দূরপাল্লার বাহন বন্ধে কঠোর হোন

edi.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : মহামারীর অবনতিশীল পরিস্থিতির কারণে এবার ঈদুল ফিতরের ছুটি তিন দিন। এদিকে ঈদের আনুষ্ঠানিক ছুটি শুরু না হলেও বাড়ি ফেরার জন্য মানুষজনের দূরদূরান্তের যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। প্রতিবার ঈদের সময় এত বেশিসংখ্যক মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যায় যে, এই সময়ে যানবাহনের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়ে সড়ক, নৌ ও রেলপথে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়। এবার করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার এরই মধ্যে চলমান কঠোর বিধিনিষেধ আগামী ১৬ মে পর্যন্ত বাড়িয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে দূরপাল্লার পরিবহন, ট্রেন ও লঞ্চ বন্ধ রাখার কথাও বলা হয়েছে। তবে আগামী ৬ মে, বৃহস্পতিবার থেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে শহরাঞ্চলে সিটি পরিবহন এবং সারা দেশের জেলাগুলোতে জেলার ভেতরে গণপরিবহন চালানোর অনুমতিও দিয়েছে। কিন্তু এক জেলার বাস আরেক জেলায় যেতে পারবে না। অর্থাৎ আন্তঃজেলা গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। এবার ঈদের সরকারি ছুটির তিন দিনের মধ্যে দুই দিনই পড়ছে শুক্র ও শনিবার। তবুও সরকার ছুটি বাড়ায়নি মূলত নাগরিকদের দূরদূরান্তে যাত্রা নিরুৎসাহিত করতে। এই তিন দিনের বাইরে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাউকেই ছুটি দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে সব সরকারি চাকুরেদের কর্মস্থলে অবস্থান করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঈদের সীমিত ছুটি আর আন্তঃজেলা গণপরিবহন বন্ধ রাখার এই নির্দেশনা কি দেশব্যাপী ঘরমুখো মানুষের ঢল বন্ধ করতে পারবে?

সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধের ফাঁকফোকর গলে দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপরিবহন চলার খবর পাওয়া গেছে এর মধ্যেই। মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ চলাকালেও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলাতেই দূরপাল্লার বাস চালাচ্ছেন মালিকরা। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সরকারি নিয়ম অমান্য করে দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গে বাস চলাচল করছে। এক্ষেত্রে তারা প্রধান সড়ক ব্যবহার না করে বিকল্প রাস্তা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে চলাচল করছে। তবে সবসময় যে চোখ এড়িয়ে চলতে হয়, তাও নয়। সাধারণত পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করেই তারা বাস চালায় বলে অভিযোগও পাওয়া গেছে।

করোনাভাইরাসের বিস্তার কমাতে গত ৫ এপ্রিল থেকেই দেশে লকডাউনের বিধিনিষেধ জারি হয়, ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয় ‘কঠোর বিধিনিষেধ’। তখন থেকেই সড়ক, নৌ ও রেলপথে যাত্রী পরিবহন বন্ধ। এই সময়ের মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চালুর দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ মিছিলও করেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। তথাপি গণপরিবহন চলাচলে সরকারের অনমনীয় সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকাশিত খবরে রাতের অন্ধকারে গণপরিবহন চলাচলে সরকারি আদেশ অমান্যের কারণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি যে চরম আকার ধারণ করেছে সেটি স্পষ্ট। সম্প্রতি দেশের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারের ঢাকা থেকে সাতক্ষীরাগামী ১২টি বাসের বিরুদ্ধে মামলা করার খবর পাওয়া গেছে। প্রতিবেশী ভারতে করোনা পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এমন পরিস্থিতিতে, সীমান্তবর্তী জেলা দিয়ে লোকজনের চলাচল বন্ধ করা না গেলে করোনার নতুন নতুন ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এক জেলা থেকে আরেক জেলায় বাস চলাচল বন্ধ থাকার বিষয়টি জেলা পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশ তদারকি করছে। সরকারি নির্দেশনা ফাঁকি দিয়ে এরকম বাস চলাচলের ঘটনা পুরো জনগোষ্ঠীকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে।

খেয়াল করা প্রয়োজন যে, চলমান পরিস্থিতির মধ্যেও জীবিকার বিবেচনায় গত ২৫ এপ্রিল থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শপিংমলসহ অন্যান্য দোকান খোলার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানা হচ্ছে তা বলা যাবে না। অথচ এসব বিষয়ে আরেকটু যত্নবান হলে হয়তো সংক্রমণ মোকাবিলায় আরও সাফল্য পাওয়া যেত। কেননা, জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, চলমান কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ইতিমধ্যেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছুটা সুফল পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক এমন সময়েই ঈদ সামনে রেখে জনসাধারণের বাড়ি ফেরা ঘিরে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে গেল। প্রশাসন, বাস মালিক-চালকদের পাশাপাশি নাগরিকদেরও এই বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার ঘোষিত নিয়ম মেনে কর্মস্থলে অবস্থান করতে হবে। ঈদের ছুটিতে অযথা ঘোরাঘুরির প্রবণতা বন্ধে পরিবারের সদস্যদের প্রতিও কঠোর হতে হবে। ঈদের ছুটি ঘিরে বিপুল সংখ্যক নাগরিকের দূর-দূরান্তে চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এই সময়ে মানুষের ‘জরুরি যাত্রা’ এবং সড়ক-মহাসড়কের নিরাপত্তা ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি মনোযোগ ও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মহাসড়কগুলোতে হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা পুলিশকেও সক্রিয় থাকতে হবে। পাশাপাশি সজাগ থাকতে হবে সীমান্ত পার হয়ে আসা লোকজন যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে নির্দিষ্ট সময় কোয়ারেন্টাইনে থাকেন। সবার আন্তরিক প্রচেষ্টাতেই কেবল মহামারীর এই সংকটজনক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।