টেকনাফ টুডে ডেস্ক :
কুখ্যাত খুনী খুলনার এরশাদ সিকদার মানুষ মেরে বস্তা বেঁধে মেঘনা নদীতে ডুবিয়ে দিত। কিন্তু দেশের সেই সিরিয়াল কিলারের বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে টেকনাফে বসবাসরত রোহিঙ্গা ডাকাত আব্দুল হাকিম। তিনি মানুষ মেরে জনমনে ভীতি সঞ্চারের জন্য পাহাড়ের চূড়ায় শুকাতে দেয়। এমনই অনেক বর্বর, লোমহর্ষক, নিষ্ঠুর কাহিনী জন্মদাতা ওই হাকিম। তার রাজত্বের গল্প টেকনাফের লোকের মুখে মুখে। তবে আব্দুল হাকিম ডাকাত এতটাই ভয়ংকর ও বেপোরোয়া তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস করেন না কেউ। এই ডাকাতের ভয়ে টেকনাফ পৌরসভার পল্লান পাড়ার প্রায়ই ৭৫ টি পরিবার এখন গ্রাম ছাড়া। তাকে ধরতে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব যৌথ অভিযান চালিয়েছে কয়েকদফা । কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন দপ্তরে আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরকারী মোহাম্মদ রফিক বলেন, প্রায় ৮ মাস আগে আব্দুল হাকিম বাহিনী পুরান পল্লন পাড়ার নুরুল কবিরের ছেলে আব্দুল কাদেরকে চার টুকরো করে হত্যা করে। পরে তার লাশ পাহাড়ের ছড়ায় বাশ পুতে শুকাতে দেয়। এমন জঘন্যভাবে আব্দুল হাকিম নির্যাতন চালান।
তিনি আরো বলেন, ওই ডাকাতের ভয়ে এলাকার কোন কিশোরীকে বাড়িতে রাখেন না তার বাবা মা।
খুন, অপহরণ, মুক্তিপন আদায়, ইয়াবা ব্যবসা আর মানবপাচার একচ্ছত্র আধিপত্য মিয়ানমারের জানি আলির ছেলে ডাকাত আব্দুল হাকিমের। নাফ নদী থেকে ইয়াবা লুট, সীমান্তের ওপার থেকে রোহিঙ্গাদের অপহরন করে এপারে নিয়ে আসা। মুক্তিপন না পেলে হত্যা করা এখন এই বাহিনীর নিত্য নৈমত্তিক ঘটনা। পাহাড় দখল, সরকারী জমি দখল এই বাহিনীর নাম রয়েছে শীর্ষে। টেকনাফের নয়াপড়া শরনার্থী শিবিরের ভেতরের শালবন আনসার ক্যাম্পের অস্ত্র লুট ও আনসার সদস্য হত্যা, মিয়ানমারের পুলিশ ক্যাম্পে হামলার সাথেও আব্দুল হামিদ জড়িত বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রাথমিক তথ্য রয়েছে।
ডাকাত হাকিমের হাতে এ পর্যন্ত প্রান হারিয়েছেন ৬ জন। এরা হলেন, আবদুল লতিফের ছেলে নুরুল কবির, সিএনজি ড্রাইভার মো: আলী, মুন্ডি সেলিম, নতুন পল্লানপাড়ার সিরাজ মেম্বার, আবদুল হাফিজ ও তোফায়েল। এছাড়া ওই বাহিনীটি অপহরন করেছেন দুই শতেরও বেশী লোকজনকে। তাদের মধ্যে এখনো অনেকের হদিস মিলেনি।বাহিনীটির হাতে অপহৃদদের অনেকেই মুক্তিপন দিয়ে ফেরত এসেছেন। তাদের মধ্যে পুরান পল্লানপাড়ার নুরুর কাছ থেকে ৮ লাখ, সেলিমের কাছ থেকে ৫ লাখ, টমেটোর কাছ থেকে ৪০ হাজার, ছুরা খাতুনের কাছ থেকে ৪০ হাজার, শাহপরীরদ্বীপে বসবাসরত বার্মাইয়া জানে আলমের কাছ থেকে ১০ লাখ, শফিউল্লাহ মাঝি থেকে ৩৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে বাহিনীটি। রোহিঙ্গা ডাকাত আবদুল হাকিমের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা শিবিরের আনসার ক্যাম্পে অস্ত্র লুট ও আনসার হত্যার অভিযোগ ও ডজন মামলা রয়েছে। তারপরও থেকে গেছেন ধরা ছোয়ার বাইরে।
এ বিষয়ে টেকনাফ থানার ওসি (তদন্ত) শেখ আশরাফুজ্জামান বলেন, অস্ত্র লুটের সাথে আব্দুল হাকিমের জড়িত থাকার প্রমান পুলিশের হাতে রয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় একাধিক হত্যা ও অস্ত্র মামলা রয়েছে। এরমধ্যে টেকনাফ থানা ২০১৬ সালের ১০/১৬, ৪৩/১৬, ৪৪/১৬, ৪৬/১৬, ৪৭/১৬ নম্বর মামলার প্রধান আসামী রোহিঙ্গা ডাকাত হাকিম। ২০১৫ সালের জিআর নং-৪১৫/১৫ নং মামলা রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরে কক্সবাজার আদালতে অপহরণ মামলা সিআর ৯৪/২০১৭ মামলার প্রধান আসামী সেই ডাকাত।এছাড়া টেকনাফ মডেল থানায় অপর একটি বৈদেশিক নাগরিক আইন ও মাদক মামলা রয়েছে ।
তিনি আরো বলেন, সোমবার দিনগত রাতে আব্দুল হাকিমকে ধরতে অভিযান চালায় পুলিশ। কিন্তু সে পালিয়ে যাওয়ায় তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে তার সহযোগী ফরিদ আলম প্রকাশ আলম ডাকাতকে ৩ হাজার ইয়াবা ও একটি বিদেশী পিস্তল সহ আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় হাকিম ডাকাতকে পলাতক আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সূত্র জানায়,মিয়ানমারের রাশিদাং থানার বড় ছড়া গ্রামের জানি আলীর ছেলে আব্দুল হাকিম। ৮ বছর আগে মিয়ানমার পুলিশ তার এক ভাইকে সেখানে মেরে ফেলে। এরপর তিনি সেখান থেকে শাহপরীরদ্বীপ পালিয়ে আসে। শাহপরীরদ্বীপের বাজারপাড়ার মৃত নজির আহমদের ছেলে আব্দুল জলিলের বাসায় বসবাস করত। সেই সময় জলিলের নেতৃত্বেই গরু চুরি করত হাকিম। একদিন গরু চুরির সময় তাকে জনতা ধৃত করে গনপিটুনি দেয়। এরপর তিনি সেখান থেকে টেকনাফ পৌরসভার পল্লন পাড়ায় এসে সন্ত্রাসী সেলিম মিস্ত্রীর কাছে আশ্রয় নেয়। সেলিম মিস্ত্রীর বাহিনীতে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করার পর তার আরো ৫ ভাই বশির আহমদ, কবির আহমদ, নজির আহমদ, হামিদ হোছনকে নিয়ে আসে এপারে। এরপর থেকেই শুরু হয় আবদুল হাকিমের বর্বরতা। রাজত্ব চালাতে শুরু করে পুরো উপজেলায়। এরই মধ্যে হাকিম বিয়ে করে সেলিম মিস্ত্রীর ভাতিজা ও পুরান পল্লানপাড়ার জহির আহমদের মেয়েকে। পরে শ্বশুর বাড়ির সহায়তায় টেকনাফ বন রেঞ্জের উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের উত্তর-পশ্চিম দিকের আনুমানিক এক কিলোমিটার পর্যন্ত বনভূমি দখল করে।
বেপোরোয়া এই ডাকাত বাহিনী হাকিম ও তার ৫ ভাই ছাড়াও রয়েছে শ্বশুর বাড়ির অনেকেই। এছাড়া পৌরসভার ১ নং ও ২ নং ওয়ার্ডেও অনেকেই রয়েছে ওই গ্রুপে। তাদের মধ্যে জহির আহমদের ছেলে জাফর আলম ও তার সহোদর মো: রফিক, আবুল হাশিমের ছেলে নুরুল আলম ও তার সহোদর শমসু আলম, আব্দুল মোনাফের ছেলে মো: আনোয়ার, সুলতান আহমদের ছেলে ইউনুছ, দুলু মিয়ার ছেলে ফরিদ উল্লাহ, হামিদ মিস্ত্রীর ছেলে কালু পুতু, লালাইয়ার ছেলে জাহিদ হোছন, কালা মিয়ার ছেলে আবুল হাশিম সরদার, মো. কাশিমের ছেলে রাহামত উল্লাহ, রনদা কামালের ছেলে বাক্কুইনা, হাফেজ পাগলার ছেলে জহির আহমদ, মৃত লালুর ছেলে বদি আলম, আব্দূল আমিন মাঝি, তাহের আহমদের ছেলে ছমিউদ্দিন, নুর আহমদের ছেলে মো. রফিক, হামিদ হোছেনের স্ত্রী গুইল্ল্যাবি, ছৈয়দ আলমের ছেলে মো: ইউনুছ, আলম ডাকাত, সাব্বির আহমদ, সেলিম মিস্ত্রী ও ও তার ছেলে খাইরু, নুরুল আবছার নুরু, সালেহ আহমদের ভাগিনা বাডু উল্লেখযোগ্য।
এ প্রসঙ্গে টেকনাফ পৌরসভার মেয়র হাজী মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা ডাকাত হাকিম মূর্তিমান আতংক। আবদুল হাকিম ডাকাতের অত্যাচারে পুরান পল্লানপাড়া ও নাইট্যংপাড়ার মানুষ নিরাপদ নয়। এছাড়া অনেকে এলাকা ছেড়েছে। তার বিরুদ্ধে এতগুলো মামলা থাকার পরেও সে প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করছে এবং নিরীহ লোকজনকে অপহরণ করে তার আস্তানায় মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করছে।
বিজিবি- ২ এর অধিনায়ক আবুজার আল জাহিদ বলেন, হাকিম ডাকাতকে ধরতে কয়েকদফা যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু তিনি পালিয়ে যাওয়ায় তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও বলেন, ২৩ ফেব্রুয়ারি আবদুল হাকিমের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ইসমত আরা বেগম ও হাকিমের ভাই কলিম উল্লাহ প্রকাশ কবির আহমদ এবং তার সহযোগি নুরুল আমিনকে ৩ হাজার ৯৩৭টি ইয়াবা, ৭টি মোবাইল ও ২টি ছুরি সহ গ্রেফতার করা হয়। ওই সময় মুক্তিপণের জন্য আটকে রাখা শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়ার নুর মোহাম্মদের ছেলে মোহাম্মদ সেলিমকে উদ্ধার করে বিজিবি।
র্যাব-৭ এর কক্সবাজার ক্যাম্পের কমান্ডার লে. কমান্ডার আশেকউল্লাহ বলেন, শালবন আনসার ক্যাম্পের লুন্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো ঘটনার সাথে জড়িত অনেককেই আটক করা সম্ভব হয়নি। হাকিম সহ অনেক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ধরতে র্যাব কাজ করছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরুজুল হক টুটুল বলেন, রোহিঙ্গা ডাকাত আব্দুল হাকিম ও তার সাঙ্গপঙ্গকে ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি জনগনকেও অনুরোধ করেছেন ওই ডাকাতের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশকে গোপনে অবহিত করতে।
