কোরআনের অলৌকিকতার অনন্য নজির

diwp.jpg

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ : দক্ষিণ কোরিয়ার শিনদো আইল্যান্ড এক রহস্যঘেরা স্থান। পাশেই মোদো নামের দ্বীপ। জায়গা দুটির অবস্থান পাশাপাশি হলেও দূরত্ব একেবারে কম নয়, মাঝখানে অথৈ সাগর। বসন্ত ও গ্রীষ্মের মাঝামাঝিতে দুইবার শিনদো ও মোদো দ্বীপের মধ্যবর্তী পানি সরে প্রাকৃতিক নিয়মে রাস্তা সৃষ্টি হয়। দৈর্ঘ্য ২.৮ কিলোমিটার, প্রস্থ ৪০ মিটার। যেন সংযোগ সড়ক অথচ স্থায়িত্বকাল মাত্র এক ঘণ্টা! ঘটনাটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক।

মহান আল্লাহর আদেশে নিল নদের মধ্যে রাস্তা তৈরির ঘটনার সঙ্গে ‘মোজেস মিরাকল’-এর মিল আছে। মুসা (আ.) আর ফেরাউনের ঘটনা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ওই দ্বীপের বাস্তবতা থেকে তৈরি ‘মোজেস মিরাকল’-এ পাওয়া যায় কোরআনের সত্যতা। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের জন্য সাগরকে দ্বিধাবিভক্ত করে দিলাম, তারপর আমি তোমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছিলাম।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৫০)

ফেরাউনের বাহিনী, মুসা (আ.)-এর অনুসারীদের তাড়া করে লোহিত সাগরতীরে নিয়ে আসে। তখন মহান আল্লাহর ইচ্ছায়, মুসা (আ.)-এর লাঠির আঘাতে সাগরের মধ্য দিয়ে ১২টি রাস্তা হয়ে যায়। মুসা (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে নিরাপদে চলে যান, ডুবে মরে ফেরাউনের বাহিনী।

অন্যদিকে শিনদো আইল্যান্ডের ‘মোজেস মিরাকল’ ১৯৭৫ সালের পর ব্যাপক পরিচিতি পায়। একজন ফরাসি কূটনীতিক শিনদো ঘুরে এসে তাঁর দেশের পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এরপর প্রতিবছর হাজারও পর্যটক শিনদো ভ্রমণে আসেন ‘মোজেস মিরাকল’-এর টানে।

দক্ষিণ কোরিয়ানরা ‘মোজেস মিরাকল’ বা সাগর দ্বিধাবিভক্তির ঘটনাটি ‘শিনদো মিরাকল সি রোড ফেস্টিভাল’ হিসেবে পালন করেন। পর্যটকদের কাছে উৎসবটি দুর্লভ-সৌভাগ্যের ও দারুণ উপভোগ্য। সাগরের পানি সরে তৈরি হওয়া রাস্তা থেকে পর্যটকরা শামুক, ঝিনুক, ছোট ছোট মাছ ধরতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হয় সময়ের। কারণ রাস্তাটির স্থায়িত্বকাল মাত্র এক ঘণ্টা। সময় নষ্ট হলেই অনিবার্য মৃত্যু!

‘মোজেস মিরাকল’-এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো, বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত এ অঞ্চলের সাগরে ভাটার সময়। মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, কেন প্রতিবছর ওই সময়ে সাগর দ্বিধাবিভক্ত হয়? বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা হলো, পৃথিবীর ওপর সূর্য ও চাঁদের আকর্ষণের ফলে জোয়ার-ভাটা হয়। এমন জোয়ার-ভাটা সারা বছর থাকলেও কেন ওই সময়ে সাগর দ্বিধাবিভক্ত হয়? এমন জিজ্ঞাসার সন্তোষজনক জবাব আছে ‘টাইডাল হারমনিকস’ বিষয়ের ধারণায়।

বলা চলে, সূর্য, চন্দ্র ও পৃথিবী নিজস্ব কক্ষপথে আবর্তনকালে তাদের অবস্থান এমন এক নির্ধারিত স্থানে এসে দাঁড়ায়, যখন চন্দ্র-সূর্যের সম্মিলিত আকর্ষণে পৃথিবীর নির্দিষ্ট স্থানে জোয়ারের পরিমাণ অনেক কম থাকে। আর শিনদো দ্বীপের ওই স্থান একটু উঁচু হওয়ার সুবাদে পানি সরে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য রাস্তা তৈরি হয়। এ বিষয়ে ইসলামের ভাষ্য হলো, জোয়ার-ভাটা হয় আল্লাহর আদেশে। ইরশাদ হয়েছে, ‘সূর্যের এ ক্ষমতা নেই যে, সে চাঁদকে নাগালের মধ্যে পাবে। আর রাতও দিনকে অতিক্রম করে আগে চলে যেতে পারবে না।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৪০)

‘মোজেস মিরাকল’ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় নানা উপাখ্যান প্রচলিত। বহুল প্রচলিত ঘটনাটি হলো, শিনদো দ্বীপে অসংখ্য বাঘ থাকত, প্রায়ই বাঘ লোকালয়ে আক্রমণ করত। একবার বাঘের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সবাই মোদো দ্বীপে পালিয়ে যায়। শুধু পালাতে পারেননি এক বুড়ি। নিরুপায় বুড়ি লোকবিশ্বাস মতে, সাগরদেবতার কাছে তাঁর অসহায়ত্বের আর্তি জানান। দেবতা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে জানান, পরদিন সাগরে রংধনুর মতো পথ দেখা যাবে। পরদিন বুড়ি সাগরপারে গিয়ে দেখেন, ঠিকই সাগরের মধ্য দিয়ে একটি পথ তৈরি হয়েছে।

বস্তুত ‘মোজেস মিরাকল’ ও লোকজ ভাবনায়ও জ্ঞানীরা নিজের ক্ষুদ্রতা খোঁজেন আপন উচ্চারণে—

‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।

দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী—

মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,

কত না অজানা জীব, কত না অপরিচিত তরু।’