মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনের ভবিষ্যৎ

f-4.jpg

নাজমুল আহসান : মিয়ানমারে গণতন্ত্রপন্থিদের আন্দোলনে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। সামরিক জান্তা যেন আরেকটি গণহত্যার দিকে আগাচ্ছে। হত্যাযজ্ঞ উপেক্ষা করে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন শহরে প্রতিদিনই বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সরকারকে হটিয়ে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে এবং দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। তাদের ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে মিয়ানমার প্রায় এক দশক ধরে আংশিক গণতন্ত্র চর্চার কবর রচনা করেছে। এখন পর্যন্ত সু চির দল ও বিরোধী জোট ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে যাচ্ছে। ১৯৮৮ সালে দেশে ফেরার পর অং সান সু চি মিয়ানমারের অবিসংবাদিত নেত্রী ও মিয়ানমার মূলত বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। উল্লেখ্য, অং সান সু চির সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্ক যথেষ্ট ভালো। অন্যভাবে বলা যায়, পশ্চিমারা মিয়ানমার বিষয়ে অং সং সু চির ওপর নির্ভর করতে চায়। সু চি নিজেও দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাস করেছেন। ২০২০ সালের নির্বাচনেও সু চির দল বিপুলভাবে জয়লাভ করে; যদিও সামরিক বাহিনী আভিযোগ করছে, নির্বাচন ও নির্বাচনের আগে সু চির দল অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে। সামরিক বাহিনীর এই অভিযোগকে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য একটি খোঁড়া যুক্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে।

এর আগে অং সান সু চি ও তার দল ১৯৯০ সালে মিয়ানমার গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে সারা বিশে^ পরিচিতি লাভ করেছিলেন এবং ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী হয়েছিলেন। যদিও পরবর্তী সময়ে অনেক কর্মকা-ের ফলে তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করার পর মিয়ানমার ১৯৬২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনের অন্তর্গত ছিল। ২০১২ সালে যখন মিয়ানমারে জান্তা সরকার বহির্বিশে^র সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সীমিত আকারে গণতান্ত্রিক চর্চা উন্মুক্ত করে। যদিও সে সময় রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সরকার পরিচালনায় সামরিক বাহিনীর বেশ শক্ত ভূমিকা ছিল। এমনকি সংসদে প্রতিনিধিদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ছিল সামরিক বাহিনী থেকে। এসব পরিপ্রেক্ষিতে এনএলডি ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন বয়কট করে কিন্তু পরবর্তী সময়ে উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। ২০১৫ সালের নির্বাচনে তার দল জয়লাভ করলে সু চি স্টেট কাউন্সেলর নির্বাচিত হন।

সু চির আমলে সবচেয়ে জঘন্য ঘটনা হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত করা এবং এর পক্ষে সাফাই গাওয়া। তিনি যখন স্টেট কাউন্সেলর ছিলেন, তখন ২০১৭ সালে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে এবং এই সময় বিভিন্ন সূত্রমতে প্রায় দশ হাজারের মতো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিহত হয়। কোনো কোনো সূত্রমতে, এই সংখ্যা আরও বেশি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সু চি ২০১৯ সালে হেগে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের সামনে উপস্থিত হয়ে সামরিক বাহিনীর পক্ষে ওকালতি করেন।

বর্তমান সময়ে মিয়ানমার এশিয়ার রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বলা যায় দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক সংযোগ। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই মিয়ানমারের গুরুত্ব বেড়ে যায়। মিয়ানমার নিয়ে আগ্রহ সবার। যেমন ভারত, পশ্চিমা দেশ এবং হালে তাদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের। সবাই মনে করছে মিয়ানমারের ওপর তাদের সুসংহত নিয়ন্ত্রণ বিশ^ রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আরও বেশি ক্ষমতা অর্জনে সহযোগিতা করবে এবং এ ক্ষেত্রে তারা এই দেশটির কৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করতে পারবে। যে কারণে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন ও হত্যাকা-ের পর বিশে^র ক্ষমতাধর দেশগুলোর কাছ থেকে যে প্রতিক্রিয়া পাওয়ার কথা ছিল তার সামান্য অংশও পাওয়া যায়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনেক সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় যদি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ শক্তিসহ আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারত, তাহলে হয়তো আজকের এ অবস্থা এড়ানো যেত।

বর্তমানে মিয়ানমারে সু চি ও বিরোধী জোটের যে আন্দোলন, তা কতটুকু গণতান্ত্রিক চেতনা থেকে বা কতটুকু সামরিকতন্ত্রবিরোধী অবস্থান থেকে, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা যেতে পারে। এর কারণ, সাম্প্রতিক ইতিহাস ও চর্চায় মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রকাশ খুব একটা পাওয়া যায় না। সু চির শাসনকালে মিয়ানমারে ভিন্নমতাবলম্বী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। তবে সু চি যেমন মিয়ানমারে পশ্চিমাদের প্রতিনিধি, একই সঙ্গে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর বাইরে ধনী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও পলিটিক্যাল স্টাবলিশমেন্টের প্রতিনিধিও। সেই বিচারে বর্তমান আন্দোলনকে পুরোপুরি গণতান্ত্রিক না বলাই ভালো। কারণ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সর্বজনীন কিছু মূল্যবোধের কথা বলে। সংখ্যাগরিষ্ঠের দাবি-দাওয়া ও অধিকার আদায়ের তুলনায় সংখ্যালঘুদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারাটাই বেশি গণতান্ত্রিক। আর এখানেই জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে গণতন্ত্রপন্থিদের পার্থক্য। গণতন্ত্রপন্থিরা গণতন্ত্রের সর্বজনীন মূল্যবোধকে বজায় রাখে, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য গণতান্ত্রিক রীতি, নীতি ও পদ্ধতিকে ব্যবহার করে। যেটাকে গণতন্ত্র না বলে কৌশলগত বা আপেক্ষিক গণতন্ত্র বলা ভালো।

ক্ষমতায় থাকাকালে ব্যক্তি সু চি সামরিক বাহিনীকে তুষ্ট করার জন্য যারপরনাই এমন কোনো ভূমিকা নিতে বাকি রাখেননি। রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ থেকে সামরিক বাহিনীকে রক্ষা করার জন্য দেশে ও বিদেশে সামরিক বাহিনীর পক্ষে যথেষ্ট প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। কিন্তু সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তার সখ্য আর টিকল না। এর পেছনে মিয়ানমারের সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে যেমন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কাজ করেছে, একই সঙ্গে বৈশি^ক রাজনীতিও বড় ভূমিকা পালন করছে। চীন-মার্কিন রেষারেষি না হলে এখনই এই পরিস্থিতি হতো না। কথায় আছে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। মিয়ানমারের এ ঘটনা এ শিক্ষাই দিচ্ছে, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কোনো অগণতান্ত্রিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সখ্য বেশি দিন স্থায়ী হয় না। কারণ, যখনই স্বার্থের সংঘাত তৈরি হবে, তখন এই গোষ্ঠীগুলো নিজেদের কুৎসিত চেহারা সবার সামনে উন্মোচন করা থেকে এতটুকুও পিছপা হয় না।

অনেক সময় আমরা মন্দের ভালো বলে অনেক অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক আচরণকে মেনে নিই। কিন্তু এটা বলে রাখা ভালো, অন্যায় ও অবৈধ আচরণকে ন্যায় বা বৈধতা দেওয়া অপরাধের শামিল, যা থেকে হয়তো সাময়িক কোনো সুবিধা পাওয়া যায়; কিন্তু আদতে ফলাফল কখনো ভালো হয় না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক চর্চা সুদূর পরাহত।

যত দিন না বিশ্ব ব্যবস্থায় ক্ষমতার লড়াই বন্ধ হচ্ছে, ধনী ও ক্ষমতাশালী দেশগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক আচরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তত দিন তৃতীয় বিশে^র দেশগুলোয় গণতন্ত্র থাকা বা না থাকা নিয়ে দোলাচল চলতেই থাকবে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

psmiraz@yahoo.com