ভাসানচর থেকে শুরু হোক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : প্রায় চার বছর আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা ও দমন-পীড়ন অভিযানের মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভূমিতে ফেরাতে চেষ্টা করছে বাংলাদেশ সরকার। ফেরার আগ পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা যাতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে পারে, সে কারণে নোয়াখালীর ভাসানচরে তাদের জন্য নতুন ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করেছে সরকার। কক্সবাজারের জনাকীর্ণ আশ্রয়শিবির থেকে এক লাখ রোহিঙ্গাকে সেখানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। শুরুর দিকে এ উদ্যোগে জাতিসংঘ আপত্তি জানিয়ে আসছিল। বিশ^ সংস্থার কর্মকর্তারা ভাসানচর পরিদর্শন করে পুরো বন্দোবস্ত দেখার পর রোহিঙ্গা স্থানান্তরে সমর্থন দেয়। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জাতিসংঘ কীভাবে সম্পৃক্ত হবে, তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকেও সই করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)।

দেশ রূপান্তরে সোমবার প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, ভাসানচরে সরিয়ে নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় জাতিসংঘ যুক্ত হওয়ায় সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা আনন্দ মিছিল করেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাকে স্বাগত জানিয়ে লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে দেখা যায় রোহিঙ্গাদের। জাতিসংঘ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসায় রোহিঙ্গারা আনন্দিত হয়ে এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও পুষ্টি, সুপেয় পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, চিকিৎসা, মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম ও ভাষায় অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং জীবিকায়নের ব্যবস্থা করতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে জাতিসংঘ। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বসবাসের কারণে পার্শ্ববর্তী স্থানীয় এলাকা ও জনগণের ওপর যদি প্রভাব পড়ে, তা নিরসনেও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বিশ্ব সংস্থাটি।

গত বছরের ৪ ডিসেম্বর এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেওয়া শুরু হয়েছিল। এ পর্যন্ত ৬ দফায় ১৮ হাজার ৫২১ রোহিঙ্গাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগামী মাসে বাকি ৮১ হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে সরিয়ে নেওয়ার কাজ আবার শুরু হবে। এটা এখন পরিষ্কার যে, শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতেও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জরুরি। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যে নীতি নিয়েছে, সেটি যে অগ্রহণযোগ্য তা বিশ্বসম্প্রদায়কে বোঝাতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে এখন এটা তুলে ধরা জরুরি যে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাবিরোধী নীতির কারণেই দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি চলছে। এই সমস্যার দায় বাংলাদেশের না থাকলেও জনবহুল এই দেশটিকে বেসরকারিভাবে ১৫ লাখ শরণার্থীর ভার বইতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ এই শরণার্থীর ভার বয়ে চলতে পারবে না। বাংলাদেশের জনসাধারণের পাশাপাশি এই বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দেশটির প্রতি বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এভাবে দীর্ঘকাল চললে দেশের স্বাভাবিক অগ্রগতিও ব্যাহত হবে। তাই এর একটি স্থায়ী সমাধান জরুরি। এটা মানতেই হবে যে আনুমানিক লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র এক লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর কক্সবাজার-টেকনাফের পরিস্থিতির তেমন কোনো হেরফের ঘটাবে না। এ শিবিরগুলোর কারণে সেখানকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বিরোধ ঘটছে। সম্প্রতি রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে হত্যা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কিছু রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর সমস্যার তুলনায় খুবই স্বল্পমাত্রার ব্যবস্থাপনাগত উদ্যোগ মাত্র। রোহিঙ্গাদের যত দ্রুত সম্ভব মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোই সংকট সমাধানের একমাত্র পথ।

রোহিঙ্গা সমস্যা এখন যে মাত্রায় আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে, তাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ছাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার কাজটিও সহজ হবে না। এমন অবস্থায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা আশা জাগিয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতেই হবে। এখন এই প্রত্যাবাসন কীভাবে এবং কতটা দ্রুত হবে তা বাংলাদেশের কূটনীতির সাফল্যের ওপরই নির্ভর করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও বাস্তবতার নিরিখে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মানবিক আচরণ দেখিয়েছে, তা বিশ্বসম্প্রদায়ের দৃষ্টি কেড়েছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি সাময়িক এবং যত দ্রুত সম্ভব তাদের নিরাপদে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসহ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোই বাংলাদেশের লক্ষ্য। ফলে বাংলাদেশকে কিছু ব্যবস্থাপনাগত উদ্যোগ নিতে হচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে ভাসানচরে পাঠানো তারই অংশ। শুরুর দিকে সরকারের এ উদ্যোগের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু বিরোধিতা ছিল। স্বেচ্ছায় স্থানান্তরসহ ভাসানচরের কিছু সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে তাদের উদ্বেগ ছিল। ইউএনএইচসিআর চুক্তি করায় বিষয়টি সহজে সমাধানযোগ্য হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আস্থায় নিয়েই ভাসানচরে স্থানান্তরের কাজটি দ্রুত শেষ হবে বলে আশা করা যায়।

মনে রাখতে হবে অবিলম্বে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য দরকারি মূল শর্ত হলো অনুকূল পরিবেশ। মিয়ানমার যাতে সে শর্ত পূরণ করে সে জন্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও সমস্যা সমাধানে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।

সুত্র : দেশ রূপান্তর।