গরিব ও শ্রমজীবীদের সুরক্ষা দিতে হবে

E-1.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সামাল দিতে আজ সোমবার থেকে সাত দিন গণপরিবহন চলাচল বন্ধের পাশাপাশি বাজার-মার্কেট, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। মহামারী পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গত ২৯ মার্চ যে ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়েছিল, তার আলোকেই এসব বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। রবিবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ৫ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে ১১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত এসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। সারা দেশে জেলা ও মাঠ প্রশাসন এসব বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত টহল জোরদার করবে। সরকারের এই ঘোষণাকে একপ্রকার লকডাউন হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। আর এমন পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর শ্রমজীবী মানুষ এবং সারা দেশের গরিব মানুষদের আয় রোজগার তথা জীবিকা নির্বাহ নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়ে গেছে। বিশেষত গত বছরের সাধারণ ছুটির কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে গরিব ও শ্রমজীবীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।

গরিব ও শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের এখন একটাই চিন্তা সংসার কীভাবে চলবে, জীবন-জীবিকার উপায় কী হবে? রিকশাচালক, সিএনজিচালক, হকার, ফুটপাত ব্যবসায়ী, দিনমজুর, নাপিত, বাস-ট্রাকের হেলপার-চালক, হোটেল-রেস্তোরাঁর কর্মচারী, এমনকি উবার-পাঠাওয়ের চালকরাও এই দুশ্চিন্তাগ্রস্তদের কাতারে রয়েছেন। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণি আর নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীও একই দুশ্চিন্তার কাতারে শামিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এমন লকডাউনে আদৌ সুফল মিলবে কি না, সেটা একটা প্রধান জিজ্ঞাসা। এ ছাড়া নিম্নআয়ের মানুষকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগিয়ে সুফল পাওয়াটাও চ্যালেঞ্জিং। বিশেষত যে শ্রমজীবীরা দিন আনে দিন খায় তাদের জন্য সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, গত বছর দরিদ্র মানুষের জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতির তিনটি বড় খাত হচ্ছে কৃষি, শিল্প ও সেবা। প্রতিটি খাতের কয়েকটি উপখাত আছে। কৃষির প্রধান উপখাতগুলো হলো শস্য উৎপাদন, প্রাণী ও মৎস্য সম্পদ। স্বল্পমেয়াদে এসব উপখাতে উৎপাদন না কমলেও দেশি-বিদেশি অর্থনীতি অবরুদ্ধ থাকার কারণে এসব উপখাতের উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এ জন্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা জরুরি। দরিদ্র মানুষকে সহায়তা দিতে শহর ও গ্রামে গত বছর যেসব কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, তারও সঠিক প্রয়োগ জরুরি। অন্যদিকে, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতসহ শিল্পকারখানা খোলা রাখার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আরও করণীয় আছে। ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা শ্রমিকদের ঝুঁকিভাতা দেওয়া এবং কারখানায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হলে চিকিৎসার দায়িত্ব কারখানা মালিক এবং সরকার নিতে পারে। পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু এবং খাদ্য ও নগদ সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।

লক্ষ করা প্রয়োজন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপ, সতর্কতা, ঋণ নিশ্চয়তা স্কিম (ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম) গঠনসহ নানা উদ্যোগের পরও গত বছর ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে প্রণোদনার ঋণ বিতরণ সফল হয়নি। সিএমএসএমই খাতের জন্য যে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয় গত অক্টোবর পর্যন্ত ওই তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছিল মাত্র ৭ হাজার কোটি টাকার মতো। পরে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ বিতরণের মেয়াদ বাড়িয়েও খুব একটা লাভ হয়নি। এ বছর মার্চের শেষ দিকে এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন জানান, চলতি অর্থবছরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ১০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে সংস্থাটি। প্রণোদনা প্যাকেজের অবশিষ্ট ২০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হবে আগামী অর্থবছর।

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, মহাসংকটের কালে যদি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা যথাযথ সহায়তা না পান তাহলে তারা ঘুরে দাঁড়াবেন কীভাবে। ঋণের শর্ত সহজ করা, বিনা সুদে বা খুব কম সুদে দ্রুত আপৎকালীন ঋণসহায়তা প্রদান এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। মনে রাখা দরকার এটি কেবল সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের সহায়তার প্রশ্ন নয় বরং এই খাতে জড়িত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন এখানে যুক্ত। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ এবং মোট শ্রমবাজারের ২৫ শতাংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে সিএমএসএমই খাতে। তাই এই আপৎকালে দেশের হতদরিদ্র, গরিব ও শ্রমজীবীদের সুরক্ষার বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।