আগামীর অভিযাত্রায় বাংলাদেশের পাশে থাকবে ভারত

image-406171-1616864771.jpg

শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি বৈঠক
অনলাইন ডেস্ক :
আগামীর অভিযাত্রায় বাংলাদেশের পাশে থাকবে ভারত। যেমনিভাবে একাত্তর সালে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল; তেমনিভাবে বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় পাশে দাঁড়াবে প্রতিবেশি দেশটি। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা বিনির্মাণে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং দুই দেশের সহযোগিতার এই পথচলা অব্যাহত রাখবে ভারত।

শনিবার ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।

এ সময় বাণিজ্য, কানেক্টিভিটি, কোভিড মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিষয়ে সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন দুই সরকারপ্রধান।

এছাড়া বৈঠকে সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও তিস্তা চুক্তি দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, তথ্য প্রযুক্তি ও খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই নেতা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পাঁচটি প্রকল্পের উদ্বোধন এবং দুইটি প্রকল্পের ভিক্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন। এ সময় তিস্তা চুক্তি দ্রুত স্বাক্ষরে ভারত আন্তরিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময় ভারত জানায়নি বলেও জানান তিনি। ড. মোমেন বলেন, শুধু তিস্তা নয়; ছয়টি যৌথ নদীর ন্যায্য হিস্যার বিষয় আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোরালভাবে উপস্থাপন করেছেন। জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, চুক্তিটি দ্রুত স্বাক্ষরে ভারত আন্তরিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং এ বিষয়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

আবদুল মোমেন বলেন, সীমান্তে হত্যার বিষয়টিও আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বলেছেন। তিনি এ সমস্যার সমাধানে তাকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। এর জবাবে নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, সীমান্তে হাট তৈরি করা গেলে এ সমস্যার অনেকখানি সমাধান হবে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বিষয়ে ভারতের ভূমিকার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারত মনে করছে- রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। সেটিই নরেন্দ্র মোদি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের দুই দেশের মধ্যে যেসব অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে তার সবগুলোই দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ সফরের মধ্য দিয়ে আমাদের দুই দেশের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। সে সঙ্গে এ অঞ্চলের উন্নয়নে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতেও অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছে।

ড. মোমেন বলেন, এ সফর আমাদের জন্য গর্বের ও গৌরবের। শুধু ভারত নয়, বিগত দশ দিনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা বাংলাদেশ সফর করেছেন। সে সঙ্গে ষাটেরও অধিক দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। তারা আমাদের অভাবনীয় সাফল্যে অভিভূত বলেও জানিয়েছে। সেই সঙ্গে আমাদের সঙ্গে কাজ করতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। গত দশ দিনের আয়োজন আমাদের বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য। ড. মোমেন বলেন, সব মিলিয়ে আমাদের দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসার জন্য নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নরেন্দ্র মোদির এ সফরে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সমঝোতা স্মারকগুলো হল- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, রেজিলেন্স এবং প্রশমন বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ ও ভারত। এছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) এবং ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর অব ইন্ডিয়া (আইএনসিসি) মধ্যে সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক, বাণিজ্য নিয়ে সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক, বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল সার্ভিস অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিজিএসটি) সেন্টারের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য, কোর্সওয়ার অ্যান্ড রেফারেন্স বুক সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক এবং রাজশাহী কলেজ মাঠ ও আশপাশের এলাকায় স্পোর্টস সুবিধা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

উদ্বোধন করা প্রকল্পগুলো হলো- গ্রাউন্ড ব্রেকিং সেরিমনি ফর ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফর পাওয়ার ইভাকুয়েশন ফ্যাসিলিটিজ অব রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট, ঢাকা ও নতুন জলপাইগুড়ির মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন মিতালী এক্সপ্রেস, কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ি রবিন্দ্র ভবনের সম্প্রসারিত উন্নয়ন কাজ, আশুগঞ্জে ইন্ডিয়ান যৌথ বাহিনীর শহিদদের স্মরণে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন তিনটি সীমান্ত হাটের উদ্বোধন করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

পাশাপাশি দুই প্রধানমন্ত্রী মুজিবনগরের মেহেরপুর থেকে নদীয়া হয়ে কলকাতা পর্যন্ত স্বাধীনতা সড়ক চালুর বিষয়ে একটি ভিডিও প্রত্যক্ষ করেন। বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে উপহারের ১০৯টি অ্যাম্বুলেন্সের একটি প্রতীকী চাবি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেন নরেন্দ্র মোদি। এছাড়া ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে ১.২ মিলিয়ন করোনা টিকা দেওয়ার প্রতীকী হিসেবে এক বক্স টিকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেন নরেন্দ্র মোদি।

বিকাল ৫টার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে শেখ হাসিনা তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। দুই সরকারপ্রধান প্রথমে কিছু সময় একান্তে বৈঠক করেন। পরে তাদের নেতৃত্বে শুরু হয় দুই দেশের প্রতিনিধি দলের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, যা চলে সন্ধ্যা সোয়া ৬টা পর্যন্ত। পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সীমান্তে ঘটনা বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং সীমান্তে দুঃখজনক ঘটনা কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অনুরোধ করেন। এর জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, মাঠ পর্যায়ের (গ্রাউন্ড লেভেল) সহযোগিতা এ ধরনের ঘটনা বন্ধে সহায়তা করবে।

এদিকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর খুবই অর্থবহ হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে সোনালী অধ্যায় রচনা করতে যাচ্ছি; এ সফর তার সত্যিকার প্রতিফলন।

এদিন সন্ধ্যা ৭টায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বঙ্গভবনে যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বঙ্গভবনে পৌঁছালে আবদুল হামিদ তাকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান। পরে ক্রেডেনশিয়াল হলে বসে বৈঠক করেন তারা। সাক্ষাৎ শেষে পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। পরে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে সন্তোষ প্রকাশ করে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে টিকা প্রদান করায় রাষ্ট্রপতি ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানান। রাষ্ট্রপতি আশা করেন, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে যেসব টিকা আসার কথা তা যথাসময়ে আসবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে প্রেস সচিব বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ভারত সবসময় বিশ্বস্ত বন্ধু মনে করে। বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে ভারত সব সময় পাশে থাকবে। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, এই সফর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘যুগান্তকারী মাইলফলক’ হিসেবে থাকবে। বঙ্গবন্ধুকে গান্ধী শান্তি পুরস্কার দেওয়ায় ভারতের সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্ব মানবতা ও নিপীড়িত জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর আজীবন সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা এই পুরস্কার।

মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য ভারতের সরকার ও জনগণকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ভারতসহ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেয়। ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী এবং পারস্পরিক মর্যাদা, আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে একে অপরের বিশ্বস্ত বন্ধু।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন, কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা সেখানে ছিলেন।