বেকারত্ব কমাতে কর্মসংস্থানে জোর চাই

edi-1.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : চলমান করোনা মহামারীর এক বছর তো বটেই তার আগের দুই বছরও দেশে কোনো শ্রমশক্তি জরিপ হয়নি। দেশে সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপ হয়েছিল ২০১৭ সালে। সেই জরিপ অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬ কোটি ৩৫ লাখ। আর তাদের মধ্যে কাজ করেন ৬ কোটি ৮ লাখ নারী-পুরুষ। কর্মক্ষম থেকে কর্মরত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বিয়োগ করলে পাওয়া যাচ্ছে বেকারের সংখ্যা। সেটা ২৭ লাখ। এ তো তিন বছর আগের হিসাব। করোনাকালে যে লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়ে নতুন করে বেকার হলো তাদের সংখ্যা কত? আর বিগত তিন বছরে নতুন কর্মসংস্থানই বা কতটুকু হয়েছিল? করোনাকালে বেকারত্বের একটা হিসাব দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীভুক্ত প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। প্রতিষ্ঠানটি এক সমীক্ষায় জানিয়েছে, বাংলাদেশে কভিড-১৯ এর কারণে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে (এমএসএমই) কর্মরত ৩৭ শতাংশ মানুষ বেকার হয়েছেন। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, করোনা মহামারীর কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম। করোনা মহামারীতে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার দ্বিগুণ হয়েছে। আইএলওর হিসাবে, এই তরুণদের সবাই পূর্ণকালীন কাজে নিয়োজিত থাকলে বাংলাদেশে করোনাকালে বেকারের সংখ্যা হতো অন্তত ১৬ লাখ ৭৫ হাজার।

একদিকে দীর্ঘদিন ধরে দেশে কর্মসংস্থানের শ্লথগতি, আরেকদিকে করোনাকালে নতুন করে ব্যাপক বেকারত্ব বৃদ্ধিতে একটা উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি চাকরির নিয়োগ ও নির্বাচনী পরীক্ষা স্থগিত হয়ে থাকা। কারণ দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে থাকায় অনেক চাকরিপ্রার্থী তরুণ-তরুণীরই বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, দেশে মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদের এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশই পুরোপুরি বেকার। আর ১৮ দশমিক ১ শতাংশ পার্টটাইম বা খণ্ডকালীন কাজে নিয়োজিত। এই পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থার চাকরির বিজ্ঞপ্তি না থাকা ও আগের চাকরির পরীক্ষাগুলোও অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত থাকায় শিক্ষিত বেকারদের ভবিষ্যৎ পড়েছে চরম অনিশ্চয়তায়। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) তিনটি নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে। এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা, তিতাস গ্যাস, সিলেট গ্যাস ফিল্ড, সেতু বিভাগ, পল্লীবিদ্যুৎসহ আরও কয়েকটি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাও স্থগিত রয়েছে। আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বড় একটি নিয়োগের পরীক্ষাও ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে। এসব নিয়োগ পরীক্ষা কবে অনুষ্ঠিত হবে তা কেউই বলতে পারছেন না। এই অচলাবস্থায় সরকারি চাকরির বয়স পেরিয়ে যাওয়ার সংকটের সুরাহা কী হবে সেটা নিয়েই চিন্তিত এই প্রজন্মের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের বড় অংশ।

পিএসসি করোনা মহামারীতে সবধরনের পরীক্ষা ও নিয়োগ বন্ধ রেখেছে। সর্বশেষ ১২ এপ্রিল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নন-ক্যাডার চাকরির আবেদন কার্যক্রমও স্থগিত করেছে সরকারি কর্ম কমিশন। এছাড়া ৩১ মার্চ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ১০ গ্রেডের সিনিয়র স্টাফ নার্স ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের ফটো টেকনিশিয়ান পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে পিএসসির চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস বেড়ে যাওয়ায় জনসমাগম হয় এমন সব নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এই মুহূর্তে পরীক্ষা আয়োজনের সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়বে।

লক্ষ করা প্রয়োজন, দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বিগত এক দশক ধরেই ২৩ শতাংশের কাছাকাছিতে আটকে আছে। বিনিয়োগ স্থবিরতায় করোনার আগেও কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি চলছিল। এই পরিস্থিতি এখন আরও খারাপ হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশের ভেতরেই প্রতি বছর অন্তত ২২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি লক্ষ্য ছিল। প্রথম চার বছরে প্রতি বছর প্রকৃত কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র ১২ লাখ। এদিকে নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প উদ্যোগ প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। আর প্রণোদনার অর্থ বিতরণের পরও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে অলস তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। বৈশ্বিক করোনা মহামারীতে সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিই এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই সংকট মোকাবিলা নিঃসন্দেহে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে শ্রমিকের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি সমাজে সব পেশাকে সম্মানের চোখে দেখার মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে। সব কর্মই সম্মানের এই মূল্যবোধের প্রচার প্রসার করতে হবে। পাশাপাশি, করোনাকালীন বিশ্ব অর্থনীতির নতুন রূপান্তরের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আসন্ন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরির কাজে এখনই বিনিয়োগ করতে হবে। আর দেশের শ্রমশক্তির উপযুক্ত কর্মসংস্থানের জন্য নতুন বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।