রামপুর সমিতিকে বিনা নোটিশে চিংড়ি জমি থেকে উচ্ছেদের পায়ঁতারা ; আতঙ্কে ১০ হাজার ভূমিহীন পরিবার

Chakaria-Picture-21-09-2020.jpg

এম.জিয়াবুল হক : উচ্চ আদালতের সুনিদিষ্ট আদেশ থাকার পরও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা এবং অবহেলার কারণে পুর্বপুরুষের মালিকানাধীন চিংড়িজোনের সম্পত্তি দখল বুঝে পাচ্ছেনা কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার রামপুর সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি লিমিটেড। উল্টো বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী দখলবাজ চক্রের সঙ্গে আতাঁত করে সরকারি কর্মকর্তারা আদালতের আদেশ লঙ্ঘনের মাধ্যমে চিংড়িজমি অবৈধ দখলের সুযোগ দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।
আদালতের আদেশ লঙ্ঘনের মাধ্যমে অনিয়মে অভিযোগে সর্বশেষ ১ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেন সমিতির সম্পাদক শহিদুল ইসলাম লিটন। আর অনিয়মের ঘটনাকে আঁড়াল করতে দখলবাজ চক্রের সক্রিয় সদস্যরা এবার চিংড়ি প্রজেক্টে বঙ্গবন্ধু কলোনী অপবাদ রটিয়ে পুর্বপুরুষের মালিকানাধীন চিংড়িজমি থেকে বিনা নোটিশে রামপুর সমিতিকে উচ্ছেদের পাঁয়তারা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় প্রশাসনের ফের উচ্ছেদ আতঙ্কে ভুগছেন সমিতির সভ্য-পোষ্য অন্তত ১০ হাজার পরিবার।
গতকাল রবিবার চকরিয়া প্রেসক্লাবে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের কাছে রামপুর সমিতির সম্পাদক শহীদুল ইসলাম লিটন উচ্ছেদ পরিকল্পনার নাটেরগুরু মেহেরুজ্জামান ও মিজান গংদের নানাধরণের অপর্কম অনিয়ম কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, রামপুর চিংড়িজোনে বঙ্গবন্ধু কলোনী প্রাচীন একটি জনপদ। এটি সেখানে নতুন করে তৈরী করা হয়নি। প্রসঙ্গত: ২০১৩ সালের ১৮জুন স্বরাস্ট মন্ত্রাণালয়ের পুলিশ শাখা-৩ থেকে আদেশ জারির মাধ্যমে রামপুর এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁিড় স্থাপন করা হয়। ওই তারিখে মন্ত্রাণালয়ের ইস্যুকৃত ৩৯০ নং স্বারকে একটি চিঠি রামপুর সমিতির প্রয়াত সভাপতি শামসুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে পাঠানো হয়।
ওই চিঠিতে পুলিশ ফাঁিড়টির স্থান চকরিয়া থানার বদরখালী এলাকার রামপুর সমবায় ও কৃষি উপনিবেশ সমিতি লি: এবং পাশের বঙ্গবন্ধু কলোনী নামে খ্যাত অফিস সংলগ্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মুলত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিকে অমর্যাদা করার অভিপ্রায়ে কতিপয় মেহেরুজ্জামান গং কল্পকাহিনী সাজিয়ে রামপুর সমিতির চিংড়িজমি জবরদখলের চেষ্ঠা চালাচ্ছে। এইধরণের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে রামপুর সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন।
শহীদুল ইসলাম লিটন অভিযোগ করে বলেন, চকরিয়া উপজেলার চিংড়িজোন রামপুর মৌজার ৫১১২ একর চিংড়ি জমি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তাদের যোগসাজসে দীর্ঘদিন ধরে জবরদখলের অপচেষ্ঠা চালিয়ে আসছে মেহেরুজ্জামান গংয়ের নেতৃত্বে একটি চক্র। উল্লেখিত চিংড়িজমি রামপুর সমিতির পুর্বপুরুষের সম্পত্তি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে রামপুর সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি লিমিটেডের (রেজি: নং ২৩৯৯/৭২(চট্ট) সভ্য-পোষ্য প্রায় ১০ হাজার ভুমিহীন পরিবার ৫০ বছর ধরে আইনী লড়াই করেও অনুকুলে বুঝে পাচ্ছেনা। এমনকি চিংড়িজমি সমুহ দখল বুঝিয়ে দিতে স্থানীয় প্রশাসনকে ইতোমধ্যে উচ্চ আদালত রিট পিটিশন মামলার আদেশে নির্দেশনা দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তা উপেক্ষা করে চলছেন। উল্টো দখলবাজ চক্রকে গোপনে সহযোগিতা দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এ অবস্থার কারণে সমিতির সদস্য প্রায় ১০ হাজার পরিবার নিঃশ্ব হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। বিষয়টি জানিয়ে প্রয়োজনীয় আইনী সহায়তা চেয়ে গতবছর সমিতির সভাপতি আবু জাফর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বরাবরে একটি লিখিত আবেদনও পাঠিয়েছেন।
রামপুর সমিতির সম্পাদক শহীদুল লিটন বলেন, চকরিয়া উপজেলার রামপুর মৌজার আর.এস ১০৮৩,১০৮৪, ১০৮৬, ১১১০, ১১১১, ১১১২ অধিনে সর্বমোট ৫১১২ একর চিংড়ি জমি ১০ হাজার ভুমিহীন পরিবারের পুর্বপুরুষের সম্পত্তি। যা স্বাধীনতার আগে থেকে ভুমিহীন পরিবার সদস্যদের নামে সিএস ও এমআরআর খতিয়ান রেকর্ড ভুক্ত রয়েছে। ১৯০৩ সালে সরকারের সংশ্লিষ্ঠ দপ্তর চকরিয়া উপকুলে সুন্দরবন তৈরীর উদ্দেশ্যে বিনা নোটিশে অধিগ্রহণপুর্বক বনবিভাগের কাছে উল্লেখিত জমি হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু ওইসময় বনবিভাগ সুন্দরবন করতে ব্যর্থ হলে পরবর্তীতে এসব জমি মৎস্য বিভাগকে উন্নত মৎস্য খামার করার লক্ষ্যে ৫ বছর চুক্তি ভিত্তিতে হস্তান্তর করেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ওইসময় মৎস্য বিভাগের অসাধু কর্মকর্তারা মৎস্যচাষে খামার না করে আর্থিক সুবিধা নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার ধনী শ্রেণীর লোকজনের নামে দীর্ঘ মেয়াদী চুক্তিতে মৎস্যঘের ইজারা দেয়। যা সরকারের সংবিধান বিধি মোতাবেক অপরাধ যোগ্য। পরবর্তীতে পুর্বপুরুষের এই সম্পত্তি ফেরত চেয়ে ভুমিহীন পরিবার গুলোর পক্ষথেকে আইনের আশ্রয় নেয়া হয়। তৎপ্রেক্ষিতে নিন্ম আদালত থেকে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোট বিভাগ পর্যন্ত সর্বআদালতে তাদের পক্ষে রায় হয়।
উল্লেখ্য যে, সমিতির পক্ষথেকে ১৯৭৯ সালে উল্লেখিত জমি ফেরত পেতে আইনী লড়াই শুরু হয়। এরই আলোকে চট্টগ্রাম সাবজজ-২য় আদালতে একটি অপর মামলা (নং৬৭/৭৯) দায়ের করা হয়। দীর্ঘশুনানী শেষে আদালত সমিতির সদস্যদেরকে উল্লেখিত জমিগুলো বন্দোবস্তি মূলে ফেরত দেয়ার অগ্রগামী বলে বিবেচিত হয় মর্মে রায় প্রদান করেন। কিন্তু মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে উক্ত জমি দখলে রাখার জন্য আদালতের আদেশকে অবমাননা করেন।
চট্টগ্রাম সাবজজ-২য় আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না করায় পরবর্তী দীর্ঘদিন বছর পর ২০১২ সালে সমিতি কর্তৃপক্ষ পুনরায় মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিটপিটিশন (নং- ১০৯৬২/১২) দায়ের করেন। মামলার প্রথম শুনানীতে আদালতের বিজ্ঞ বিচারপতিগণ সমিতির দাবীকৃত জমির উপর কোন ধরনের ইজারা নবায়ন না দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেন। কিন্তু ‘কে শুনে কার কথা’ প্রথা অনুযায়ী আদালতের সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মৎস্য কর্মকর্তারা উল্লেখিত জমি পুনরায় ইজারা নবায়ন দেন।
রামপুর সমিতির সম্পাদক শহীদুল ইসলাম লিটন বলেন, সমিতির দায়েরী মহামান্য হাইকোর্টের রীট পিটিশন নং- ১০৯৬২/১২ পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ শুনানীক্রমে ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারী আদালত আদেশে ভূমি সচিবকে দুইমাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করে সমিতির সদস্যদেরকে জমিগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ রায় প্রদান করেন।
সরকারী কর্মকর্তাগণ হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরবর্তীতে দুই মাসের মধ্যে কোন ধরনের ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো সমিতির সদস্যগণের বসবাসকৃত জমি হতে উচ্ছেদ করতে শুরু করেন। এতে সমিতির সদস্যগণ কোন উপায়ন্তর না দেখে পুনরায় হাইকোর্টে একটি কনটেম্পট পিটিশন (নং ২৬১/১৭) দায়ের করলে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রুল ইস্যু করেন।
মামলার বাদি শহীদুল ইসলাম লিটন বলেন, উচ্চ আদালতের রুলের কোন জবাব না দিলে সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৬ জুন আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওহলঁহপঃরড়হ প্রদান করেন এবং কক্সবাজারের তৎকালীন জেলা প্রশাসককে পরবর্তী জুলাই মাসের ২৫ তারিখ মহামান্য হাইকোর্টে স্ব-শরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে ধার্য্য তারিখে কক্সবাজারে জেলা প্রশাসক হাইকোর্টে স্ব-শরীরে হাজির হয়ে তাঁর জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দির প্রেক্ষিতে আদালত জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, চকরিয়ার ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং থানার ওসিকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সমিতির সদস্যদের জমিগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন। পরিতাপের বিষয় হলো উল্লেখিত কর্মকর্তারা আদালতের আদেশের কোন ধরনের তোয়াক্কা না করে অদ্যবধি সমিতির সদস্যগণের কাছে জমিগুলো বুঝিয়ে দেয়নি।
রামপুর সমিতির সম্পাদক শহীদুল ইসলাম লিটন আরও বলেন, পরবর্তীতে সমিতির পক্ষে জমিগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার আদেশের বিরুদ্ধে মৎস্য অধিদপ্তর থেকে ইজারা গ্রহীতা রামপুর দশ একর মালিক গং আপীল বিভাগে একটি সিভিল মিচ পিটিশন (নং ১৬৭৪/১৭) দায়ের করেন। ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর ওই মামলাটি পূর্ণাঙ্গ শুনানীক্রমে আদালত সিভিল পিটিশন দায়ের করার নির্দেশ দেন। কিন্তু মৎস্য বিভাগের পক্ষে রামপুর দশ একর মালিক সমিতি বিজ্ঞ আদালতে সিভিল পিটিশনটি রুজু না করায় ওই মামলাটি খারিজ করে দেন সাত সদস্যের বিজ্ঞ বিচারপতি সম্বনয়ে গঠিত আপীল বিভাগ। মুলত মামলাটি খারিজ হবার মধ্যদিয়ে ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর তারিখে রামপুর সমিতির পক্ষে মহামান্য হাইকোর্টের দেয়া আদেশটি বহাল থাকে।
তিনি বলেন, রামপুর সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতি অবৈধ পন্থায় পুর্বপুরুষের সম্পত্তি দখলে নেই। আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে মুলত নিজেদের সম্পদ উদ্ধারে প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছেন। জমিগুলো ফেরত দিতে উচ্চ আদালতের আদেশ বারবার উপেক্ষিত হওয়ার কারণে সর্বশেষ মহামান্য হাইকোর্টে আবারও মৎস্য বিভাগের দাবীকে অবৈধ ঘোষণা করে সমিতির পক্ষথেকে আরো একটি রিট পিটিশন মামলা (নং ৬০৪৭/১৭) দায়ের করা হয়।
মামলার শুনানীতে আদালত মৎস্য বিভাগের দাবীকে কোন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না? এবং উল্লেখিত জমি রামপুর সমিতির সদস্যদেরকে কেন হ্যান্ডওভার করা যাবে না? এই মর্মে চার (৪) সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে আদেশ দেন। কিন্তু মৎস্য বিভাগ দীর্ঘদিন যাবত আদালতের কাছে জবাব প্রদান না করলে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল তারিখে মামলার সর্বশেষ শুনানীতে আদালত সমিতির দাবীকৃত জমিগুলো একমাসের মধ্যে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য পুনরায় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন।
মুলত দীর্ঘ আইনী লড়াই শেষে আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক রামপুর সমিতি জমিগুলো ফেরত পেতে একটি পর্যায়ে পৌঁছলে ঠিক ওইসময়ে প্রশাসনের নজরদারি অন্যদিকে প্রভাবিত করতে দখলবাজ চক্রের সক্রিয় সদস্যরা চিংড়ি প্রজেক্টে বঙ্গবন্ধু কলোনী অপবাদ রটিয়ে পুর্বপুরুষের মালিকানাধীন চিংড়িজমি থেকে রামপুর সমিতিকে উচ্ছেদের পাঁয়তারায় মেতে উঠেছে। সমিতির সম্পাদক শহীদুল ইসলাম লিটন হুশিয়ারি দিয়েছেন, রামপুর সমিতির ১০ হাজার সভ্য-পোষ্য বেঁচে থাকতে দখলবাজ চক্রের এই অপকৌশল কোনদিন সফল হতে দেবেনা। পুর্বপুরুষের সম্পত্তি উদ্ধারে প্রয়োজনে জীবন দিতে রাজী সমিতির সদস্যরা। ##