পরিবার হোক শান্তির নীড়

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : বাংলাদেশের সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবক্ষয় দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। মানুষের সহনশীলতা এতটাই তলানিতে এসে ঠেকেছে যে, নিজের কল্পিত শত্রু মনে করে আপনজনদের পথের কাঁটা ভেবে দুনিয়া থেকে সরাতেও দ্বিধা করছে না অনেকে। পরস্পরের মধ্যে সৃষ্ট বিভেদকে স্নেহ-মায়া-মমতা, সম্প্রীতি, সদ্ভাব ও ভালোবাসার বন্ধনে রূপান্তরের চিন্তা তাদের মাথায় আসছে না। সর্বশেষ রাজধানীতে এক নারী ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছেন বাবা-মা ও বোনকে। ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অমানবিক, পৈশাচিক ও নিষ্ঠুর। সাম্প্রতিক সময়ে সমাজে নানামাত্রিক অবক্ষয়ের প্রভাবে এমন একান্ত আপনজনকে নিষ্ঠুর কায়দায় হত্যার শিকার হতে হয়েছে। ঘটনাগুলো বিশ্লেষণের দাবি রাখে, বিশেষ করে পারিবারিক হত্যা যখন বেড়ে চলেছে।

প্রণয় কিংবা অনৈতিক নানা সামাজিক সম্পর্কের কারণে খুনের ঘটনা ক্রমবর্ধমান। এগুলো সমাজের অস্থিরতার চিত্র। এসব ঘটনা শুধু প্রচলিত আইনে বিচার কাঠামোর মধ্যে আনলেই এই অসুস্থ সামাজিক অবস্থার উত্তরণ ঘটবে না। এ মানুষরা কেন বর্বর খুনি হয়ে উঠছেন তার নেপথ্যের কারণ খতিয়ে দেখতে হবে। পারিবারিক পরিবেশের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে।

প্রতিহিংসা, ঘৃণা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডএখন ঢুকে গেছে পরিবারের মধ্যে। পরিবারে এক সদস্যের হাতে নিহত হচ্ছে আরেকজন। স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে, বাবা ছেলেকে, ছেলে বাবাকে; ভাই বোনকে, বোন ভাইকে এমনকি মেয়ে তার বাবা-মাকে হত্যা করছে ঠাণ্ডা মাথায়। একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই মাসে অন্তত ১৭টি পরিকল্পিত পারিবারিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

পরিবারে প্রতিটি সদস্যের মধ্যেই একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা থাকতে পারে। ভালোবাসায় বন্ধন অটুট হয়, ঘৃণায় সংকট তৈরি হয়। ঘৃণা থেকেই এমন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটে। এছাড়া মাদকাসক্তি, একাধিক বিয়ে, অবৈধ সম্পর্কে জড়ানো, লোভ-লালসা, জেদ, জমিজমার বিরোধ, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, বিভিন্ন গেইমস ও সিরিয়ালের প্রভাব, উচ্চাভিলাষী চিন্তা, দাম্পত্যবিরোধ, অর্থনৈতিক টানাপড়েন, অতিমাত্রায় ক্ষোভ ও অসহিষ্ণুতা ইত্যাদি এমন ধরনের হত্যাকা-ের পেছনে প্রভাবক ভূমিকা রাখছে। সেই সঙ্গে বৈষম্য, বেকারত্ব, মহামারীজনিত পরিস্থিতি, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির গরমিল, বিচারহীনতার সংস্কৃতিও খুনের ঘটনা বাড়তে থাকার জন্য দায়ী।

আশঙ্কার কথা হলো, দেশ ও সমাজ যদি এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের বৃত্তে আটকে পড়ে, পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা ধসে পড়েতবে নানাবিধ সূচকের অগ্রগতি, এতসব উন্নয়ন কী কাজে লাগবে? এ অবস্থা থেকে উত্তরণ শুধু আইন-শৃঙ্খলার দৃষ্টিতেই জরুরি নয়, সামগ্রিক দৃষ্টিতেও অপরিহার্য। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় ও তৎপর করলে পরিস্থিতির উন্নতি কিছুটা হতে পারে, তবে পুরোটা নয়। স্বস্তিকর পরিস্থিতি-পরিবেশ তৈরি করতে হলে এই সংকটের মূলে হাত দিতে হবে। নৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ যদি ফিরিয়ে আনা যায় তবে আপনা-আপনিই ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হবে। কাজটি তাই শুরু করতে হবে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ থেকে।

আগে আমাদের সমাজে নৈতিক মান নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো। নৈতিক মানসম্পন্ন ব্যক্তি সমাজে আদৃত ও মান্য হতো। নৈতিক মানে যাদের ঘাটতি থাকত তারা ছিল নিন্দিত ও পরিত্যাজ্য। তখন শৈশব-কৈশোরে নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া হতো, ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা হতো। এখন সেই শিক্ষা ও চর্চা খুব কম পরিবারেই টিকে আছে। পাঠ্যক্রমে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার পাঠ প্রায় উঠে গেছে। ফলে দেশে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বটে, তবে নৈতিক মানুষের সংখ্যা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আচার-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে না। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কোথাও একটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় নৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সুপ্রতিষ্ঠিত করার বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে পরিবার গঠন, পরিচালনা, পরিবারের সদস্যদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে সচেতন ও সজাগ হতে হবে। সুখী পরিবার, সমৃদ্ধ সমাজ ও শান্তিময় পৃথিবী গড়তে হলে সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পারিবারিক ব্যবস্থার ওপর। বাবা-মা হিসেবে শুধু নিজেরা খেয়ে-পড়ে ভালো থাকলে চলবে না, প্রচুর সম্পদে সব হাসিল হবে নাসন্তানদের সুশিক্ষা ও লালন-পালনে শতভাগ মনোযোগী হতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কখনো ভুল বোঝাবুঝি হলে, কেউ ভুল পথে পা বাড়ালে, রাগের মাথায় তা সমাধান না করে স্বাভাবিক পরিবেশে সমাধানের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

এক কথায়, পরিবারের সদস্যদের একটি উত্তম পরিবেশে লালন-পালন করতে হবে। আনুষ্ঠানিক পাঠদান কর্মসূচির বাইরে দৈনন্দিন ওঠাবসা ও সাহচর্যের সময় তাদের সামাজিকতা, ভদ্রতা, অল্পে তুষ্টি, ধৈর্য ও আচার-আচরণ বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান শিক্ষা দিতে হবে। সন্তানদের সবাইকে সমান চোখে দেখতে হবে।

পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এর বিপরীত কোনো কিছু প্রত্যাশিত নয়। তাহলে স্ত্রী-সন্তানদের ভ্রষ্টতার দায় পরিবার প্রধান হিসেবে বাবার ওপর বর্তাবে, আসামি হিসেবে কাল কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে। সেই সঙ্গে দুনিয়ার জীবনের অপমান-লাঞ্ছনা তো রয়েছেই।

বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের সমাজে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক-দায়িত্ব কেমন হওয়া উচিত, তা অনেকের কাছেই সুস্পষ্ট নয়। এ কারণেই দাম্পত্য কলহ ও পারিবারিক বিরোধ দেখা দেয়। যা বড় হতে হতে খুনের ঘটনায় গিয়েও পৌঁছাচ্ছে। পক্ষান্তরে পারিবারিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে স্বামী-স্ত্রী তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে ওই পরিবারের সদস্যদের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক হবে শ্রদ্ধাশীল, অনুগত ও ভালোবাসাপূর্ণ। কেউ দুঃখ পেলে অন্যরা সমব্যথী হবে, তাকে সান্ত¡না দেবে; তার পাশে দাঁড়াবে। এভাবে পারস্পরিক প্রেম-ভালোবাসা, বিশ্বাস পারিবারিক বন্ধনকে অটুট রাখে। কিন্তু পারস্পরিক অনাস্থা, সন্দেহ-সংশয়, অবিশ্বাস, আনুগত্যহীনতা সর্বোপরি অবাধ স্বাধীনতা পরিবারব্যবস্থা ধ্বংস করে। ফলে সন্তান হয়ে ওঠে খুনি, রক্তপিপাসু।

এসবের পেছনে মূলত ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব এবং সুশিক্ষা না থাকা দায়ী। মানবিকতার চর্চা কমে যাওয়া দায়ী। মুসলিম সমাজে ইসলামি অনুশাসন না মানার ফলে হাজারো সমস্যা তৈরি হয়। মানুষ দায়িত্বহীন হয়ে গেলে তখন অপর মানুষ অধিকার বঞ্চিত হয়। তাই অভিভাবকদের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়া দরকার। একই সঙ্গে কর্র্তৃপক্ষের উচিত ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সচেতনতামূলক এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া।

লেখক : মুফতি ও ইসলাম বিষয়ক লেখক