পরিবহন কোম্পানি ও রুটের শৃঙ্খলা

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : দেশের সড়ক দুর্ঘটনার একটা বড় অংশের জন্যই দায়ী চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালনা। এটা কেবল বিশেষজ্ঞদের মত নয়, বাংলাদেশ পুলিশের অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যানেও এ কথাই উঠে এসেছে। গত বছর পুলিশের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় সারা দেশে ৮৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ চালকের বেপরোয়া গতি। ভুল ওভারটেকিংয়ের কারণে ঘটে আরও ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ দুর্ঘটনা। সবমিলিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ দশমিক ৬৯ ভাগের জন্যই দায়ী চালক। এই পরিস্থিতির জন্য বেশিরভাগ সময় যথাযথ প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ছাড়া চালকদের বাস ও ট্রাকের মতো পরিবহন চালানোকে দায়ী করা হয়। কিন্তু এটা সত্যের একাংশ মাত্র। রাজধানী ঢাকার অভ্যন্তরীণ রুটগুলো-সহ সারা দেশের আন্তঃজেলা বাস সার্ভিসগুলোর মধ্যে বেপরোয়া প্রতিযোগিতার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই আলোচনায় আসে না। অথচ এই প্রতিযোগিতা কেবল এক কোম্পানির বাসের সঙ্গে অন্য কোম্পানির বাসেরই নয়, বরং একই কোম্পানির বাসের চালকরাও পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বিপুল যানবাহনে ভারাক্রান্ত নগরের সড়ক থেকে হাইওয়ে পর্যন্ত সর্বত্রই যাত্রীরা চালকদের এই বেপরোয়া গাড়িচালনার জিম্মি হয়ে আছেন দীর্ঘদিন ধরে।

চালকদের বেপরোয়া চালনা আর পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মূলে রয়েছে বিভিন্ন রুটে বাস কোম্পানিগুলোর চুক্তিভিত্তিক পরিবহন সেবা। বাস মালিকরা নির্দিষ্ট টাকার চুক্তিতে চালক আর চালকের সহকারীদের হাতে বাস ছেড়ে দেন। তাই তাদের চেষ্টা থাকে যেকোনো মূল্যে চুক্তির অঙ্কের চেয়ে বেশি টাকা কামাই করে নিজেদের মুনাফা নিশ্চিত করা। এভাবে মালিকপক্ষের মুনাফা নিশ্চিত হলেও এটাই দেশের গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা মহানগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২৪৬টি কোম্পানির তিন হাজার মালিকের প্রায় পৌনে ৮ হাজার বাস চলে ২৭৮টি রুটে। এভাবে একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলার কারণে এবং চুক্তির ভিত্তিতে একই কোম্পানির বাস চালানো চালকেরা পরস্পরের সঙ্গে মারাত্মক প্রতিযোগিতায় নামেন। এতে সড়ক অনিরাপদ হয়ে পড়ে। সড়ক বন্ধ করে যত্রতত্র যাত্রী তোলায় নিত্য যানজট হয়। ঘটে দুর্ঘটনা। অনেকে শিকার হন অকালমৃত্যুর।

এই পরিস্থিতির অবসানে ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ নামের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল সরকার। ২০১৫ সালের অক্টোবরে ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ঢাকা উত্তরের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হককে প্রধান করে একটি কমিটি হয়। এ কমিটি ঢাকায় রুটের সংখ্যা কমিয়ে ২২টিতে আনা এবং উন্নত দেশের মতো ‘বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি সিস্টেম’ (বিএফএস) চালু করে ২৪৬টি কোম্পানিকে একীভূত করে ৬টি বাস কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবনা তৈরি করে। পুরনো বাস তুলে দিয়ে ৪ হাজার নতুন বাস নামানোর সিদ্ধান্ত হয়। কোম্পানির অধীনে চলা বাসগুলোর মালিকরা অংশীদারত্বের ভিত্তিতে মুনাফা পাবে বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কয়েক দফায় অনেকগুলো বৈঠক ছাড়া এই উদ্যোগের এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। অথচ এই উদ্যোগটির যৌক্তিক বাস্তবায়ন সফল হলে হয়তো রাজধানী ঢাকার গণপরিবহনে অনেকটাই শৃঙ্খলা আনা যেত এবং এর প্রভাবও সারা দেশের পরিবহন খাতে পড়ত।

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হাত থেকে দেশের মানুষ বাঁচাতে এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের তথ্য বলছে, ২০২০ সালে দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ১৪১ জনের। ৪ হাজার ৯২টি দুর্ঘটনায় একই সময়ে আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৮৫ জন। তবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত বছর দেশে ৪ হাজার ৭৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৩১ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৭৯ জন।

এই সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই যে, গণপরিবহনে উপরোক্ত ধরনের কাঠামোগত শৃঙ্খলা আনা ছাড়া কেবল লাইসেন্সবিহীন ও বেপরোয়া চালকের ওপর দোষ চাপিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার রাশ টানা যাবে না। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স সবক্ষেত্রেই আবশ্যক। কিন্তু বাসমালিকদের অতিরিক্ত মুনাফার লোভ আর গণপরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রকদের দায়মুক্তি দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতির সঙ্গে আরও রয়েছে মাঠপর্যায়ে ট্রাফিক পুলিশের গাফিলতি, উদাসীনতা ও অবহেলার বিষয়টিও। এছাড়া গণপরিবহনে চাঁদাবাজি এবং গণপরিবহন চালকদের সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগও বহু পুরনো। তাই সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে পরিবহন খাতে ব্যবসারত কোম্পানি এবং বাসরুটের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাই সবার আগে জরুরি। সেটা করা সম্ভব হলে চালক ও চালকের সহকারীদেরও চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালনা থেকে বের করে নির্ধারিত বেতন-ভাতার চাকরিতে নিয়োজিত করা সম্ভব। চালক, চালকের সহকারীসহ পরিবহন শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সেটা খুবই জরুরি।