উখিয়ার রোহিঙ্গা বস্তিতে রোহিঙ্গার হাতে রোহিঙ্গা খুনের মাত্রা বাড়ছে

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৯ years ago

বিশেষ প্রতিবেদকঃ (৩০জুন) কক্সবাজার থেকে :

উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী নতুন রোহিঙ্গা বস্তি দাগী অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্যে পরিনত হয়েছে।আল ইয়াকিন নামক নতুন রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতৃত্বে দিন – দিন সৃষ্টি হচ্ছে অপকর্ম।ইতিমধ্যে ৩ রোহিংগার মধে ২জন,মজলুম রোহিঙ্গাদের দাবী আদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী হলেও এ দুইজনের বিরুদ্ধে জংগী তৎপরতা ও সাধারণ রোহিঙ্গাদের বিভিন্নভাবে নিপীড়নের অভিযোগওও রয়েছে বিস্তর।

তাদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের অনিবন্ধিত টালের চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিক কে গত (২৯জুন) বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করেছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। তারা আবু সিদ্দিক কে মৃতভেবে ফেলে চলে গেলে স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে গেলে অবস্থার অবনতির আশংকায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।

অপরদিকে রমযানের কয়েকদিন পুর্বে মালয়েশিয়া ফেরত বলি নামের (২৭) এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে উখিয়া থানা পুলিশ।গত ১৩জুন অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা টালের ব্লক মাঝি আয়ুব ও নিবন্ধিত শিবিরের সলিম নামক দুইজনকে অপহরণ করে রাত গভীরে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় রোহিঙ্গা দুস্কৃতকারীরা। অপহৃতদের পরিবারের দাবী এ দুইজনকে “আল ইয়াকিন “নামক রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের লোকজন নিয়ে যায়। অপহরণের ৬দিনের মাথায় সলিম (১৮জুন) ও ২৫জুন আয়ুব মাঝির মৃতদেহ রোহিঙ্গা শিবিরের দক্ষিণে বালুখালীর তেলীপাড়া খাল থেকে পৃথক ভাবে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উখিয়া থানা পুলিশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় পৃথক মামলা রুজু হয়েছে বলে উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ ( ওসি) জানান।

দিন -দিন রোহিঙ্গা শিবিরের একের পর এক খুনাখুনী ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটালেও নিয়ন্ত্রণে তেমন একটা প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেই। এসব ঘটনায় জড়িতরা দিনের বেলায় লোকচঁক্ষুর আড়াঁলে থাকলেও রাতের সময়ে -অসময়ে শিবির অভ্যান্তরে মহড়া সশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে। তবে পুরান রোহিঙ্গা টালের ও নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের অভিযোগ “বালুখালীর নতুন রোহিঙ্গা বস্তুি গড়ে ওঠার পর থেকেই এসব অপরাধের ঘটনা ঘটছে। এমন সশস্ত্র রোহিঙ্গারা তাদের নিরাপত্তার জন্যে বালুখালী নতুন রোহিঙ্গা বস্তুিতে ঢুকে পড়ে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় রয়েছে বলে গোপন সুত্রে জানাযায়।

রোহিঙ্গাদের হাতে রোহিঙ্গা হত্যার মধ্যদিয়ে সশস্ত্র রোহিঙ্গারা তাদের শক্তি জানান দেয়। এনিয়ে খোঁদ রোহিঙ্গাদের মাঝে নতুন করে শংকা দেখা দিয়েছে। রোহিঙ্গা হাতে রোহিঙ্গারাই এখন অনিরাপদ।সরেজমিনে গিয়ে একাধিক রোহিঙ্গাদের (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্তের উখিয়ার পুরাতন কুতুপালং রোহিঙ্গা টাল ছাড়িয়ে নতুন করে একাংশে কুতুপালং ও বালুখালী বনভূমিতে গড়ে তোলা রোহিঙ্গা বস্তি নিয়ে জনমনে নানা উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।গভীর বনাঞ্চলে গড়ে ওঠা বালুখালীর জনবিচ্ছিন্ন এ রোহিঙ্গা বস্তিটি মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার নতুন আখড়া হতে চলছে বলে বিভিন্ন সূত্র ও স্থানীয় সচেতন মহলে মাঝে অভিযোগ ওঠেছে।

পূর্বে আসা কুতুপালং শিবিরের পুরাতন রোহিঙ্গাদের টার্গেটে পরিনত করেছে রোহিঙ্গারা।একেরপর এক অপহরণ ও লাশ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় গ্রামবাসীদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে পুর্বের রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে ফাঁয়দা লুটিয়ে বিপুল বিত্ত বৈভবের মালিক হওয়া কিছু গ্রামীকেও চিহ্নিত করেছে বলে জানা যায়।স্থানীয় গ্রাম বাসীদের অনেকেই অভিযোগে দাবী করে জানান,মিয়ানমার থেকে নতুন করে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা প্রথমে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির সংলগ্ন আশ্রয় নিয়ে নতুন রোহিঙ্গা বস্তি গড়ে তোলেন। বন বিভাগের বিশাল জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা বস্তি বনবিভাগ উচ্ছেদ করে। ফলে বালুখালী ও কুতুপালংয়ের গুটিকয়েক রোহিঙ্গা ব্যবসায়ী সার্থান্বেষী চক্র কৌশলে বনবিভাগের জায়গা দখল করে নতুন রোহিঙ্গা বস্তি গড়ে তোলে।

এতে বনবিভাগের বিপুল জায়গা জবর দখলে নিয়ে দেয় ওই অতিউৎসাহী চক্র। ধীরে -ধীরে ওই বস্তির স্থায়ীত্ব হতে থাকে। প্রশাসনের নজরদারি ফাঁকি দিয়ে পর্যায়ক্রমে রেশনপাতি বিতরণও চলে।যা অব্যাহত রয়েছে। পরবর্তী প্রশাসনের নজরদারিতে রেশন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলেও সুবিধাভভোগী চক্রও গোপনে ভিন্ন পন্থায় নতুন রোহিঙ্গাদের নানা সুবিধা দিয়ে স্থায়ীত্ব করণের
আভাঁস দৃশ্যমান হচ্ছে। এতে স্থানীয় সচেতন মহলে নানা উদ্ধেগ -উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। জানা গেছে সীমান্তের
উখিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কি.মি. দূরে বালুখালী পানবাজার থেকে প্রায় দুই কি.মি. পশ্চিমে গভীর বনাঞ্চলের মধ্যে সৃজিত সামাজিক বনায়ন উজাড় করে সম্প্রতি গড়ে তোলা হয় এ রোহিঙ্গা বস্তি। এ বস্তিতে যাতায়াতের একমাত্র পথ বালুখালী পানবাজার থেকে কিছু অংশ ইট বিছানো গ্রামীন রাস্তা, বাকি অংশে কোন রাস্তা নেই। এ পথটুকু হেঁটেই যাতায়াত করতে হয় বস্তি পর্যন্ত। আবার অপকর্ম সংঘটিত করতে কুতুপালং ও বালুখালী বস্তুি ঘিরে আলাদা গোপন পথ সৃষ্টি করেছে সশস্ত্র রোহিঙ্গারা। কুতুপালংয়ে নানা অপরাধমুলক কাজ সংঘটিত করে নির্বিঘ্নে বনের গোপন পথ দিয়ে বালুখালী বস্তুিতে চলে যায়। বালুখালীতে অপকর্ম করে কুতুপালং শিবিরে ঢুকে পড়ে।ফলে এখানে নির্ভয়ে চলে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা।অনেক দাগি আসামিও এখানে ঘাপটি মেরে আছে বলে সূত্রে জানা গেছে।এসব দাগী আসামিরা নিজেদের সার্থ আদায়ে তৎপর ভুমিকা রাখছে। ইতিমধ্যে নানা অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করতে, গঠন করেছে অঘোষিত ক্যাম্প ম্যানেজমেন্ট কমিটিও। তাদের ছত্রছায়ায় উত্তোলন করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নিকট থেকে টাকা ও বহুমুখী ফাঁয়দা। রোহিঙ্গারা প্রাপ্ত রেশন ও পণ্য সামগ্রী থেকে ভলান্টারিয়ার্স বাহিনী নামক “চাদাঁবাজ “দের কবলে অর্ধেক জমা করতে বাধ্য।

পক্ষান্তরে উখিয়ার অপর রোহিঙ্গা ক্যাম্প কুতুপালংয়ের অবস্থান উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কি.মি. দূরে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক সংলগ্ন। এখানে যে কারো সহজে যাতায়াত করা সম্ভব। কুতুপালং রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরের তত্বাবধানের জন্য সরকারের একজন ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে রয়েছে সশস্ত্র পুলিশ, আনসার বাহিনী।

এছাড়াও কুতুপালং রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির ও বস্তির কয়েকশত গজের ব্যবধানে রয়েছে কচুবনিয়া বা উত্তর ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ি ও উখিয়া টিভি উপকেন্দ্র। কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির ও বস্তিতে বর্তমানে প্রায় লক্ষাধিক রোহিঙ্গার অবস্থান। এটি মোটামুটি কিছুটা সরকারের নিয়ন্ত্রনে থাকার পরও এখানে অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবাসহ সব ধরণের মাদকের কারবার ও অসামাজিক কার্যকলাপসহ জঙ্গিদের আনাগোনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কুতুপালং শিবির -টালও বালুখালীর নতুন রোহিঙ্গা বস্তিতে ইতিমধ্যে মিয়ানমারের গুপ্তচর রয়েছে বলে সুত্রে জানা গেছে। ওইসব গুপ্তচর আসলে মিয়ানমার সরকার পক্ষে না,রোহিঙ্গাদের পক্ষাবলম্বন করছে? না “আল ইয়াকিন “নামক সশস্ত্র রোহিঙ্গাদের মদদপুষ্ঠ গুপ্তচর, তা নিয়ে প্রবল সন্দেহ রয়েছে।রোহিঙ্গাদের পক্ষাবলম্বন করে নাকি মিয়ানমার থেকে আরো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে এদেশে গোপনে রেশনপাতি, নগদ টাকা ও নানা উপঢৌকন বিতরণ করছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেখা দিয়েছে সচেতন দেশপ্রেমিক মহলে।

বালুখালীতে গড়ে তোলা নতুন রোহিঙ্গা বস্তি মিয়ানমার -বাংলাদেশ সীমান্তের পাশাপাশি হওয়ার কারণে রাতের আধারে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করে পরেরদিন আবার মিয়ানমারে চলে যায়। এতে কোন সমস্যা হয় না তাদের। এ সুযোগে কিছু ইয়াবা ব্যবসায়ী ইয়াবা নিয়ে অনুপ্রবেশ করে বালুখালী নতুন বস্তিতে অবস্থান নেয়,পরে সুযোগ বুঝে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করে থাকে। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারনে এমনিতে কিশোর-যুবক, অনেক বিবাহিত/অবিবাহিত পুরুষদের নিয়ে নানাভাবে সামাজিক, পারিবারিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সেগুলোর কারনে অনেক পরিবারে অশান্তি বিরাজ করছে, যা সমাজের সর্বত্র প্রভাব ফেলছে।

বালুখালী রোহিঙ্গা বস্তিকে ঘিরে ইতোমধ্যে স্থানীয় কিশোর-যুবকদের যাতায়াত বাড়ছে। বস্তি স্থাপনের ভূমিকা পালনকারীরা এলাকায় চিহ্নিত ইয়াবা পাচারকারী সন্ত্রাসী। দেশ-বিদেশের অজ্ঞাত উৎসের অর্থে রোহিঙ্গা বস্তিটিকে বালুখালীতে স্থায়ী করতে পারলে এখানে ওই চক্রের দুইটি উদ্দেশ্য সফল হবে। তার মধ্যে দেশি-বিদেশি জঙ্গিদের ঘাঁটিতে পরিণত করে স্থানীয় কিশোর ও যুবক সমাজকে ধ্বংস করাই তাদের মূল লক্ষ্য বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অবৈধভাবে বনবিভাগের সামাজিক বনায়নের
জায়গা দখল করে গড়ে তোলা বস্তির কারণে সরকারের
অন্তত শতাধিক একর বনভুমি যেমনি বেহাত হয়েছে,তেমনি কোটি -কোটি টাকার বনজ সম্পদ উজাড়ও হয়েছে।এর প্রভাব পড়েছে সামাজিক বনায়নের উপকারভোগীদের মাঝে।

পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন,নতুন করে রোহিঙ্গা বস্তির কারণে স্থানীয় জনগন অজানা আশংকায় পড়েছে।যার সত্যতা যে কয়দিন রোহিঙ্গাদের লাশ উদ্ধার প্রমাণ করে। প্রশাসনিক ভাবে রোহিঙ্গাদের একত্রে স্থানান্তর করা প্রয়োজন। উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন,নতুন রোহিঙ্গারা বিপুল জায়গা দখল করে আছে।দখলের জন্য স্থানীয় কিছু সার্থান্বেষী লোকই দায়ী। কুতুপালং রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা শিবির ইনচার্জ শামসুজ্জোহা জানান, রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রণ করা আমার কাজ। অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার বিষয়ে আমি জানিনা। তবে রেজিস্টার্ড শিবিরে অপরাধের সাথে জড়িতদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাইন উদ্দিন বলেন বালুখালীর নতুন রোহিঙ্গা বস্তিতে প্রশাসনের নজরদারিতে সাহায্য -সহযোগিতা করছে। কোন অপরাধের সাথে রোহিঙ্গারা প্রচলিত আইনের আওতায় সাজা পাবে।এমনকি গোপনে কোন এনজিও কোন অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবী বিচ্ছিন্ন বালুখালী রোহিঙ্গা বস্তিটি যত দ্রুত সময়ে স্থানান্তর করে কুতুপালং কিংবা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হউক।প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হউক। ছড়িয়ে -ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরায় দিন -দিন বেপরোয়া হয়ে ওঠছে।