বিদ্বেষ নয় ; সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চর্চা চাই

sompadokio.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর তিন দিনব্যাপী ভয়ংকর তাণ্ডবে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি এখনো থমথমে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যানুযায়ী দিল্লির সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে বৃহস্পতিবারই ৩৫ জন ছাড়িয়েছে, আহত বিপুলসংখ্যক। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, নয়াদিল্লির এ সহিংসতা কোনোভাবেই সাধারণ অর্থে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা নয়; স্থানীয় মুসলিমদের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর একচেটিয়া হামলা-নির্যাতনের ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। দেশটির নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-সাহিত্যিক ও বিরোধীদলীয় রাজনীতিকরা দিল্লি-সহিংসতার জন্য বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নীরবতা ও ইন্ধনকেই দায়ী করেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নয়াদিল্লিতে সহিংসতার ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে, নয়াদিল্লির সহিংসতা দেশটির জাতীয় নাগরিকপঞ্জি ও নতুন নাগরিকত্ব আইনের সংঘাতময় ঘটনাপ্রবাহেরই ধারাবাহিকতা।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার এ দফায় ক্ষমতায় আসার পর জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে রাজ্যটিকে তিন টুকরো করার পর ব্যাপকভাবে সমালোচিত হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি। এর পরপরই বিজেপি সরকার বিভিন্ন রাজ্যে প্রবল প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সত্ত্বেও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি ও নতুন নাগরিকত্ব আইন পাস করে। দেশটির বিরোধী রাজনীতিকদের অনেকেই তখন থেকে বলে আসছেন যে, সরকারের এই নীতি জাতিবিদ্বেষমূলক এবং এটা মুসলিমসহ দেশটির বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতি-সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের পথ তৈরি করছে। নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে দেশব্যাপী তুমুল বিক্ষোভ হলেও সরকার সেসব মোটেই আমলে নেয়নি। উপরন্তু দিল্লি জামিয়া মিলিয়া এবং কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ নাগরিকত্ব আইনবিরোধী প্রতিবাদ-বিক্ষোভের কেন্দ্রগুলোতে যেভাবে সশস্ত্র হামলা ও তাণ্ডব চালানো হয় তা দেশ-বিদেশে সমালোচিত হলেও বিজেপি সরকার ছিল অনমনীয়। এখন নয়াদিল্লিতে জাতিবিদ্বেষী সহিংসতা এতদিন ধরে চলা সেসব প্রতিবাদ-বিক্ষোভে প্রকাশিত জাতিগত নিপীড়নের আশঙ্কার বাস্তব দৃষ্টান্ত হিসেবে হাজির হলো।

ভারতে সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার অভিযোগে ঘরে-বাইরে সমালোচিত হচ্ছে বিজেপি সরকার। এটাই রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা হলেও দেশটির সামাজিক বাস্তবতার সামগ্রিক চিত্র অনুধাবন করাটা জরুরি। নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রী এবং তরুণ-যুবাদের তুমুল বিক্ষোভ থেকে যেমন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে, তেমনি মন্দির-মসজিদ-গির্জায় হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টানদের সমবেত প্রার্থনা সভার আয়োজনসহ অনেক আশাজাগানিয়া দৃষ্টান্তও দেখা গেছে। নয়াদিল্লিতে মঙ্গলবারের সহিংসতায় সরকার নীরব থাকলেও সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব ঠেকাতে তৎপর দেখা গেছে একজন বিচারপতিকে। রাতের বেলায় নিজ বাসভবনে বিশেষ আদালত বসিয়ে তিনি এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার এবং দিল্লি পুলিশের তীব্র সমালোচনা করেন। একইভাবে দেখা গেছে আক্রান্ত মুসলিমদের আশ্রয় দিতে দরজা খুলে দিয়েছে দিল্লির গুরুদুয়ারাগুলো। উত্তরপূর্ব দিল্লিতে আক্রান্ত মুসলিমদের অনেকেরই আশ্রয় মিলেছে হিন্দু প্রতিবেশীদের বাড়িতে। মুসলিমই হোক কিংবা হিন্দু, রাষ্ট্রীয় নীতি ও ক্ষমতার রাজনীতিতে সবসময়ই সবচেয়ে বেশি বলি হয় নিরীহ মানুষ। আবার সাধারণ মানুষের মধ্যকার এ সম্প্রীতি ও ঐক্যই পারে যেকোনো দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। ভারতের সাম্প্রতিক এ সংঘাত কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা অনেকটাই নির্ভর করছে বহু জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও বহু ভাষার ভারতীয় জাতিসমূহের পারস্পরিক ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপরই।

লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, নয়াদিল্লিতে ভয়াবহ সন্ত্রাস-সহিংসতার এ ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ভারত সফর করছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করা হয়। রাষ্ট্রপতি ভবন তখন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার লাল-নীল-সাদা রঙের আলোকসজ্জায় সাজানো। আর উত্তর-পূর্ব দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকা জাফরাবাদ, মৌজপুর, জোহরাপুরী, ভজনপুরা, গোকলপুরী তখন আগুনে পুড়ছে। মসজিদ, বসতবাড়ি, দোকানপাট পুড়ছে। উন্মত্ত দাঙ্গাবাজদের নির্মম নিপীড়ন থেকে বাঁচতে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার আহাজারি আর পোড়া ধোঁয়ায় ভারী হয়ে আছে ঐতিহাসিক দিল্লি নগরীর আকাশ-বাতাস। আগুনে পুড়তে থাকা দিল্লিতে পৃথিবীর দুই বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের এ সম্মিলন এবং তাদের এই নীরবতাকে তাৎপর্যময় প্রতীকী ব্যঞ্জনা হিসেবে বর্ণনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অভিবাসীবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত ট্রাম্প এবং ভারতের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী মোদির এ সম্মিলন তাই পৃথিবীতে গণতন্ত্র ও বহু জাতিসত্তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। শুধু ভারত নয়, ভারতের নিকটতম প্রতিবেশী বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জনগণকেই এখন এ প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হবে। তবে সবাইকেই মনে রাখতে হবে যে, সংঘাত নয়, সম্প্রীতিই মুক্তির পথ দেখাতে পারে।