আত্মশুদ্ধিই হোক রমজানের লক্ষ্য

islam-edu.jpg

শাহীন হাসনাত : বছর ঘুরে এসেছে সংযম ও ত্যাগ-তিতিক্ষার মাস পবিত্র রমজান। যে পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত তার একটি রোজা। নামাজের পরই রোজার স্থান। মানুষের দৈহিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নে রোজা অত্যন্ত ফলপ্রসূ একটি ইবাদত। সংযম, সহিষ্ণুতা ও আত্মশুদ্ধির অনন্য চেতনায় ভাস্বর রমজানকে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সুমহান মাস হিসেবে অভিহিত করেছেন।

রোজা মানুষকে প্রকৃত আধ্যাত্মিক ও জাগতিক মানুষ হতে অনুপ্রাণিত এবং কার্যকরভাবে সহায়তা করে। এবার এমন এক সময় রমজান এসেছে, যখন বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব ভয়াবহ বিপদ ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন। করোনার নতুন ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে নানা দেশে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এমতাবস্থায় বিশ্বজুড়ে লকডাউন, চলাচলে বিধিনিষেধ, কারফিউ এবং সামাজিক সঙ্গনিরোধ কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশেও চলছে চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ। এমনকি মসজিদে ব্যাপক সংখ্যক মুসল্লি সমাবেশ নিষেধ করা হয়েছে। ফলে ইফতার, তারাবি ও তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে মসজিদে জড়ো হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ইবাদত-বন্দেগি যা কিছু করার, ঘরে বসেই করতে হবে।

রোজা অবশ্য পালনীয় একটি বিধান। রোজার লক্ষ্য হলো- তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন। সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে আল্লাহতে বিশ্বাসীরা, তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল; যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ আল কোরআন নাজিল হয়েছে এ মাসে, যা মানবজাতির হেদায়েতের একমাত্র অবলম্বন। যে কেউ সহজ সরল পথ পেতে চাইবে, তাকে নিবিড়ভাবে কোরআন-সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে।

সিয়াম সাধনার মূল প্রতিপাদ্য হলো- সংযমের শিক্ষা। রোজা পালনের মাধ্যমে প্রবৃত্তির ওপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে করে মানুষের প্রকৃতিতে স্বভাবজাত যে পাশবিক শক্তির উপস্থিতি আছে তা অবদমিত হয়, আধ্যাত্মিক শক্তি বাড়ে। কেননা ক্ষুধা ও পিপাসায় মানুষের জৈবিক চাহিদা খর্ব হয় এবং মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য অবলম্বন, সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্ভ্রমবোধ ও সৌজন্য প্রদর্শন, সর্বোপরি সব কাজে বুদ্ধি-বিবেচনাপ্রসূত মাত্রা ও মূল্যবোধের অনুসরণ ব্যক্তি তথা সমাজ জীবনের অনিবার্য অবলম্বন হওয়া আবশ্যক। সিয়াম সাধনায় এই শিক্ষাই মানুষ অর্জন করে।

বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবতা ভিন্ন। এ দেশে রোজার মাস হওয়ার কথা শান্তিময়; কিন্তু রমজানেই যেন সংযমের পরিবর্তে ভোগের বাঁধভাঙা জোয়ারে ভাসে জনজীবন। রমজানে খাওয়া-দাওয়ার কোনো হিসাব হবে না- এমন মানসিকতা থেকে সংযম ও ত্যাগের মানসিকতার পরিবর্তে দেখা যায় বল্গাহীন ভোগের উদগ্র বাসনা। সবাই খাদ্য উৎসবে মেতে ওঠে। ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। সাধারণ মানুষ রোজাকে আত্মিক উন্নতির বাহন হিসেবে না নিয়ে ভোগের উৎসবে পরিণত করে। আত্মসংযমের রমজানকে যে যার মতো স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ারে পরিণত করে। এক্ষেত্রে শ্রেণি ভাগ করা কঠিন। এমন মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে, নিজের দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে ‘সমাজটা গোল্লায় যাচ্ছে’ বলে দায় এড়ানোর প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রকৃত রোজাদার হওয়ার সাধনায় নিমগ্ন থেকে নৈতিক এ অবক্ষয় মোকাবিলা করতে হবে।

রমজান মাসে সব সৃষ্টি আল্লাহর অশেষ রহমতে ধন্য হয়। পরম করুণাময়ের অপার রহমতের দরজা বিশ্বাসীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের মহাকল্যাণ লাভ থেকে বঞ্চিত থাকল, সে প্রকৃতই সব কিছু থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর বিশেষ রহমত ও কল্যাণে পরিপূর্ণ। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা পালন করেন, তারাই দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হওয়ার আশা করতে পারেন। তারা আল্লাহর কাছ থেকে লাভ করবেন অসীম রহমত। যারা প্রকৃত সতর্ক ও জ্ঞানী, তারা এ সুবর্ণ সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন। রোজা পালনের মধ্য দিয়ে মুমিনরা আত্মিকভাবে নিজেদের আত্মোন্নয়নের চেষ্টা করেন।

আগেই বলা হয়েছে, কভিড-১৯ মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংক্রমণ ও মৃত্যু আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সংক্রমণ রোধে নতুন করে এক সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে দেশে। এমনই এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবার হাজির রমজান মাস। বিধিনিষেধের প্রভাবে দরিদ্র, অভাবী ও শ্রমজীবীদের কষ্ট আরও বাড়বে। এমতাবস্থায় রমজানের মর্ম উপলব্ধি করে সাধ্যমতো অভাবীদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে সম্পদশালীদের; যাতে দরিদ্রদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। সেই সঙ্গে বিপন্ন মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে যেন কোনো ধরনের অনৈতিক বাণিজ্য, দুর্নীতি আর হেলাফেলা কেউ করতে না পারে; সরকারকেও তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

সংকটে হতাশাগ্রস্ত জাতি নতুনভাবে স্বপ্ন দেখতে চায় আত্মসমীক্ষার পথ ধরে। তাই রমজান মাসে আমাদের অঙ্গীকার করা উচিত, সত্যিকারের উপলব্ধির সঙ্গে রোজা পালনের। রোজার শিক্ষা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিফলিত করার। মানুষে মানুষে বৈষম্য, শোষণ ও অন্যায়ের অবসান ঘটাতে যথাসাধ্য কার্যকর ভূমিকা রাখা এবং সর্বদা সবার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার।

রমজানের শিক্ষা ধৈর্য, সংযম ও সহমর্মিতা। একে অপরের প্রতি সম্প্রীতি, সমবেদনা ও সহমর্মিতা রমজানের শিক্ষা। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে মুসলমানদের ওপর নানা দিক থেকে আক্রমণ আসছে। অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িক হামলা, অপপ্রচার সব মিলিয়ে বিশ্ব মুসলিমকে এক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় শিক্ষা নিতে হবে সংযমের উৎকর্ষ থেকে। যেকোনো পরিস্থিতিতে উসকানিতে সাড়া না দিয়ে সংযম ও তাকওয়া রক্ষা করে চলাই রমজানের শিক্ষা। ইসলাম শুধু অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম নয়, এর মূল বাণীই হচ্ছে মানবতার উৎকর্ষ। আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য আর মানুষসহ সব সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা। পবিত্র রমজানে মুসলমানের জীবন-জীবিকার সর্বত্র সততা, ভালোবাসা, আন্তরিকতা, সংযম ও পবিত্রতার ছোঁয়া লাগবে, এটাই কাম্য।

লেখক : ইসলামবিষয়ক লেখক