নিত্যপণ্যের দামে গরিবের নাভিশ্বাস

nazer.jpg

এস এম নাজের হোসাইন : এক বছরের বেশি সময় ধরে চলতে থাকা করোনাভাইরাস মহামারীতে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ চাকরি-বাকরি, আয়-রোজগার হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। অনেকে গ্রামে ফিরে গিয়েও নতুন কর্মসংস্থান করতে পারেননি। এমন পরিস্থিতির মধ্যে বিগত কয়েকদিন ধরেই আসন্ন পবিত্র মাহে রমজানকে সামনে রেখে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন দিতে শুরু করেছেন। এর মধ্যেই এলো কঠোর বিধিনিষেধের ঘোষণা। কঠোর বিধিনিষেধের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই নিত্যপণ্যের বাজারে ক্রেতার ভিড় আর মূল্যবৃদ্ধির ঘোড়া দুটোই ঊর্ধ্বগতিতে ছুটছে। ফলে গরিব এবং নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকার নিশ্চয়তা বিধানে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

করোনা মহামারীতে গরিব মানুষের জীবন যে কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তার ধারণা পাওয়া যেতে পারে বিভিন্ন গবেষণায়। গত আগস্ট মাসে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অব ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর গবেষণায় উঠে এসেছে যে করোনাকালে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ১৫ বছর আগের অবস্থানে ফিরে যেতে পারে। ২০০৫ সালে বাংলাদেশে এ হার ছিল ৪০ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, দেশের ৪০টি জেলার দারিদ্র্যের হার জাতীয় হারকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বৈশ্বিক মহামারী কমবেশি সব পেশার মানুষকেই অস্থির করে তুলেছে। এ অবস্থায় সবার প্রত্যাশা ছিল, এবার অন্তত বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের কারসাজিতে লাগামহীন হয়ে পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজার। পেঁয়াজ, চাল, আলু, সবজি, ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দা, মসলা এভাবে চক্রাকারে এক এক বার এক একটি পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। করোনার এই মহামারী সংকটে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত বছরের ১৩ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর ‘কভিড-১৯ বাংলাদেশ : জীবিকার ওপর অভিঘাত ধারণা জরিপ’-এর তথ্যমতে করোনায় মানুষের আয় কমেছে ২০ শতাংশ। চাকরি হারানো মানুষের তালিকাও বেশ লম্বা। শুধু তৈরি পোশাকশিল্পের ১০৬ কারখানাতেই ৭০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। অন্য খাতের হিসাব ধরলে সেটি কয়েক লাখে গিয়ে দাঁড়াবে।

করোনার আগে গত মার্চ মাসে গড়ে যেসব পরিবারের মাসিক আয় ছিল ১৯ হাজার ৪২৫ টাকা, আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৪৯২ টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ মাসের ব্যবধানে পরিবারপ্রতি আয় কমেছে প্রায় চার হাজার টাকা। জরিপের তথ্যানুযায়ী, গত মার্চে দেশে পরিবারপ্রতি মাসিক খরচ ছিল ১৫ হাজার ৪০৩ টাকা। গত আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ১১৯ টাকায়। তার মানে, আয় কমে যাওয়ায় ভোগের চাহিদাও কমেছে।

এই পরিস্থিতিতে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর বাজার মনিটরিংয়ের তথ্য অনুযায়ী নিত্য ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ে তুলনামূলক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে মোটা চাল ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ৪৬-৫০ টাকা কেজি, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ৪৪-৫২ টাকা। ডাল ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ১০০-১১০ টাকা কেজি, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ১০০-১২০ টাকা। ভোজ্যতেল ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ১১৫-১২৫ টাকা লিটার, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ১৩০-১৪০ টাকা। পেঁয়াজ (দেশি) ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ৫০-৬৫ টাকা কেজি, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ৩৫-৪০ টাকা। চিনি ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ৬২-৬৫ টাকা কেজি, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ৬৮-৭০ টাকা। রসুন (আমদানি) ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ৯০-১০০ টাকা কেজি, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ১০০-১২০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ১১৫-১২৫ টাকা কেজি, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ১৫০-১৬৫ টাকা। আটা (প্যাকেটজাত) ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ৩০-৩৩ টাকা কেজি, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ৩৩-৩৬ টাকা। ময়দা ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ৪০-৪৫ টাকা কেজি, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ৪৫-৫০ টাকা। গুঁড়োদুধ ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ৪৯০-৬৪০ টাকা কেজি, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ৫৫০-৬৯০ টাকা। আদা ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ৭০-৯০ টাকা কেজি, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ৭০-১২০ টাকা। গরুর মাংস ২০ ডিসেম্বর ২০২০ ছিল ৫০০-৫৮০ টাকা কেজি, এ বছরের ২০ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ৫৬০-৬০০ টাকা।

করোনার আগের বছরও এক কেজি মোটা চাল ৩৪ থেকে ৪০ টাকায় কিনতে পেরেছেন সাধারণ মানুষ। সেই চাল কিনতে এখন লাগছে ৪৪ থেকে ৫২ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে ২৯ শতাংশের বেশি। একইভাবে ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা লিটারের সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে সাড়ে ৩৭ শতাংশ। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল এখন কিনতে হচ্ছে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকায়। চাল-তেলের মতো আটা, চিনি, ব্রয়লার মুরগি, গরুর মাংস, গুঁড়োদুধ, রসুনসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে স্বল্প আয়ের মানুষ চাপে পড়েছে। করোনার লকডাউনের বিপর্যস্ত সময়ও এভাবে না বাড়লেও বিগত তিন মাসেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে বেশি।

প্রতি বছরই আমরা লক্ষ করি, রমজান শুরু না হতেই বাড়তে থাকে রমজানে ব্যবহার্য সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম। ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই দাম নির্ধারণ করে দিতে হয়েছে। যদিও সরকার নির্ধারিত দামে ভোজ্যতেল পাওয়া দুষ্কর। ভোজ্যতেল ছাড়াও ডাল, সাদা মটর ও রমজানের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ছোলার বাজারও বাড়তি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে যেসব পণ্যের দাম বাড়তি, সেগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সম্পর্ক রয়েছে। তবে শুল্ক ও কর কমানো গেলে কয়েকটি পণ্যের দাম কিছুটা হ্রাস পাবে, যেমন সয়াবিন তেল ও চিনি। সয়াবিন তেল আমদানিতে বর্তমানে আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৪ শতাংশ অগ্রিম কর, উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বিক্রয় পর্যায়ে ৫ শতাংশ ট্রেড ভ্যাট আরোপ করা আছে। আগে কেবল আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট থাকলেও ২০১৯-২০ অর্থবছর উৎপাদন ও বিক্রয় পর্যায়ে ভ্যাট আরোপ করা হয়। অন্যদিকে চিনি আমদানিতে প্রতি টনে ৩ হাজার টাকা আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩০ শতাংশ ও অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ দিতে হয়। বিক্রয় পর্যায়ে ৫ শতাংশ ট্রেড ভ্যাট আরোপ করা আছে। এ খাতে ব্যবসায়ীদের মতে আমদানি, উৎপাদন ও বিক্রয় পর্যায়ে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে বর্তমানে ২৫-২৬ টাকা শুল্ক ও কর দিতে হয়। সরকার যদি কর কমায়, তাহলে সাধারণ মানুষ কিছুটা কম দামে পণ্য দুটি কিনতে পারবে। কিন্তু সরকার চালের শুল্ক কমানোর পরেও চালের মূল্য কমেনি। সেক্ষেত্রে চিনি ও ভোজ্যতেলেও কর কমানো হলে দাম কমবে কি না সন্দেহ থেকেই যায়।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়তই আশ^স্ত করা হচ্ছে, তারা বাজার তদারকি অব্যাহত রেখেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, তাহলে বাজার তদারকির সুফল ভোক্তারা পাচ্ছে না কেন? করোনাকালে দেশব্যাপী নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে লাগাম টানা যাচ্ছে না। বিশেষ করে গত বেশ কয়েক মাস ধরে নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতির পাগলা ঘোড়া কোনোভাবেই বশ মানছে না। যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রায় আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেহেতু এই চাপ যাতে আর না বাড়ে সেজন্য সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

cabbd.nazer@gmail.com