নিরুপায় মানুষের সহায় হোন

sompadokio.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে বিপন্ন ও অসহায় করে তুলেছে করোনাভাইরাস। এর সর্বগ্রাসী ছোবলে রচিত হচ্ছে নতুন নতুন বিয়োগান্ত ও করুণ ঘটনা। করোনা শুধু আর্থিক বিপর্যয় আনেনি, মানসিক বিপর্যয়ও ডেকে এনেছে। মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত খবরে উঠে এসেছে, করোনায় কর্মহীন মানুষের ঢাকা ছাড়ার এমনই সকরুণ কাহিনী। তবে এই কাহিনী কেবল রাজধানী শহর ঢাকার নয়। অন্যান্য শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও এখন বিপর্যয়ের পদধ্বনি।

করোনার সংক্রমণ শুরুর এক বছর পরে চলতি বছরের মার্চে আবারও করোনা ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে দেশে। করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে গত ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর বিধিনিষেধ চলছে। তবে এরও নয় দিন আগে থেকে কার্যত লকডাউনের আওতায় দেশ। ৫ এপ্রিল থেকে শুরু ওই নিষেধাজ্ঞা তেমন কার্যকর না হলেও গণপরিবহনসহ অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ। এরপর ১৪ এপ্রিল থেকে বিধিনিষেধ কঠোর করে সরকার। ইতিমধ্যে ২০ এপ্রিল নতুন প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও রিকশাচালকসহ দিনমজুর শ্রেণির মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন। তারা বলছেন, একদিন কাজ না থাকলে শিশুসন্তানসহ উপোস থাকতে হয়। করোনায় এমন মানবিক বিপর্যয় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। টানা এক বছর ধরে করোনার থাবা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবিকায় বড় প্রভাব ফেলেছে। কেউ চাকরি হারিয়েছেন, কেউ বেতন পাচ্ছেন অর্ধেকেরও কম। তাই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬-১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৮ লাখ। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত জনশক্তি মাত্র ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ। আর সবচেয়ে বড় অংশ ৮৫ দশমিক ১ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৫ কোটি দিনমজুর। যারা দিন আনে দিন খায় তাদের জীবিকা অনিশ্চিত ও অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। করোনাভাইরাস এসব মানুষের জীবিকায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। গত বছর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর আগে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ শতাংশ। করোনা শুরুর কিছুদিনের মধ্যে এই হার ৪২ শতাংশে গিয়ে ঠেকে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। সংস্থাটির জরিপ অনুযায়ী, ৪২ শতাংশ মানুষ এখন দরিদ্র। শুধু করোনার কারণেই বাংলাদেশ প্রায় ২০ বছর আগের অবস্থানে ফিরে গেছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের তীব্রতা যদি বেশি হয় তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা মুশকিল। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের দেড় কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। চলমান ‘লকডাউন’ দীর্ঘায়িত হলে তারা চরম খাদ্য সংকটে পড়বে বলে জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও শ্রমবিষয়ক সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জরিপে বলা হয়েছে, কভিডের আঘাতে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার ফলাফল খুবই আশঙ্কার। যারা শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন, গ্রামেও যে তারা কাজ করে সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারবেন এমন নিশ্চয়তাও নেই। তবু বাসাভাড়া ও জীবন ধারণের খরচ কমাতে অনেকেই গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কভিডের আঘাত সব জায়গায় একইভাবে অনুভূত হয়নি। শহরের তুলনায় গ্রামে প্রভাব কমই দেখা গেছে। সে কারণে শহরের বস্তিবাসীর জীবন গ্রামের শ্রমজীবীদের তুলনায় অনেক বেশি অরক্ষিত। তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যারা রাজধানী ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন, বিশেষত দিনমুজর পরিবারগুলোর পাশে জরুরি সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে প্রণোদনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ‘লকডাউনে’ কাজ বন্ধ হওয়ায় খাবারের অভাব দেখা দেওয়ায় যারা বাড়ির পথ ধরেছেন তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন তৈরি করতে হবে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সার্বিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মানুষের অন্নের জোগানও করতে হবে। দাঁড়াতে হবে অসহায়ের সহায় হয়ে। তবেই এই দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।