদের বক্তব্য হলো তারা মামলা করলেও পুলিশ সময়মতো তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়ায় মামলাগুলো আদালতে ঝুলে থাকে। বন কর্মকর্তারা এভাবে এর দায় পুলিশ ও আদালতের ওপর চাপাতে চান। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলা চালানোর ক্ষেত্রেই বন বিভাগের উদাসীনতা আছে।

বন্যপ্রাণী ও বন সংরক্ষণের বিষয়টি অবিচ্ছেদ্য। এটা লক্ষ্য করা দরকার যে, হাতির মতো বন্যপ্রাণী থাকার কারণে বন পুরোপুরি মানুষের কবজায় আসতে পারে না বা দখলমুক্ত থাকে। এদিক থেকে হাতি বনের রক্ষক হিসেবেও কাজ করে। আর হাতি প্রচুর পরিমাণে মল ত্যাগ করে, যা বনে জৈবসার হিসেবে কাজ করে। তাই পরিবেশের জন্য হাতির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু মানুষ বনের জায়গা দখল করে চাষবাস করছে। সেখানে হাতিরা গেলে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। যে কারণে এলাকাবাসীর সঙ্গে হাতির সংঘাত হচ্ছে। এর ফলে হাতি হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশে বুনো পরিবেশে আর হাতি থাকবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মহা-বিপন্ন’ এই বন্যপ্রাণীটিকে রক্ষায় সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাদের পরামর্শ, হাতি হত্যায় ঝুলে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হলে এই প্রবণতা কমে আসবে। একই সঙ্গে হাতির বিচরণক্ষেত্র ও চলাচলের পথ সংরক্ষণ করা, বনের ভেতরে হাতির খাবার উপযোগী গাছ লাগানোসহ বনাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।