হারাম রিজিক থেকে বাঁচতে হবে

R.png

শাহীন হাসনাত : রিজিক এমন জিনিস, যা মহান আল্লাহ প্রাণিকুলের কাছে নিয়ে যান এবং প্রাণীরা তা আহার করে। রিজিক শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। যেমন- স্বাস্থ্য, সম্পদ, খাদ্য, বুদ্ধি, উপায়-উপকরণ ও সময় ইত্যাদি। এমনকি মানুষের জীবনটাও রিজিক। এসব কিছু আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন। মুসলিম হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহতায়ালা আমাদের রিজিকদাতা।

দুনিয়ায় জীবন ধারণের জন্য যত কিছুই করা হোক না কেন, এ দুনিয়া শেষ ঠিকানা নয়। সবাইকে অবশ্যই একদিন এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে, আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। সেদিন প্রত্যেককেই তার আয়-উপার্জন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। আল্লাহর সামনে হিসাব দিতে হবে কোন স্থান থেকে উপার্জন করলে এবং কোথায় ব্যয় করলে। সুতরাং রিজিক অন্বেষণের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকভাবে পরিত্যাজ্য বিষয়গুলো পরিত্যাগ করতে হবে, না হলে রিজিক হারাম হবে। ওই বিষয়গুলো হলো : কোনো উপার্জনে সামান্যতম হারামের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা পরিত্যাগ করা। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, হজরত নোমান ইবনে বাশির (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট, উভয়ের মাঝে বহু অস্পষ্ট বিষয় রয়েছে। যে ব্যক্তি গোনাহের সন্দেহযুক্ত কাজ পরিত্যাগ করে, সে ব্যক্তি যে বিষয়ে গোনাহ হওয়া সুস্পষ্ট, সে বিষয়ে অধিকতর পরিত্যাগকারী হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি গোনাহের সন্দেহযুক্ত কাজ করতে দুঃসাহস করে, সে ব্যক্তির সুস্পষ্ট গোনাহের কাজে পতিত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। গোনাহসমূহ আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা, যে পশু সংরক্ষিত এলাকার চারপাশে চরতে থাকে, তার ওই সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে।’ – বোখারি: ২০৫১

ইবাদত কবুলের জন্য পরিধেয় বস্ত্রসহ সবকিছু হালাল উপার্জনের হতে হবে, অন্যথায় তা গ্রহণযোগ্য হবে না। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা পবিত্র। তিনি শুধু পবিত্র বস্তু গ্রহণ করেন। তিনি মুমিনদের সেই আদেশই দিয়েছেন, যে আদেশ তিনি দিয়েছিলেন রাসুলদের।’ আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা পবিত্র বস্তু সামগ্রী আহার করো, যেগুলো আমি তোমাদের রিজিক হিসেবে দান করেছি।’ অতঃপর হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলি-ধূসরিত ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরে আকাশের দিকে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করে ডাকছে, হে আমার রব! হে আমার রব! অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারা সে পুষ্টি অর্জন করে। সুতরাং তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’ – মুসলিম: ২৭৬০

মিথ্যা ও প্রতারণার মাধ্যমে সম্পদ অর্জন না করা। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মিথ্যাচার থেকে বেঁচে থাকো, কেননা মিথ্যা নিয়ে যায় পাপ কাজের দিকে, আর পাপকাজ জাহান্নামে নিক্ষেপ করে। সুদের সঙ্গে কোনো অবস্থায়ই সম্পৃক্ত না থাকা। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ খুব শক্তভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তার রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শোনো, আর যদি তোমরা তওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের জুলুম করা হবে না।’ -সুরা বাকারা: ২৭৮-২৭৯

অত্যাচার করে সম্পদ অর্জন না করা। জুলুম একটি সর্বাধিক নিন্দনীয় অপরাধ, যা শক্তিমান মানুষ করে থাকে আর দুর্বল ব্যক্তি নীরবে তা সহ্য করে এবং আল্লাহর কাছে বিচার পেশ করে। সুতরাং এ পথে সম্পদ অর্জন চিরতরে পরিত্যাগ করতে হবে। হাদিসে আছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কি জানো কপর্দকহীন কে? সাহাবারা বলল, আমাদের মধ্যে যার সম্পদ নেই সে হলো- কপর্দকহীন। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সে হলো কপর্দকহীন, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে অথচ সে অমুককে গালি দিয়েছে, অমুককে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে লোকের মাল খেয়েছে, সে লোকের রক্ত প্রবাহিত করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। কাজেই এসব নির্যাতিতকে সেদিন তার নেক আমলনামা দিয়ে দেওয়া হবে। অপচয় ও অপব্যয় না করা। ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে অবশ্যই যে কোনো ধরনের অপচয় ও অপব্যয় থেকে বিরত থাকতে হবে।

ঘুষের সম্পৃক্ততা না থাকা। ঘুষ দেওয়া, নেওয়া বা এর সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা রাখলে সে উপার্জন সরাসরি হারাম। হাদিসে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহণকারী উভয়কে লানত (অভিশাপ) দিয়েছেন।’

অন্যের অধিকার নষ্ট না করা। যেকোনো পন্থা ও পদ্ধতিতে অন্যের হক বঞ্চিত করার মাধ্যমে যে উপার্জন করা হয় তা অবৈধ। তাই সব ধরনের অনাচারমূলক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে হবে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় তোমাদের রক্ত, তোমাদের মাল এবং তোমাদের সম্মান নষ্ট করা তোমাদের জন্য হারাম।’

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক