কম্পানি ও যৌথ কারবারের ইসলামী বিধান

c.jpg

মুফতি তাজুল ইসলাম : কম্পানির আভিধানিক অর্থ সংঘ। কখনো কখনো ‘সঙ্গী’ অর্থেও এ শব্দ ব্যবহার করা হয়। ইউরোপে শিল্পবিপ্লব হওয়ার পর সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বড় বড় কারখানা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিরাট অঙ্কের পুঁজির প্রয়োজন দেখা দেয়। আর ওই পরিমাণ পুঁজি কোনো এক ব্যক্তি বা কতিপয় ব্যক্তি দ্বারা জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তখন সব শ্রেণির লোকদের সঞ্চিত অর্থ একত্র করে যৌথভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে কম্পানিব্যবস্থা চালু হলো। এর প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য এই যে এতে কয়েক ব্যক্তির একটি দলকে একটিমাত্র আইনসম্মত ব্যক্তির পজিশন দেওয়া হয়। ওই আইনসম্মত ব্যক্তিকে ‘করপোরেশন’ বলা হয়। যার একটি বিভাগ কম্পানি নামে পরিচিত।

দুই বা ততোধিক ব্যক্তি পারস্পরিক চুক্তি ও সম্মতি সাপেক্ষে নিজেদের পুঁজি বিনিয়োগ করে যৌথভাবে কোনো কারবার করতে চাইলে তার নীতিমালা ও মাসায়েল নিম্নরূপ :

(১) যথারীতি যৌথ কারবারের চুক্তি অঙ্গীকার হওয়া চাই। লিখিত হওয়ায় উত্তম। মৌখিক হলেও জায়েজ।

(২) সবার পুুঁজি ও মুনাফা সমান হওয়া জরুরি নয়; বরং কারো পুঁজি কম, কারো বেশি হতে পারে। এবং সে অনুপাতে মুনাফা অল্প বা বেশি হতে পারে।

(৩) মুনাফা বণ্টনের হার পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করতে হবে। কে কত হারে অংশ পাবে, তা বর্ণনা করতে হবে।

(৪) মুনাফার সম্পর্ক শুধু পুঁজির সঙ্গে নয়; বরং শ্রম, সাধনা, কৌশলগত যোগ্যতা, বুদ্ধির প্রখরতা প্রভৃতির প্রভাব আছে মুনাফার ক্ষেত্রে। তাই কারো মধ্যে এ গুণাবলি বেশি থাকার কারণে তার পুঁজি কম হওয়া সত্ত্বেও তাকে মুনাফার হার অধিক দেওয়া যেতে পারে। তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে তা নির্ধারিত হতে হবে।

(৫) প্রত্যেকের স্বয়ং অথবা প্রতিনিধির মাধ্যমে কাজে অংশগ্রহণ জরুরি। তবে কোনো কারণবশত কোনো পক্ষ অংশগ্রহণে অসমর্থ হলেও মুনাফায় অংশীদার থাকবে। কেননা ক্ষতি হলে তাকেও তা বহন করতে হবে।

(৬) কারবারের শুরুতে যদি কোনো অংশীদার বলে যে আমি কাজে অংশ গ্রহণ করব না, তাহলে এ কারবার তার জন্য ফাসেদ (বাতিল) হয়ে যাবে।

(৭) যে বিষয়ে যৌথ কারবার চলে তা ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সবার অধিকার সমান। এভাবে যেকোনো অংশীদারের হাতে কারবারের ক্ষতি হলে সবার তার দায়িত্ব বহন করতে হবে। অবশ্য কোনো অংশীদার তাকে কোনো দ্রব্য ক্রয় করতে বাধা দেওয়া সত্ত্বেও যদি সে ক্রয় করে এবং ক্ষতি হয় তাহলে তার দায়িত্ব একা তাকে বহন করতে হবে। এভাবে কেউ কোনো দ্রব্য ক্রয় করতে গিয়ে শোচনীয়ভাবে প্রতারিত হয়ে থাকলে সে দায়িত্ব তার ওপরই বর্তাবে।

(৮) কোনো শরিক স্বেচ্ছায় ক্ষতি করলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে ক্ষতির দায়িত্ব তার ঘাড়ে বর্তাবে।

(৯) সব অংশীদারের অনুমতি ছাড়া কোনো অংশীদার কাউকে যৌথ মূলধন থেকে ঋণ দিতে পারবে না।

(১০) লাভ-ক্ষতিতে সব অংশীদার সমান অংশীদার হবে, কোনো অংশীদার ক্ষতির ভাগ থেকে মুক্তি থাকার শর্ত আরোপ করলে বা কোনো অংশীদার ক্ষতির দায়িত্ব পুরোটা নিজে নিতে চাইলে এ যৌথ কারবার নাজায়েজ হবে।

(১১) নিজের ব্যক্তিগত মালামালের সঙ্গে যৌথ কারবারের মালিককে একত্র করে রাখা অথবা উভয় কারবার মিশ্রিত করে রাখা জায়েজ নয়। তবে সব অংশীদারের অনুমতি থাকলে তা জায়েজ।

(১২) সব অংশীদারের সম্মতি ছাড়া নতুন কোনো অংশীদারকে সম্মতি করা যাবে না।

(১৩) যে যৌথ কারবারে কোনো যৌথ বিনিয়োগ করা হয়, কোনো অংশীদার ওই কাজে ব্যক্তিগত অর্থ বিনিয়োগ করে পৃথক কারবার করলেও তা যৌথ কারবারের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। যেমন—কিছু লোক যৌথভাবে একটি কাপড়ের দোকান দিলে, এ অবস্থায় এদের কেউ ব্যক্তিগতভাবে দ্বিতীয় পৃথক কোনো কাপড়ের দোকান দেওয়ার অনুমতি পাবে না।

(১৪) যদি কোনো অংশীদার অপর কোনো অংশীদারকে বলে যে এ কারবার এ স্থানে করলে ভালো হবে; এ অবস্থায় অন্য স্থানে কারবার করলে যদি ক্ষতি হয় তাহলে ইচ্ছা অনুযায়ী যারা সেটা করবে ক্ষতির দায় তাদের বহন করতে হবে। অবশ্য মুনাফার চুক্তি অনুযায়ী সবার নিজ নিজ অংশ পাবে।

(১৫) যদি কোনো কারণে যৌথ কারবার বাতিল হয়ে যায় অথবা কেউ নিজেই স্বেচ্ছায় চুক্তি বাতিল করে তাহলে মুনাফা পুঁজি অনুপাতেই বণ্টিত হবে। যদিও কারবারের শুরুতে মুনাফা বেশ-কম গ্রহণের শর্ত হয়ে থাকে; কিন্তু ভঙের সময় তা কার্যকর হবে না।

(১৬) অংশীদারদের কেউ ইন্তেকাল করলে চুক্তি এমনিতেই বাতিল হয়ে যাবে। অবশ্য উত্তরাধিকারীরা ইচ্ছা করলে চুক্তি নবায়ন করতে পারবে।

(ইসলামী ফিকাহ, তৃতীয় খণ্ড; ব্যাংকের সুদ কি হালাল; ও আহকামে জিন্দেগি অবলম্বনে)