কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে উখিয়ার মুৎশিল্পঃ সরকারের পৃষ্টপোষকতা প্রয়োজন

IMG_20170425_120916_800x600-300x225-1.jpg

এম,এস রানা উখিয়া : গ্রামের সুন্দরী মেয়ে টি মাটির কলসী দিয়ে নদীর ঘাট থেকে পানি নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে পাড়ার দুষ্টু ছেলেদের ছুড়া কংকরের আঘাতে সাধের কলসী ভেঙ্গে যাওয়ার কারনে মূখ ভার করে বাড়ি ফেরার দৃশ্য এখন আর চোখে পড়েনা। গ্রামের কোন নববধু বা গেরেস্তের মেয়েকে মাটি থালা বাসন পরিস্কার করতে পুকুর পাড়ে যেতে দেখা যায় না। কোন গৃহিনী মাটির পাতিল দিয়ে রান্না করার কথা সপ্নেও ভাবতে পারবেনা। বর্তমান সময়ের আধুনিকতার মারপ্যাচে পড়ে উখিয়া থেকে কুমার সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে।
যারা বেঁচে থাকার তাগিদে চৌদ্দ পুরুষের ব্যবসা করে জীবন ধারন করে আসছিল তাদের অনেকে ছেড়ে দিয়েছেন গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ পেশার অনেক শিল্পী। একদিকে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাব অন্যদিকে আধুনিক যুগের যন্ত্রবিপ্লবের হুমকির মুখে পতন, এ দু’য়ের ফলে সংকীর্ণ থেকে সংকীর্ণতর হয়ে চলেছে এর স্থায়ীত্ব ও বিকাশের পথ। শতবর্ষী এ মৃৎশিল্পের তৈরি হাড়ি,পাতিল, ফুলের টব, মাটির ব্যাংক,ডাইনিং টেবিল, টালি, টাইলস সহ অনেক ধরনের নান্দনিক তৈজসপত্র দেশের বিভিন্নস্থানে সরবরাহ করা হয়ে থাকলেও ব্যবহার্য এসব বস্তু তৈরির প্রক্রিয়ায় কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে এ শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন
মৃৎ শিল্পীরা। কম চাহিদা, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসঙ্গতি আর জীবন-মান উন্নয়নের জন্য ক্রমশ অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন তারা।
উখিয়ার বিভিন্ন গ্রামে কুমার সম্প্রদায়ের উপস্হিতি ছিল চোঁখে পড়ার মত, এ পেশায় হিন্দু মুসলিম পাশা-পাশি থেকে মৃৎ শিল্পের কাজে জড়িত থাকলেও বর্তমানে কিছু সংখ্যক হিন্দু এ শিল্পর সাথে জড়িত থাকলেও মুসলিম কুমারদের এ পেশায় দেখা যাচ্ছেনা।
রুমখাঁ কুমার পাড়ার কোন কুমার কে মৃৎ শিল্পর কাজে দেখা যায় না, মাটির পন্যের পরিবর্তে মানুষ নিত্যকাজে ব্যবহার করছে নামি দামি কোম্পানীর সিরামিক,প্লাস্টিকের পন্য যার কারনে তারা আজ বেকার জীবনের তাগিদে বেঁছে নিয়েছে অন্য পেশা। উখিয়া রাজাপালং কুমার পাড়ায়
আগে যেখানে শতাধিক মৃৎশিল্পী ছিল আজ সেখানে এ শিল্পের সঙ্গে
জড়িতদের সংখ্যা কমে মাত্র ১০/১৫ তে এসে দাঁড়িয়েছে। রাজাপালংয়ে এ পেশার সঙ্গে জড়িতদের সবাই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। এদের মধ্যে কেউ কেউ চলে গেছে অন্য জায়গায় আবার কেউ বা জীবন যাত্রার মানোন্নয়নের জন্য এপেশা ছেড়ে হয়েছে। অথচ এমন এক সময় ছিল যখন মৃৎ পেশার সঙ্গে জড়িতদের জীবনমান ছিল উন্নত।
আদি বা বংশানুক্রমে পাওয়া পেশা হওয়ায় অনেকে এ নিয়ে গর্ব করতেন। মাটির তৈরি তৈজসপত্রের পর্যাপ্ত চাহিদা থাকায় এ পেশার মাধ্যমে স্বচ্ছলভাবেই জীবন ধারণ করে আসছিল। তাদের, বাপ-দাদার চৌদ্দ পুরুষের ব্যবসা ছিল মাটির হাড়ি পাতিল তৈরি করা। তখন তাদের বাড়ি এ এলাকায় কুমার বাড়িহিসেবে পরিচিত। এমনকি এ মহল্লাকে আজও মানুষ কুমারপাড়া বলেই ডাকে।
কুমার’রা সড়ক পথে বিভিন্ন গাড়ি ও নৌকাযোগে দেশের বিভিন্নস্থানে সরবরাহ করতেন মাটির তৈরি তৈজসপত্র। একসময় এ জিনিসপত্রের চাহিদা ছিল অধিক হারে। কালের পরিক্রমায় আজ বলতে গেলে তা শূন্যের কোঠায়। চাহিদা কমে যাওয়ায় এ পেশায় আজ টিকে থাকাই দায় হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হারিয়েই যাবে এ পেশা।
জাদি মুরা কুমার পাড়ার বাসিন্ধা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে মাটির খাবারের বাসন বানানোর চাহিদা বাড়ে যেত এসময়
প্রতিবছরই হাজার হাজার বাসন সহ বিভিন্ন মাটির সামগ্রী তৈরি করা হতো যা থেকে বিপুল পরিমান অর্থ আয় হতো। এছাড়া সারা বছরে তেমন কোনও চাহিদা না থাকায় ওই সময়ে ফুলের টব, শোপিস, খেলনা সামগ্রী,মাটির ব্যাংক ইত্যাদি তৈরি করা হতো। এলাকার অধিকাংশ সচেতন ব্যক্তি বলেন, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির পাত্র ও এ পেশার শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখনই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। পাট শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে যেমন পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে তেমনি মাটির পন্য ব্যবহার বাধ্যতামূলক সহ দেশে বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন করে মাটির জিনিসপত্রের প্রয়োজনীয়তা জন
সাধারণের কাছে তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন। তা না করা হলে মৃৃৎশিল্পীরা হারিয়ে যাবে চিরতরে তখন তাদের স্থান হবে শুধু ইতিহাসের পাতায়