ভোক্তা ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষিত হোক

EDi.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : করোনা মহামারীর মধ্যে একটি ভালো খবর হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বোরো ধানের ভালো ফলন হয়েছে। শেষ মুহূর্তে কোনো বড় দুর্যোগ না হলে এবং ফসল নিরাপদে ঘরে তুলতে পারলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে। তবে এসবের মধ্যেও আশঙ্কা রয়েছে ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে। কৃষকের কাছ থেকে সরকার একটি নির্দিষ্ট দামে ধান, চাল কিনে থাকে। চলতি বছরে ক্রয়ের জন্য সরকার এখনো মূল্য নির্ধারণ করতে পারেনি। আগামী ২৮ এপ্রিল থেকে ধান এবং ৭ মে থেকে চাল সংগ্রহ শুরু করতে চায় খাদ্য মন্ত্রণালয়। বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।

গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, বোরোর দর নির্ধারণী সভা অনুষ্ঠিত হলেও দর নির্ধারণে একমত হতে পারেননি মন্ত্রীরা। শেষ পর্যন্ত দর চূড়ান্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সাধারণত বোরোর দর মন্ত্রী পর্যায়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএসসি) বৈঠকে নির্ধারণ হলেও তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর নজির নেই। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। সরকারের মজুদ কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও প্রয়োজনমতো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় বাজারদরও ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় মন্ত্রীরা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না করে বা ঝুঁকি না নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছেন। এখন প্রধানমন্ত্রীর মুখের দিকে চেয়ে আছেন দেশের কৃষকরা। এমন পরিস্থিতিতে, প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কৃষক যাতে ধানের ন্যায্যমূল্যটুকু পান, পাশাপাশি দেশে যাতে মূল্যস্ফীতি না দেখা দেয়।

খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী কেজিপ্রতি চালের দাম ৪০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত বছর চালের দাম ছিল ৩৬ টাকা, একবার ৪ টাকা বাড়িয়ে ৪০ টাকায় যাওয়া ঠিক হবে না। এতে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। এ অবস্থায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৩৯ টাকা দর নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। আর আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে সেদ্ধ চালের চেয়ে ১ টাকা কম দামে। আর ধান সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয় ২৭ টাকা কেজি দরে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কৃষকদের দিক বিবেচনা করে দাম নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ৪০ টাকার নিচে দর নির্ধারণ করা হলে কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন না বলেও জানানো হয়। বিপরীতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ৪০ টাকা দর নির্ধারণ করা হলে বাজারে চালের দাম অনেক বেড়ে যাবে। গত বছর ৩৬ টাকা দর ছিল, তাতেই বাজার ছিল চড়া। এবার ৪০ টাকা হলে বাজার আরও চড়ে নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে, ধান ও চালের এমন একটি সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যেটা বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা না হলে মূল্য নির্ধারণ করে কোনো লাভ হবে না।

খাদ্য অধিদপ্তর চলতি বোরো মৌসুমে ১৮ লাখ টন ধান ও চাল কেনার প্রস্তাব দিয়েছে। মিলারদের কাছ থেকে ১০ লাখ টন সেদ্ধ চাল, দেড় লাখ টন আতপ চাল এবং কৃষকদের কাছ থেকে সাড়ে ৬ লাখ টন ধান কেনার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে। গত বছর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান-চাল কিনতে পারেনি সরকার। গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে চলতি মৌসুমে বাস্তবসম্মত দাম নির্ধারণের পাশাপাশি সরকারের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। করোনা মহামারীর এ বছরে বিশ^ব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা যখন হুমকির মুখে, সে মুহূর্তে ধানের মূল্য নির্ধারণে বাড়তি সতর্কতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। অধিকাংশ কৃষককে ধান ফলানোর খরচ জোগাড় করতে হয় ঋণ নিয়ে এবং ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঋণ পরিশোধের তাগিদ সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া সার, কীটনাশক ও অন্যান্য উপকরণের পেছনেও খরচ হয়। অনেক ধানচাষির আর্থিক অবস্থা এমন যে, ধান কাটার শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধের জন্য নগদ টাকাও তাদের কাছে থাকে না। ফসল ফলানোর পরেও কৃষকদের নানা বঞ্চনা ভোগ করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকরা যাতে লোকসানের মুখে পড়ে ধান চাষে অনাগ্রহী হয়ে না পড়ে সে বিষয়ে খাদ্য বিভাগের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের নিশ্চিত করতে হবে যেন কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পান। পাশাপাশি ভোক্তাপর্যায়ে চালের মূল্য যাতে সহনীয় থাকে সেটিও ভাবতে হবে। সরকারকে কৌশলী ভূমিকা পালন করতে হবে। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান, চাল কেনাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। ধানচাষি ও সরকারের মাঝে যাতে মধ্যস্বত্বভোগী প্রবেশ করতে না পারে স্থানীয় খাদ্য বিভাগকে সেই বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।