ভারতে শবের মিছিল ও আমাদের প্রস্তুতি

imon.jpg

হাবীব ইমন : এক. ভারতজুড়ে এখন শবের মিছিল। সারি সারি চিতা জ্বলছে। চারদিকে আহাজারি আর মৃত্যুর পদধ্বনি। একটু অক্সিজেনের জন্য ছটফট করে মরছে মানুষ। কী নির্মম দৃশ্য! দাহ করার জন্য শ্মশানে এক টুকরো জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে না। দেশটিতে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় চাপ পড়ছে শ্মশান ও কবরস্থানগুলোর ওপর। ভারতে করোনা পরিস্থিতির অভিঘাত কি আমাদের এখানে আসতেও পারে? প্রতিবেশী দেশে যখন এ অবস্থা, তখন আমাদের কী অবস্থা? কেননা আমাদের দেশের মানুষ স্বাস্থ্যবিধি সব শিকেয় তুলে উৎসবের কেনাকাটায় ব্যস্ত। ভারতের শবের মিছিলের চিত্রগুলো যখন গণমাধ্যমে দেখি, ভীষণ আঁতকে উঠি। লজ্জিতবোধ করি, অসহায়বোধ করি। শোক-সংহতি জানানো ছাড়া আমাদের সম্ভবত করার কিছু নেই। তবে ভারতের এ পরিস্থিতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়াটা জরুরি।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩৬টি স্থলবন্দর রয়েছে। আমদানি-রপ্তানিসহ নানা কারণে মানুষ আসা-যাওয়া করছে। ভারতে যে নতুন ধরনের করোনা সংক্রমণ হচ্ছে, এর ব্যাপ্তি ও এর শক্তি অনেক বেশি। সাময়িক হলেও এসব বন্দর বন্ধ রাখা প্রয়োজন ছিল আরও আগে। ইতিমধ্যে যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেছেন ভারতফেরত ১০ করোনা রোগী। এতে করে করোনার ভারতীয় ধরন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সংবাদ আমাদের জন্য ভীষণ উদ্বেগের। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের ভেতরে হতাশা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথমেই বলেছিল সংক্রমণের প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দাও। আমরা তাদের কথা শুনিনি। বিমানপথে যেসব যাত্রী বাইরে থেকে এসেছেন, তাদের ঠিকমতো নজরদারি করা হয়নি। আইসোলেশনে রাখা হয়নি। শাহজালাল বিমানবন্দরে কিছু নিয়মকানুন মানা হলেও অন্যগুলো খুবই উদাসীন।

আমরা করোনার প্রথম ঢেউ থেকে ভালো করে শিক্ষা নিতে পারিনি। যখনই ক্রাইসিসগুলো বড় আকার ধারণ করে, সে-সময় বলা হয় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। অথচ প্রস্তুতির কোনো বালাই থাকে না। করোনা মহামারী থেকে শিক্ষা নিয়ে মানবিক পৃথিবী এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে এমনটাই আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা যে শ্রেণি বা ক্ষমতাকেও অসহায় করে তোলে তা কি আমরা বুঝতে পারছি? নাকি কোনো মৃত্যুই আমাদের স্পর্শ করছে না? কর্তৃপক্ষ এক বছর ধরে বলছে, আমরা কেন, আমেরিকা-ব্রিটেন-ইতালিওতো পারছে না। পারার জন্য দূরে যেতে হয় না, কাছের ভিয়েতনাম আর কেরালাকে দেখলেই হয়। কথায় কথায় আমরা যে মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করি, সেটা জনযুদ্ধ হয়েছিল কারণ, তখন আমাদের ‘অন্তরে ডাক পাঠানো’ বা ‘জীবন জয়ে’র ডাক উঠেছিল। সেই মুক্তিযুদ্ধ এখন আমাদের শাসনের অস্ত্র হয়েছে বটে, কিন্তু তার রাজনৈতিক মর্মটা শিখিনি। শিখলে এই করোনা আমরা রাজনৈতিকযুক্ততায়-প্রজ্ঞায় মোকাবিলা করতাম, আমলাতান্ত্রিক অফিস আদেশে নয়।

গত বছর করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিদায় নিতে হয়েছে, কিন্তু সিস্টেম তো বদলায়নি। এবার বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ না উঠলেও অবহেলার অভিযোগ আছে। কভিড চিকিৎসার জন্য যে যন্ত্রপাতি আনা হয়েছিল, তা বিমানবন্দরে পড়ে থাকল কয়েক মাস। এগুলো আনা হয়েছিল করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য। যন্ত্রপাতি যদি বিমানবন্দরেই পড়ে থাকে, তাহলে লাভ কী হলো। গত ১৩-১৪ মাসে স্বাস্থ্যসেবার খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলা যাবে না। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রোগ শনাক্তকরণ-ব্যবস্থা এখনই ভালনারেবল অবস্থায় আছে, এর চেয়ে বেশি লোড সে নিতে পারবে বলে মনে হয় না। এমনিতেই আমরা অনেকগুলো ব্লান্ডার করে ফেলেছি, আরও ভুল করলে সিচুয়েশন আরও খারাপ হবে। আর তা ছাড়া জনগণকেও প্রস্তুত করা যায়নি। সরকার স্বাস্থ্যবিধি মানতে বলছে। কিন্তু তাতেই দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি কী হতে পারে, কোথায় গেলে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা বেশি, এসব তাদের বোঝানো উচিত ছিল। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ছিল। তারা সেটা পালন করেননি।

দুই. একবিংশ শতাব্দীর সব জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে কভিড-১৯ যেন মাঠে নেমেছে। তার বড় রণকৌশল হচ্ছে মুহূর্তেই চরিত্র বদলে ফেলা। আট হাজারবার চরিত্র বদল করেছে যে অণুজীব, তাকে ঘায়েল করা কি এতই সহজ? ওর সঙ্গে আমরা কতবার বদলে যেতে পারি বা কতটা সম্ভব? মানুষ মাস্ক পরতে পারে, সাবান দিয়ে হাত ধুতে পারে, ব্যবহৃত পণ্য, আসবাব ঘন ঘন জীবাণুমুক্ত করতে পারে, লকডাউন দিয়ে ঘরে সঙ্গনিরোধ পালন করতে পারে। কিন্তু তারও একটি সীমা আছে। কতদিন সঙ্গনিরোধ বা লকডাউন করে জীবন অচল করে বসে থাকব? যদি তার চরিত্র এক থাকত তবে মানুষ বুঝে নিত জীবন আচরণে কী বদল আনলে, অণুজীব দেহে প্রবেশের সুযোগ পাবে না। তার চরিত্রে বড় রকমের এক রহস্য আছে।

তিন. চরিত্রগত জায়গায় ভারতের যে অবস্থা বাংলাদেশেও ঠিক একই। ওদের ওখানে দিনে দিনে ধর্মীয় গোঁড়ামি খুব জটিল আকার ধারণ করেছে। আমাদের এখানেও। মানুষ যখন তার শক্তি, সামর্থ্য, বুদ্ধি দিয়ে কোনো কিছু ব্যাখ্যা করতে পারে না বা সে বিষয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভোগে তখনই ধর্মের গুরুত্ব তার কাছে বাড়তে থাকে। ‘সাইলেন্ট মেজরিটি’ দুদেশেই বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে। তারা ধর্মে বেশি অন্ধভাবে আবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের আহলে হাদিস, আহলে সুন্নত থেকে শুরু করে প্রায় সবাই বলছে ‘ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই’। এদের মধ্যে আব্বাসী, আবদুর রাজ্জাক, মুফতি হামজা অন্যতম। করোনা যে একটা রোগ, সেটা তারা মানতে রাজি নয়। অবশ্য এর সঙ্গে রাজনীতিও রয়েছে। ফলে এরা মানুষকে মহামারী নিয়ে অসচেতন করে তুলেছিল। অন্যদিকে ভারত সম্প্রতি ‘কুম্ভমেলা’র আয়োজন করেছে। আর সরকারের বড় বড় নেতা পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করে আসছেন। কেউ কেউ বলছেন, এতে করোনা হবে না, কেউ আবার গরুর মুতে করোনার টিকা পেয়েছে। কিছুদিন আগে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন বাবা রামদেবের পতঞ্জলির বানানো করোনা নির্মূলের ভুয়া মেডিসিন ‘করোনিল’ নিয়ে প্রচার করেন। আর তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিল ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন। কতটা গাড়ল হলে ২০২১ সালে এসে একজন মন্ত্রী এই কাজ করেন।

অন্যদিকে, আমাদের শিক্ষিতশ্রেণির মধ্যেও প্রথম থেকেই একটা উন্নাসিক অবস্থা দেখা গেছে। অধিকাংশ মানুষই তা মানছে না। এরা কিতাবদুরস্ত শিক্ষিত হলেও আদৌতে বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠতে পারেনি। আর বাকিদের কথা নাইবা বললাম। মসজিদের ইমাম মানেন না। মন্দিরের পুরোহিতরা মানেন না। ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ যারা বলেন, তারাও মানেন না। সত্যিই করোনা অতিমারী নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে যা চলছে, তাতে ‘বিজ্ঞান কিঞ্চিৎ কম পড়িয়াছে’ আমাদের দেশে যেমন, গোটা ভারতেও তেমন।

লেখক : সহকারী সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি