নতুন ধানে দিন বদলের গান

লেখক: হুমায়ুন রশিদ
প্রকাশ: ৩ years ago

শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন : বাংলাদেশে প্রিমিয়াম কোয়ালিটি চালের চাহিদা অনেক পুরনো হলেও চাহিদার তুলনায় ধানের জাতের সংখ্যা অনেক কম। তাই দেশের চাহিদা ও বিদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে ব্রি-ধান-২৯ জাতের কে কার্বন আয়নরশ্মি প্রয়োগ করে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির বিনা ধান-২৫ উদ্ভাবন করা হয়। দুর্যোগকবলিত সাতক্ষীরা উপকূলের মাঠে মাঠে সেই ধানের শিষ দোলা দিচ্ছে। হাসি ফুটেছে ঝড়-ঝঞ্ঝায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের মুখে। তারা স্বপ্ন দেখছেন ঘুরে দাঁড়ানোর। তুলনামূলক কম খরচে বেড়ে ওঠা ফলন্ত ধান যেন কৃষককে শোনাচ্ছে দুঃখ ঘোচানোর গান।

কৃষিবিদরা জানাচ্ছেন, দেশে প্রচলিত জাতের মধ্যে বিনা ধান-২৫-এর চাল সর্বাধিক লম্বা ও সরু। জাতটির জীবনকাল ১৪০-১৪৫ দিন, গাছ লম্বা ও শক্ত হওয়ার ফলে হেলে পড়ে না এবং খড়ের পরিমাণ বেশি হওয়ায় গবাদিপশুর খাদ্যের চাহিদাও অনেকাংশে পূরণ করবে। সব উঁচু ও মধ্যম উঁচু জমিতে বিনা ধান-২৫-এর চাষ করা যায় এবং জাতটি বিঘাপ্রতি ফলন ২৬ মণ ফলন দেয়। তাই গাছের বৃদ্ধি ও ফলন দেখে প্রতিবেশী কৃষকও ধান চাষের আগ্রহ প্রকাশ করেন।

কৃষি সম্প্রসারণের অধিদপ্তরের সহযোগিতায় সাতক্ষীরা জেলায় সদর, তালা, দেবহাটা, কালীগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলায় ২০ বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে বিনা ধান-২৫-এর চাষাবাদ করা হয়েছে। জাতটিতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম এবং ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকরা অনেক খুশি।

সাতক্ষীরা সদরের কৃষক মো. হজরত আলী জানান, এবার তিনি এক বিঘা জমিতে এই নতুন জাতটির চাষ করেছেন। ধানের ফলন অনেক বেশি এবং চিকন হওয়ার ফলে তিনি অনেক খুশি। সামনের বছরে তার সব জমিতে এই ধানের চাষ করবেন বলে জানান।

কালীগঞ্জ উপজেলার চাষি আবদুল খালেক বলেন, ক্ষেতে উৎপাদিত ধান থেকেই এ ধানের বীজ পরবর্তী বছরের চাষাবাদের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। এ ধানের চাল চিকন ও ভাত খেতে সুস্বাদু। এসব কারণে আমরা বোরো মৌসুমে এখন থেকে বিনা ধান-২৫ আবাদ করব। বাজারে এ জাতের ধানের চাহিদা বেশি। কৃষকরা এ জাতের ধান চাষাবাদ করলে অনেক লাভবান হবেন।

এদিকে গতকাল কালীগঞ্জের ভাড়াশিমলায় এ জাতের ধান নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) ইনচার্জ ড. বাবুল আকতারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন বিনার মহাপরিচালক মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম, বিনার পরিচালক ড. আবদুল মালেক, বিনা ধান-২৫-এর উদ্ভাবক ড. সাকিনা খানম। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির আলোচনা করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সাতক্ষীরার উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম, সাংবাদিক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন, বিনার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মশিউর রহমান প্রমুখ।

মহাপরিচালক মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, দিন দিন দেশে কৃষিজমি কমছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিপুলসংখ্যক মানুষকে খাদ্যের জোগান দিতে অল্প জমিতে অধিক ফসল উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। স্বল্প সময়ে বিনা ধান-২৫ অধিক ফলন দিয়ে সে কাজটিকে সহজ করে দিচ্ছে। এক ফসলি জমিকে দুই ফসলি ও দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে পরিণত করছে। এতে কৃষক অধিক ফসল উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন।

ড. বাবুল আকতার জানান, নতুন জাত হওয়ার ফলে এবার স্বল্পপরিমাণ বীজ কৃষকদের দেওয়া হয়। এ বছরে ফলন ভালো হওয়ায় আগামী মৌসুমে আরও বেশি সংখ্যক কৃষকদের দেওয়া হবে।

বিনা ধান-২৫-এর উদ্ভাবক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাকিনা খানম বলেন, জাতটি চাষের মাধ্যমে আমাদের দেশে যে বিপুল পরিমাণে সরু চাল আমদানি করতে হয়, সেই আমদানিনির্ভরতা কমাবে। এ ছাড়া বাজার মূল্য বেশি এবং ফলন বেশি হওয়ার ফলে কৃষকরাও আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।