প্যারিসে ওয়ান প্লানেট সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী : নিরাপদ পৃথিবী গড়তে চাই সম্মিলিত প্রচেষ্টা

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৯ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রত্যাশা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোর প্রতি আমি আহ্বান জানাতে চাই, জলবায়ু সংকটে সুবিচার প্রতিষ্ঠা এবং ইতিহাসের দায় মেটাতে তারা যেন তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন। কেবল যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা এই পৃথিবীকে নিরাপদ করতে পারি।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, মিয়ানমার থেকে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা আগমনের ফলে বাংলাদেশের বন ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজনের ওপর ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আসার ফলে বাংলাদেশ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মানবিক কারণে আমরা কক্সবাজারে ১ হাজার ৭৮৩ হেক্টর বনভূমির ওপর তাদের আশ্রয় দিয়েছি।
গতকাল মঙ্গলবার ফ্রান্সের প্যারিসে ওয়ান প্লানেট সামিটে তিনি এসব কথা বলেন। এ শীর্ষ সম্মেলনে একশ’ বিশ্ব নেতাসহ বেসরকারি সংগঠন, ফাউন্ডেশন এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রায় ২ হাজার প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। খবর বাসস, ইউএনবি, বিডিনিউজের।
শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, যদিও এই ঝুঁকির জন্য আমরা দায়ী নই। তিনি বলেন, আমরা সীমিত সম্পদ নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি প্রশমন ও অভিযোজন করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে তার অঙ্গীকারের কথা পুনরায় উল্লেখ করেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রোনের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্য ও বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন রক্ষায় ৫০ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল প্রকল্প বর্তমানে চলমান রয়েছে।
রোহিঙ্গা নিয়ে মাক্রোনের সহযোগিতা চান শেখ হাসিনা
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোনের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিস্তারিত জেনে ফরাসি প্রেসিডেন্টও রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এ ছাড়া বাণিজ্য, অর্থনীতি ও অন্যান্য অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ-সুবিধা অনুসন্ধানে একটি যৌথ কমিশন গঠনে সম্মত হয়েছে ঢাকা ও প্যারিস।
গতকাল প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেন, বৈঠকে উভয় নেতা অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্নিষ্ট দ্বিপক্ষীয় ও বৈশ্বিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ পাঁচটি বিষয়ে আলোচনা হয়। তিনি বলেন, যৌথ কমিশন গঠনের ধরন পরে ঠিক করা হবে।
এর আগে শেখ হাসিনা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে পৌঁছলে তাকে স্বাগত জানান মাক্রোন। সেখানে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে শেখ হাসিনাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেন তিনি।
শহীদুল হক বলেন, বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা ছাড়াও জলবায়ুর বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবেলা, বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস এবং বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে শেখ হাসিনার কাছে বিস্তারিত জানতে চান মাক্রোন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে রোহিঙ্গা সমস্যার অবস্থা এবং তা মোকাবেলায় সরকার কী করছে, তা জানতে চান। ফ্রান্সের কাছ থেকে কী আশা করছেন, তাও বলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রায় দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা চলে আসার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের বোঝা এবং পরিবেশের ওপর বড় ধরনের দুর্যোগ। মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ও চাপ দুটোই অব্যাহত থাকুক। এটা না করলে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বাস্তবায়ন করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উপস্থাপিত তার পাঁচ দফা প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, তিনি জাতিসংঘে যে প্রস্তাব দিয়েছেন সেভাবেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হতে পারে।
মিয়ানমার নাগরিকদের তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তবে এই সংকটের সমাধানে আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের অব্যাহত সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক চাপ চাই।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে উঠবে।’
ফরাসি প্রেসিডেন্ট সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য তাদের অব্যাহত মানবিক সাহায্য এবং সকল বিশ্ব সংস্থায় ভূমিকা রাখার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন।
ওয়ান প্লানেট সামিটে যোগ দিতে তিন দিনের সফরে সোমবার সন্ধ্যায় প্যারিসে পৌঁছান শেখ হাসিনা। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় অভিন্ন প্রচেষ্টা এগিয়ে নিতে সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নের কর্মপন্থা নির্ধারণই প্যারিসের এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য। বিশ্বের ১৮৮টি দেশের ঐকমত্যে ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির দুই বছরের মাথায় মঙ্গলবার প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে এ সম্মেলন শুরু হয়েছে।
মাক্রোনের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে জলবায়ুর বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবেলার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয় এবং এ বিষয়ে সম্মেলনের আয়োজন করায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা।
শহীদুল হক বলেন, ‘জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলার উদ্যোগ থেকে আমেরিকার বেরিয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নেতৃত্বের অভাব ও একটা হতাশা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এই মিটিং ডাকা হয়েছে।’
জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্সের’ কথাও মাক্রোনকে বলেন প্রধানমন্ত্রী। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে সবাইকে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।
বৈঠকে দুই দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়েও আলোচনা হয় জানিয়ে শহীদুল হক বলেন, বিনিয়োগে নিজ দেশের আগ্রহের কথা প্রকাশ করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘কোন কোন সেক্টরকে আপনি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন, যেখানে ফ্রান্স বিনিয়োগ করতে পারে।’
বৈঠকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে প্রেসিডেন্ট তা গ্রহণ করেন।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক এবং ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কাজী ইমতিয়াজ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
মিয়ানমারের ওয়ার্কিং গ্রুপ ১৯ ডিসেম্বর ঢাকা আসছে
রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য ঢাকা ও নেপিদোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদনের জন্য আগামী ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফর করবে মিয়ানমারের ওয়ার্কিং গ্রুপের একটি প্রতিনিধি দল। গতকাল এলিসি প্যালেসে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী এ কথা বলেন।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক সাংবাদিকদের একথা জানান। তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে জানান, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।